মুজাহিদুল ইসলাম :
২০১৬ সালে সিরিয়ার জাফরি মাজহাবের সর্বোচ্চ ফতওয়া বিভাগের প্রধান সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলি আল-মিসকি জনগণের চাহিদা জানার জন্য হিমস প্রদেশেদের শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মাজরাআহ এলাকা পরিদর্শন করেন। ঠিক সে সময়ই তার নিকটবর্তী অবরুদ্ধ হাইয়ুল ওয়ার এলাকা বাশার প্রশাসন ও সহযোগী মিলিশিয়া কর্তৃক উপর্যুপুরি হামলার শিকার হয়। এ ঘটনা দেশের মাত্র কয়েক হাজার শিয়াঅনুসারীর অমিত শক্তি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদের ওপর তাদের নির্যাতনের ভয়াবহতা একটি রাষ্ট্রের নৈতিকতার ভিত্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সিরীয় বিপ্লব এবং পরবর্তী বাশারপ্রশাসন ও ইরানের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে সিরীয় সংঘাতে সামরিক ও রাজনৈতিক দিক হতে শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে ইরান নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। পাশাপাশি শিয়াতন্ত্রের ভয়ংকর বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের মধ্যে সমান্তরাল শক্তিশালী গোষ্ঠী হিসেবে শিয়াতন্ত্র বিকশিত হওয়ার সুযোগ হয়, যখন হাফিজ আল আসাদ ক্ষমতায় আসে। সিরিয়াতে শিয়াতন্ত্রের বিকাশের দুটি পর্ব; দুই হাজার এগারোর বিপ্লব-পূর্ববর্তী ও বিপ্লব-পরবর্তী। এখানে বিপ্লব-পূর্ববর্তী বিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হবে।
হাফিজ আল আসাদ ও শিয়াইসলামের সাহায্য গ্রহণ
বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদের জন্য সদ্য দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনা করা এককথায় বেশ জটিল ছিল। কারণ, সে ছিল আলাবি সম্প্রদায়ের সদস্য, যারা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র নয় শতাংশ। তাছাড়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিরা আলাবি গোষ্ঠীকে মুসলিম বহির্ভূত বলে মনে করে। এহেন মুহূর্তে ক্ষমতার জন্য নিজেকে ইসলামিকরণের লক্ষ্যে হাফিজ আল আসাদ শিয়া ও আলাবিদের কাছাকাছি আনার জন্য বিভিন্ন চুক্তি সম্পন্ন করে। সে-সময় সিরীয়দের অসচেতনতা তার জন্য এটা বেশ সহজও করে দিয়েছিল। অথচ সে-সময় শিয়াঅনুসারীদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। শীঘ্রই হাফিজ আল আসাদ তার প্রচেষ্টার ফলাফল পেতে শুরু করে। বিখ্যাত শিয়া আলিম মুসা আস সদর সিরিয়া সফরে এসে লাতাকিয়ার আলাবী নেতাদের সাথে সাক্ষাত করে এক ফতোয়া জারি করে দেন যে, আলাবিরা মুসলিম। তারা শিয়া ইসনাআশারা গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত।
মুরতাদাসংঘ ও আলাবিদের শিয়াকরণ
শিয়াদের সাথে আলাবিদের সম্পর্ককে আরও গভীর ও ব্যাপক করার জন্য এবং উপকূলীয় আলাবি অঞ্চলে শিয়াতন্ত্রের প্রচারের লক্ষ্যে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদের সহোদর জামিল আসাদ ইরানের সহযোগিতায় মুরতাদা নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি এই সংঘ শত শত আলাবিকে ইসনা আশারা আকিদা শিক্ষার জন্য ইরানের কুমে পাঠায়। উদ্দেশ্য একটাই, যাতে তারা ফিরে এসে তাদের পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে শিয়াতন্ত্রের প্রচার-প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে। এর সাথে আরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো, সিরিয়ার লাতাকিয়ায় প্রচুর শিয়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যেখানে ইতিপূর্বে কিছু আলাবি মাজার ছিল। দ্বিতীয়ত আলাবি মসজিদগুলোতে ইমামতের জন্য শিয়া ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়।
সুন্নিদের শিয়াতন্ত্রে দীক্ষিত করার প্রচেষ্টা
আলাবিদের মধ্যে শিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অগ্রগতির পরে হাফিজ আল আসাদ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদের প্রতি মনোযোগী হয়। এক্ষেত্রে আসাদ ইরানের সহযোগিতা পায়। ইরাক ও লেবাননে যে পদ্ধতিতে ইরান তার আইডিওলজি প্রতিষ্ঠা করে, এখানেও সে পদ্ধতি প্রয়োগ করে। তবে হাফিজ আল আসাদ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিকে শিয়াতন্ত্রে দীক্ষিত করার ঝুঁকি বিবেচনা করে ধীর-স্থিরভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। শিয়াতন্ত্রের আহ্বানকে দলমত ও গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ইসলামের সার্বজনীন ড্রেস দিয়ে প্রচার করতে থাকে। রেডিও-টেলিভিশনে বড়-বড় শিয়া ইমামদের দিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতে থাকে। যেখানে কেবলমাত্র আহলে বাইতের প্রশংসা, তাদের ফজিলত, কারামত ও তাদের ভালবাসার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের বক্তব্য থাকে।
গণমাধ্যমের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে আসাদের ইশারা ও ইরানের সহযোগিতায় সুন্নি দরিদ্র অঞ্চলে দাতব্য ও সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিয়াতন্ত্রের প্রচার চলতে থাকে। পাশাপাশি হাফিজ আল আসাদ শিয়া আলিম মুহাম্মাদ হুসাইন ফাজলুল্লাহকে দিমাশকের সাইয়েদাহ জায়নাবে তার অফিস খোলার আহ্বান জানান। এ অফিস মূলত সে-সকল সুন্নিদের টার্গেট করে কাজ করতে থাকে, যারা ইতিপূর্বে শিয়া ছিল।
বাশার আল আসাদের সময়কাল
বাশার আল আসাদের শাসনের প্রাথমিক বছরগুলোতেই দিমাশক ও আলেপ্পোর ইরানি দূতাবাসের মাধ্যমে সুন্নিদের মাঝে শিয়াতন্ত্র প্রচারের জন্য পরিকল্পিত প্রচারণা চলতে থাকে। তাছাড়া সরকারের পক্ষ হতে সহজেই অনুমোদন পাওয়ার কারণে তারা বিভিন্ন হসপিটাল ও সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এবং এর মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে মাসিক খাবার-দাবার ও টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকে।
শিয়াতন্ত্র প্রচারে হিজবুল্লাহর ভূমিকা
২০০৬ সালে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিজয় শিয়াতন্ত্র প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কারণ, অনেক সিরিয়ানের নিকট হিজবুল্লাহ ও তার নেতা হাসান নাসরাল্লাহ মুগ্ধতার প্রতীকে প্ররিণত হয়। এমনকি তারা মনে করতে থাকে যে, তাদের আকিদা-বিশ্বাস সঠিক না হলে তারা কোনোভাবেই ইসরাইলে বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারতো না।
বন্ধুত্ব ক্রয় ও শিয়াদের উচ্চপদ প্রদান
আসাদের সহযোগিতায় ইরান সুন্নিদের মাঝে শিয়াতন্ত্র প্রচারের লক্ষ্যে দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে টানার জন্য কাজ করতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলের গোত্রপ্রধানদের অর্থবিত্ত দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের মত ও পথে চলতে উৎসাহ যুগিয়েছে। আর গোত্রপ্রধানদের অনুসারে তাদের অনুসারীগণও সে পথে চলেছে। আরো লক্ষণীয় হলো, বাশার আল আসাদ শিয়া ব্যক্তিত্বদের প্রশাসনের উঁচু-উঁচু পদ দিয়ে তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে আরো একধাপ এগিয়েছে। যেমন, তথ্যমন্ত্রী মাহদী দাখলাল্লাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিশাম বখতিয়ার।
বর্তমানে সিরীয় শিয়াদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশ। অথচ বাশারের ক্ষমতায় আসার সময় তারা ছিল মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ। মোটাদাগে যা বলা যায়, শিয়া এবং আলাবিদের কথিত মেকি মৈত্রিত্ব প্রথমত শিয়াদেরকে রাজনৈতিক প্রভাবের নিশ্চয়তা দিয়েছে, দ্বিতীয়ত ইসলামের ছদ্মবেশে সুন্নি-বিরোধীদের বিপরীতে সিরীয় যুদ্ধে মজবুত মৈত্রিত্বের প্রমাণ দিয়েছে।
