
মুসান্না মেহবুব
হাদিসে নববির অনবদ্য ছয় সংকলন—’সিহাহ সিত্তা’র দরস আমাদের বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কোথায় চালু হয়, এ আলাপে যাবার আগে বাঙালা অঞ্চলে হাদিসচর্চার সূচনা ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে খানিকটা জেনে নেওয়া যাক।
উপমহাদেশে হাদিসের স্বাভাবিক দরস-তাদরিসের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় দেবলের রাজা দাহিরের রাজ্যে মুসলিমদের অত্যাচারকে কেন্দ্র করে উমাইয়া শাসক কর্তৃক ৭১১ সালে স্থল পথে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্দু বিজয়ের মধ্য দিয়ে। এ বিজয়ের মাধ্যমে এ ভূখণ্ডে প্রথম বারের মতো রাজনৈতিকভাবে ইসলামের শুভাগমন ঘটে। এ সুবাদে এখানে তাবেয়ি মুহাদ্দিস শিক্ষাবিদ্গণের আগমন ঘটতে থাকে। ক্রমান্বয়ে দেবল, আল-মানসুরিয়া, লাহোর, সাহারানপুর ইত্যাদি এলাকা হাদিস চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। হিজরি সপ্তম শতকের দিকে এসব এলাকা থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী মুহাদ্দিসগণ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। বহির্বিশ্ব থেকেও মুহাদ্দিসগণ আসতে থাকেন। এ পর্যায়ে সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের রাজত্বকালে ঢাকার অদূরে সোনারগাঁয় শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাহ রহ.-এর মাধ্যমে বাংলার প্রথম হাদিসের দরসগাহের সূচনা ঘটে। জানা যায় যে, এ দরসগাহটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, এ অঞ্চলে সঠিক পন্থায় মুসলিম শাসকদের শাসনের অভাবে বারংবারই হাদিসে নববির দরসগাহে শূন্যতা সৃষ্টি হতো। পুনরায় কোনো মুসলিম শাসক এলে আবার ইসলামি শিক্ষার প্রসার ঘটত। সর্বশেষ ইংরেজদের আগমনে এ ধারাবাহিকতায় ভীষণ প্রতিকূলতার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে স্থানীয় উলামায়ে কেরামের আগ্রহ আতিশয্যে পুনরায় তা চালু হয়।
১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির আগমনের মাধ্যমে বাংলার এ অঞ্চলে রাজনৈতিকভাবে ইসলামের আগমন লক্ষ করা যায়। এরপর থেকে ১৩৫৪ সাল তথা প্রায় দেড়শ বছর পর্যন্ত কখন প্রত্যক্ষ আবার কখন পরোক্ষভাবে দিল্লির শাসনের অধীনে এ অঞ্চলের শাসকগণ যুক্ত ছিলেন।
১২৭০ হতে ১২৭৭ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের রাজত্ব ছিল। এ সময় তিনি নিজ দায়িত্বে দিল্লি হতে শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাহ রহ.-কে এ স্থানে আসার অনুরোধ করেন। সুলতানের অনুরোধ ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে প্রায় ৬০ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত হয় বিরাট মাদরাসা। যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার জন। শায়খ শরফুদ্দিন এখানে বুখারি, মুসলিম ও আবু ইয়ালার শিক্ষা দিতেন। বহু দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এসে দরসে হাদিসে উপস্থিত হতো। এ প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী শায়খ ছিলেন শায়খ শরফুদ্দিন আহমদ ইয়াহিয়া মানিরি রহমতুল্লাহি আলায়হি। তাঁর ইন্তিকালের পর বেশ কিছু দিন পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত থাকে।
১৪৯৪ হতে ১৫৪০ সালে, এ সময় এতদঞ্চলে সায়াদাতের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনি ইসলামি শিক্ষা ও হাদিসের চর্চার জন্য বেশ কিছু মাদরাসা স্থাপন করেন। দিক-দিগন্ত হতে সোনারগাঁয়ে বহু সংখ্যক হাদিসবিশারদ সমবেত হন এবং বহু লোক ইলমে হাদিস শিক্ষা করে পারদর্শিতা অর্জন করে। ফলে হাদিস চর্চার জন্য বহু মসজিদ ও খানকাও নির্মিত হয়। এ সময় নুসরত শাহের রাজত্বকাল ছিল। বাংলা অঞ্চল তখন হাদিস চর্চার প্রায় কেন্দ্রে পরিণত হয়।
অন্যদিকে এ সময় গৌড় পান্ডুয়ায় আলাউদ্দিন শাহ রাজত্ব করেন। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন করেন এবং তাঁর শাসনাধীন এলাকায় কুরআন-হাদিসের শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন করেন। তিনি ১৫০৩ সালে গৌড়স্থ গুড়াবা–বর্তমান মালদহে একটি উন্নত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পান্ডুয়ায় কলেজ স্থাপন করেন, যেখানে ইসলামি জ্ঞান বিজ্ঞান ও হাদিসের দারস প্রদান করা হতো।
১৫৫০ সাল নাগাদ অত্র অঞ্চলে বহু ইসলামি প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, খানকা গড়ে ওঠে। এ সময়ের এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, যেখানে মাত্র ১৩টি মসজিদ ছিল সেখানে ১৩১৪ সালের মধ্যে এসে এর সংখ্যা উন্নীত হয় প্রায় ১৪১ সংখ্যায়। তবে এ সময় আলাউদ্দিন শাহের উৎসাহে বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে বহু হিন্দু ধর্মের পুস্তকাদিও বাংলায় অনুবাদ হতে থাকে। যে কারণে এ অঞ্চলে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা শুরু হয় এবং মুসলিমদের মাঝে হিন্দুবাদী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। ফলশ্রুতিতে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে মুসলিমদের জীবনাচারে বহু অপসংস্কৃতি প্রবেশ করে।
এ দিকে ১৬৩৮ সালে দিল্লিতে সম্রাট আকবরের দীনে্লিএলাহির ফিতনা প্রকাশিত হলে মুসলিম সমাজে ইসলামি আকিদা, শিক্ষা সংস্কৃতির ও ধর্মীয় বোধ চূড়ান্ত রূপে ষড়যন্ত্রে নিপতিত হয়। এ সময় আগমন ঘটে উপমহাদেশের বিখ্যাত মুহাদ্দিস মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ.-এর। তাঁর অক্লান্ত শিক্ষায় মুসলিম সমাজে সংস্কার ঘটে যায় এবং তৈরি হয় একদল নির্ভীক চিত্তের মুহাদ্দিসগণ। ১৭০০ সালে সম্রাট বাবরের আমলে উপমহাদেশে শিয়া মতবাদের উত্থান ঘটে এবং আলিমদের মাঝে মাজহাব নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
১৭৩৩ সালে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি এ সকল প্রতিকূল অবস্থা সংস্কার করে পুনরায় বিশুদ্ধ হাদিস চর্চার প্রচলন শুরু করেন। এ সময় বাংলায় হাদিসের আলোকছটা কমে যায়। এ দিকে ইংরেজদের সাথে বাংলার নবাবদের দন্ধ- সংঘাত শুরু হয়ে যায়। যা পরবর্তীতে জঘন্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গে নবাবী প্রথার অবসান ঘটিয়ে ১৭৫৭ সালে ইংরেজ শাসনের সুচনা করে। ইংরেজদের আমলে ইলমে হাদিস ও অন্যান্য ইসলামি শিক্ষা চর্চার সাহায্য সহযোগিতা রুদ্ধ হয়ে আসে। তবে তখনও দেশে মক্তব মাদরাসা ছিল। বহুকাল এ অবস্থা বিরাজমান থাকে।
এ সময় ইংরেজদের অত্যাচার ও পরাধীনতার গ্নানি থেকে মুক্তি পেতে উপমহাদেশের আলিমগণ তাদের কবল থেকে মুসলিম ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার অংশ হিসাবে ১৭৮০ সালে লর্ড হেস্টিংসের সাথে এক বৈঠকে বাংলার মানুষদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি চাওয়া হয়। যার ফলে ১৭৮১ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসার যাত্রা শুরু হয়। যেখানে পর্যায়ক্রমে তৎকালীন সর্বোচ্চ হাদিসগ্রন্থ মিশকাত শরিফ শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হয়।
অপর দিকে ১৮৬৬ সালে ভারতে দেওবন্দে উলামায়ে কেরামের বিশেষত মাওলানা কাসেম নানুতবির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিসের বিদ্যপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ। যেখানে পাঠ্যক্রম হিসাবে দরসে নিজামিকে নির্ধারণ করা হয়। ক্রমান্বয়ে দেওবন্দ একটি আন্দলনে পরিণত হয়। এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এর জনপ্রিয়তা। বিভিন্ন স্থানে এ পাঠ্যক্রমে শুরু হয় মাদরাসা।
এই ধাবাহিকতায় চট্টগ্রামে ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলার প্রথম কওমি মাদরাসা দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী। আর এ প্রতিষ্ঠানেই সর্বপ্রথম ১৯০৭ সালে দাওরায়ে হাদিস কোর্স খোলা হয়। যাতে মুয়াত্তা ইমাম মালিক, মুয়াত্তা মুহাম্মাদ, তহাবিসহ সিহাহ সিত্তার সকল কিতাব প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পড়ানো হতে থাকে। এরপর দেওবন্দের এ আন্দোলনের ব্যাপকতা আরোও ছড়িয়ে পরে। এবং ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ১৯০৯ সালে টাইটেল ক্লাস খোলা হয়। যে ক্লাসে সিহাহ সিত্তাহসহ বিবিধ হাদিসগ্রন্থ পড়ানো হতো। ১৯২১ সালে যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, যেখানে ৩টি অনুষদ ও ১২টি বিভাগের মধ্যে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিভাগ খুলে। পরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ও দরসে হাদিস চালু হয়।
