
রাগিব রব্বানি
একাধিকবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় এ বছর বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল হাইআতুল উলয়ার অধীনে অনুষ্ঠিত দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদেরকে। সেই সঙ্গে পেরেশানি ও চাপে পড়েছিলেন হাইআতুল উলয়া কর্তৃপক্ষও।
এবারের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার ইতিহাসে এই প্রথম। সততা আদর্শ ও ঐতিহ্যবাদিতায় আপোষহীন হবার কারণে এ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কারণ, এ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের পড়াশোনা পরীক্ষা ও রেজাল্ট নির্ভর ছিল না কোনো কালেই, ছাত্ররা পড়ত যোগ্যতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, পরীক্ষা ছিল তাঁদের কাছে কেবলই মেধা যাচাইয়ের একটি মাধ্যম।
অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ বছর কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায়, এ ধারার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা যেমন মর্মাহত হয়েছেন, তেম্নি হয়েছেন লজ্জিত ও হতবাক।
তবে আশার কথা হলো হাইআতুল উলয়া বাংলাদেশ কিংবা অন্যান্য দেশের শিক্ষাবোর্ডের মতো কোনো ধরনের তালবাহার আশ্রয় নেয়নি। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠামাত্রই সম্মিলিত এ কওমি শিক্ষাবোর্ড সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যাওয়া সব পরীক্ষা বাতিল ও পরবর্তী পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে নতুনভাবে নতুন প্রশ্নপত্রে আবারও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বার আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলে তখনও বোর্ডটি এর দায় স্বীকার করে ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষা বাতিল করে অভিনব পদ্ধতিতে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করে। হাইআতুল উলয়ার এ সততা স্বচ্ছতা এবং অভিনবত্ব সর্বমহলে প্রশংসিত হয়।
প্রথম বার প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরপরই হাইআতুল উলয়ার উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন আলেমের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কথা ছিল তদন্ত কমিটি খুব দ্রুত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠোর শাস্তির জন্য আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। কমিটি গঠনের কয়েকদিনের মধ্যে মেশকাতের প্রশ্নফাঁসকারীকে চিহ্নিত করে তাঁর কাছ থেকে লিখিত স্বীকারোক্তি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিচার করা হবে বলে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নপত্র কারা ফাঁস করেছে, তদন্ত কমিটি এখনও তা খুঁজে বের করতে পারেনি। এ ব্যাপারে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য এবং হাইআতুল উলয়ার সদস্য মুফতি মাহফুজুল হকের সঙ্গে। জানতে চেয়েছিলাম, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ কত দূর এগিয়েছে।
উত্তরে মাওলানা মাহফুজুল হক জানান, তাঁরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছেন, সময়মতো বিস্তারিত আপডেট জানানো হবে। কীভাবে তদন্ত করছেন, এ পর্যন্ত কাউকে চিহ্নিত করা গেছে কি না, গেলে কীভাবে চিহ্নিত করলেন—তদন্তের কোনো বিষয়েই এখনই কিছু বলতে রাজি হননি মাওলানা মাহফুজুল হক।
তদন্ত শেষে সবকিছু জানানো হবে বলে জানান তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে।
ঠিক কবে নাগাদ শেষ হতে পারে তদন্তের কাজ, এ ব্যাপারেও কিছু বলতে পারেননি মাওলানা মাহফুজ।
কওমি মাদরাসার আপামর ছাত্র-উসতাদ-হিতাকাঙ্ক্ষী, সকলেরই জোর দাবি প্রশ্নফাঁসকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু ঘটনার বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কমিটি এখনো আশানুরূপ কোনো ফলাফল দেখাতে পারছেন না, এটা কি তদন্ত কমিটির ব্যর্থতা বা গাফলতি, নাকি এ ব্যাপারে না আগানোর জন্য কোনো মহলের কোনো চাপ আছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা মাহফুজুল হক জানান, কোনো ধরনের চাপ বা তাঁদের নিজেদের কোনো গাফলতি এখানে নেই, তারা যথামাফিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্নফাঁসের কাজটা যারা করেছে তারা অনেক বড় একটা সিন্ডিকেট। বৃহৎ ও পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে নিপুণভাবে তারা প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তাদেরকে চিহ্নিত করা বেশ কষ্টসাধ্য, অনেকটা দুরূহ কাজও।
তাই প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে তদন্ত কমিটির একটু সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন মাওলানা মাহফুজুল হক।
সচেতন মহলের ধারণা, হাইআর প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত এই গ্যাংটি অনেক শক্তিশালী এবং ক্ষমতাসম্পন্ন। হাইআতুল উলয়া ও এর দায়িত্বে থাকা দেশের শীর্ষ আলেমদেরকে হেনস্থা করতেই তারা প্রশ্নফাঁসের মতো ঘৃণ্য এ কাজের আশ্রয় নেয়।
