হালাল খাবার: দেশে দেশে হালাল খাবারের চাহিদা বাড়ছে ?

ইবনুল কালাম:

মৌলিকভাবে সকল বস্তু হালাল। কোন জিনিসের ক্ষেত্রে কুরআন বা সুন্নাহয় নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হলে তা হারাম গণ্য হয়। খাদ্যের ক্ষেত্রে ‘হালাল’ বলার অর্থ হল ইসলামী আইনে তা অনুমোদিত। বেশিরভাগ খাবার ও পানীয় কুরআন সুন্নাহতে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত না হওয়ায় হালাল ও অনুমোদিত। অল্প কিছু বস্তু আছে, কুরআন-সুন্নাহে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হওয়ায় তা হারাম ও অনুনোমোদিত। রক্ত, শুকরের মাংস, মৃত মাংস ইত্যাদি তার অন্যতম।

এখন ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রসাধনী, স্বাস্থ্য পণ্য, প্রসাধন ও চিকিৎসা ডিভাইসের পাশাপাশি পরিষেবা খাতের উপাদান যেমন লজিস্টিক, বিপণন, প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ইত্যাদি ফিনান্সে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় খাদ্য খাতের বাইরেও ‘হালাল শিল্প’ বিপুল পরিমাণ বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাছাড়া হালাল খাদ্য বাজার আজ বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবসায় সবচেয়ে লাভজনক এবং প্রভাবশালী শিল্প রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

হালাল খাদ্য শিল্প যদিও ইসলামি আইনে অনুমোদিত স্বাস্থ্যকর খাবারের ধারণাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর অংশীদার কেবলই মুসলিমকুল নয়। অমুসলিম ভোক্তাদের মাঝেও রয়েছে এর সবিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। আশা জাগানিয়া কথা হলো, দিনদিন সে গ্রহণযোগ্যতা বেড়েই চলেছে।

২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী হালাল খাদ্যের বাজারে লেনদেন ছিলো আনুমানিক $১৫২২১৭০ মিলিয়ন ডলার। আশা করা হচ্ছে, ২০২৮ সাল নাগাদ ৪.৩% চক্রবৃদ্ধি হারে তা $১৯৫৯৬১০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। মার্কেট ওয়াচের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন আশা জাগানিয়া তথ্যই উঠে এসেছে।

বিশ্বে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার খাদ্য বাজারগুলিকেই প্রধান খাদ্য বাজার গণ্য করা হয়। বিশ্ব খাদ্য বাজারের প্রায় ৫৫% এ বাজারগুলোর দখলে। বিশ্বব্যাপী হালাল খাদ্যের বাজারে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানী সক্রিয় রয়েছে। বর্তমানে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ এবং ফাস্ট ফুড চেইন যেমন কেনটাকি ফ্রাইড চিকেন (KFC), ম্যাকডোনাল্ডস (McDonald’s) এবং সাবওয়ে (SubWay) অনেক অমুসলিম দেশে হালাল খাবার পরিবেশন করে যাচ্ছে। ক্যারেফোর (Carrefour) এর মতো সুপারমার্কেটগুলিও আজ জনসাধারণের জন্য হালাল পণ্যসমূহ আলাদাভাবে প্রদর্শনে বাধ্য হচ্ছে। তার কারণ হলো, হালাল খাবার গ্রহণের প্রতি অমুসলিমদের প্রবল আগ্রহ। অমুসলিম ভোক্তারাও আজ অন্যান্য খাবারের তুলনায় হালাল খাদ্যকেই অধিক প্রাধান্য দিচ্ছে।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ইসলামকে পুঁজি করে গড়ে উঠা হালাল শিল্পের প্রতি অমুসলিমদের এমন আগ্রহের কারণ কি? কেন অন্যান্য খাবার গ্রহণ না করে তারা হালাল খাবারের দিকে ঝুঁকছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ নিয়ে দলবদ্ধ গবেষণা হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও নানা সমীক্ষা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক অভিসন্দর্ভ। এর মধ্যে দুবাইয়ের ব্রিটিশ ইউনিভার্সিটির ডঃ স্টিফেন উইলকিন্স, কানাডার লেকহেড ইউনিভার্সিটির প্রশাসনিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডঃ ফারশিদ শামস, পাকিস্তানের গুলাম ইসহাক খান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির ড. মুহাম্মদ মোহসেন বাট, স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দ্রেয়া পেরেজ প্রমুখের সম্মিলিত গবেষণা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। গবেষণাটিতে কানাডা, স্পেন এবং যুক্তরাজ্যের ১১০০ জন অমুসলিম গ্রাহকের মাঝে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। এবং হালালের প্রতি তাদের আকর্ষণের কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম ১০০ জন অমুসলিম ভোক্তার উপর সমীক্ষা চালিয়ে আরেকটি গবেষণাপত্র তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৫৩% চীনা, ৩২% ভারতীয় ও ১৫% অন্যান্য দেশের লোক রয়েছে।

উল্লিখিত দুটি গবেষণায় অমুসলিমদের মাঝে হালাল খাবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ যে কারণগুলি উঠে এসেছে, তা নিম্নরূপ:

১. হালাল শিল্পে খাবারের নিরাপত্তা

ইসলামে হালাল খাদ্য গ্রহণের নির্দেশনার সাথে তার কারণও ব্যাখ্যা করা আছে। এর মধ্যে রয়েছে জনস্বাস্থ্য, জীবন সংরক্ষণ, ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষা, আত্মসম্মান বজায় রাখা এবং সততার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব উপাদানই অমুসলিম ভোক্তাদের হালাল খাদ্য গ্রহণে প্রলুদ্ধ করেছে।

খাদ্য নিরাপত্তা সাধারণত ভোক্তাদের পরম আরাধ্য থাকে। প্রতি বছর অনিরাপদ খাদ্যের ফলে বিশ্বে ৬০০ মিলিয়ন রোগ-ব্যাধি ছড়ায়। ৪২০,০০০ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘বিশ্বে প্রতি বছর অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্যকর জীবনের ৩৩ মিলিয়ন বছর নষ্ট হয়।’ বাস্তবতা এর চেয়ে বেশিও হতে পারে।

সম্ভবত ভোক্তাদের মাঝে স্বাস্থ্য সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা ও উদ্বেগই ধর্মের সীমানা পেরিয়ে ইসলাম আশ্রিত হালাল খাদ্যের প্রতি অমুসলিমদের প্রলুব্ধ করেছে। হালাল খাদ্য গ্রহণই এখন খাদ্য গ্রহণে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি লক্ষ্য রাখার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, খাদ্য গ্রহণে স্বাস্থ্যকর হওয়ার প্রতি লক্ষ্য রাখার অর্থ হলো কী খাচ্ছে, খাবার পরিচ্ছন্ন কিনা, খাবারের উৎস নিরাপদ কিনা, এই জাতীয় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা। এই বিষয়গুলো ইসলাম আশ্রিত হালাল খাদ্য শিল্পে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা হয়েছে। সেজন্য হালাল খাদ্যের প্রতি অমুসলিম ভোক্তাদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২. খাদ্য গুণমান

ইসলাম নির্ধারিত হালাল খাদ্য গ্রহণে অমুসলিমদের আগ্রহের আরেকটি কারণ হলো, হালাল খাদ্যের গুণগত মান ভালো হয়। খাবারের পরিচ্ছন্নতা ও সজীবতার ভিত্তিতে খাদ্যের গুণমান নির্ধারণ করা হয়। সেজন্য খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিগুলিতে খাদ্যের পরিচ্ছন্নতা এবং সতেজতা বজায় রাখার উপায় অবলম্বন অত্যাবশ্যক। এটা খাদ্যের পুষ্টির গুণমানকেও প্রভাবিত করে।

খাদ্য বিজ্ঞানীরা খাদ্যের গুণমানের মাত্রাকে ৪টি ভাগে ভাগ করেছেন: সুস্বাদু, স্বাস্থ্যকর, খেতে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয় এবং ব্যবহারিক। তারা আরো বলেছেন, খাদ্যের গুণগত মান ভালো হওয়ার সম্পর্ক প্রথমত মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধের সাথে। তারপর স্বাদ, ঘ্রাণ ও রূপের সাথে। স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত গুণমানটি পণ্যের ব্যবহার ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকে কীরূপ প্রভাবিত করে, তার সাথে সম্পর্কিত। মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ সম্পর্কিত গুণমানটি পণ্য ক্রয়, স্টোরেজ, প্রস্তুতি এবং ব্যবহারের সময় যতটুকু ধৈর্য ও সময় দেওয়া দরকার, ততটুকু দেওয়ার ভিত্তিতে অর্জিত হয়।
হালাল খাদ্যে বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকে বলে সাধারণত অমুসলিম ভোক্তা সমাজ তা গ্রহণে আকর্ষণ বোধ করে থাকে। কারণ, এসব দিক খাদ্যের নিরাপত্তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে।
শাজিয়া সেলিম হালাল ব্রিটিশ খাবার প্রকল্প (পিক্সাবি)

৩. পশুর প্রতি মানবিক আচরণ

পশুর প্রতি মানবিক আচরণ অমুসলিমদের হালাল খাবার গ্রহণে আকৃষ্ট করেছে কিনা, গবেষণায় সেদিকটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পশুর প্রতি মানবিক আচরণ বলতে বুঝানো হচ্ছে, পশুর যত্ন নেওয়া, পশুর পরিপালন করা ও পশুর সাথে মানবিকতা রক্ষা করা ইত্যাদি বিষয়।

পশুর প্রতিও মানবিক হওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ইসলাম হালাল মাংস সরবরাহের কোন পর্যায়ে পশুদের সাথে অমানবিক আচরণ প্রশ্রয় দেয় না। ইসলাম বলে, যখন পশু জবাই করা হবে, অবশ্যই মানবিক ও সহানুভূতিশীল পদ্ধতিতে জবাই করতে হবে। জবেহের ছুরি ধারালো হতে হবে। যেন জবাই করতে গিয়ে পশুদের কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়া না হয়।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে বিভিন্ন উপায়ে প্রচুর পরিমাণ মাংস প্রস্তুত করা হয়। এই পদ্ধতিগুলিতে সাধারণত মানবিক এ দিকগুলো বিবেচনায় নেওয় হয় না। অথচ মাংস স্বাস্থ্যকর হওয়ার জন্য এসব বিষয়ও লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য।

গবেষকগণ প্রাণীদের সাথে অমানবিক কিছু আচরণের ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন কিছু প্রাণী জবাই করার আগে বেশ কয়েক দিন কসাইখানায় বেঁধে রাখা হয়। কোন ধরনের খাবার দেওয়া হয় না। পান করার মতো পানিও রাখা হয় না। উপরন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে কখনো বেদম প্রহারও করা হয়। ফলে পশু দুর্বল হয়ে যায়।

পর্যাপ্ত পরিমাণ রাখাল বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি না থাকায় কখনো পশুগুলোকে কসাইখানায় গাদাগাদি করে বেঁধে রাখা হয়। ফলে পশুরা অত্যন্ত ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

কখনো প্রাণীগুলোকে সময়মতো কসাইখানায় পৌঁছানোর জন্য বেদম প্রহার করা হয়। যে প্রাণী হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, কিংবা ক্লান্তিতে বসে পড়ে, সীমাতিরিক্ত বেত্রাঘাতে তাকে উঠতে করা হয়।
কখনো পশু পরিবাহনে ৩ বা ৪ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এসময় প্রাণীগুলোকে ট্রাকে গাদাগাদি করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।

এসব কারণেও মাংসের মান খারাপ হয়। যার প্রভাব পড়ে ভোক্তার উপর। ভোক্তাদের মধ্যে তখন অসুস্থতা দেখা দেয়। পেট ব্যথা, ফুড পয়জনিংসহ খাদ্যের বিরূপ প্রভাব থেকে সৃষ্ট অন্যান্য রোগের সৃষ্টি হয়।

ইসলামে যেহেতু পশুর প্রতি মানবিক আচরণ করা হয়, পশুকে কোন ধরনের কষ্ট দেওয়া হয় না। তাই হালাল খাদ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ হয়। সেজন্যও ইসলামের নীতি আশ্রিত হালাল খাবার গ্রহণে অমুসলিমরা প্রলুব্ধ হয়।

আগের সংবাদশঙ্কা কাটছে না : কবে হবে ইজতেমা?
পরবর্তি সংবাদভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধে আইনি নোটিশ