‘হিংস্র’ জগত : কাদিয়ানী হেডকোয়ার্টারে একবেলা

‘হিংস্র’ জগত : কাদিয়ানী হেডকোয়ার্টারে একবেলা

আবদুল্লাহ আল মাসউদ:

সেদিন ছিল শুক্রবার। জুমার পর খাবারদাবার সেরে বসে ছিলাম। এক সহপাঠী আমার কাছে একটা পত্রিকা আর কিছু কাগজ নিয়ে এলো। সে আজকে বকসীবাজারে অবস্থিত কাদিয়ানি আস্তানায় গিয়েছিল। সেখানে বাৎসরিক সম্মেলন চলছে। আমি স্বভাবজাত কৌতুহলী মানুষ। তার ঘুরে আসার কথা শুনে কিছুটা এক্সাইটেড হলাম। বললাম, আমি যেতে পারবো? সে জবাব দিল, হ্যা পারবেন। কোন সমস্যা নাই। তবে শুরুতে তারা আপনার ছবি তুলে ঠিকানা নিয়ে একটা আইডি কার্ড তৈরি করে দিবে। যাতে আপনার পরিচয় সংরক্ষিত থাকে। শুরুর এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হলেই সব জায়গা ঘুরেঘুরে দেখতে পারবেন।

আমি আসরের পর রওনা হলাম বকসীবাজার। সেখানে যাবার সময় লাইব্রেরি থেকে কাদিয়ানী বিষয়ক একটা ছোট বই কিনে নিলাম। কারণ মনে হচ্ছিলো ওদের সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে গেলে ভালো হবে। বিশেষত তাদের গলত আকীদাগুলোর উপর আরেকবার নজর বুলিয়ে নিলে ভালো হবে। যাতে তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হলে বিপাকে না পড়তে হয়। যেতে যেতে পথে বইটি পড়লাম।

ঢাকা মেডিকেল মসজিদে মাগরিব পড়ে বইটা মসজিদে রেখেই রওনা হলাম। কারণ তারা আমার কাছে বইটি দেখতে পেলে ভালোভাবে নিবে না বিষয়টি। কয়েক কদম ফেললেই হাতের বাম দিকের রাস্তায় কাদিয়ানিদের আস্তানা। সেখানে গিয়ে হাজির হলাম। চারদিকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা। পুলিশ এবং সিআইডি ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। কাদিয়ানীদের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরাও দেখলাম বেশ তৎপর। মনে হচ্ছিলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এসেছি।

আমি নিরীহ মানুষ। মনে কোন দুরভিসন্ধি নাই। কৌতুহল থেকে দেখতে আসা। তাই স্বাভাবিকভাবেই আস্তানার গেটের নামনে গিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই ভেতরে যাওয়া যাবে? তিনি জানতে চাইলেন, এই সম্মেলনের সংবাদ আমি কই পেলাম। তাকে আমার সহপাঠীর কথা জানালাম। একটু পর আরেকজন এসে আমার কাছে বিষয়টা আরো খুটিয়ে খুটিয়ে জানতে চাইলেন। সে ছেলের নামধামসহ আরো বহুকিছু। এরপর আরেকজন, এরপর আরেকজন। এভাবে এক সময় আমার নামধামসহ পুরো ঠিকানা লিখে নিল। ততোক্ষণে আমি বুঝে ফেলেছি যে, ফেঁসে গেছি। কারণ তারা হিসেব মিলাতে পারছিলো না যে, একজন মাদরাসার ছাত্র তাদের আস্তানা ঘুরে ফেলেছে অথচ তারা জানেনই না! তারা ধরেই নিয়েছিলো, তাদের বিরুদ্ধে হয়তো কোন চক্রান্ত চলছে।

এর ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে বেশ কিছু সময়। আমি নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিলাম। একবার ভাবলাম কেটে পড়ি। পরক্ষণেই মনে হলো কাটতে গেলেই ওরা পাকড়াও করবে। কারণ তাদের সন্দেহের তীর আমার দিকে নিবদ্ধ। এর ভেতর দিয়ে বেশ কয়েকজন কাদিয়ানীর সাথে কথাবার্তা হলো। প্রত্যেকেই উচ্চ শিক্ষিত। তাদের যেভাবে বুঝানো হয়েছে, তারা বুঝেছে। আমরা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বিষয়ে যেসব অভিযোগ করি, তারা এর অনেকগুলোকেই মানতে নারাজ। বিশেষকরে সে যে নিজেকে নবী দাবী করেছে এই দাবী নাকি তাদের নামে মিথ্যাচার। আলেমরা বিদ্বেষবশত এমন সব কথাবার্তা প্রচার করে থাকে। বুঝলাম, কাদীয়ানীরা সাধারণ মানুষদের ধোঁকা দেবার জন্য নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। কারণ কোন মুসলিম সহজে এটা মেনে নিবে যে, নবী সা.-এর পরও কেউ নবী হতে পারে?

তাদের কথাগুলো আমি চুপচাপ শুনে গেলাম। মাঝেমাঝে দুই একটা বিষয় জানতে প্রশ্ন করলাম। তবে তাদের কোন কথারই প্রতিউত্তর বা খণ্ডন করে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেইনি। কারণ তখন মনে মনে ‘ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী’ করেই কুল পাচ্ছিলাম না। তাদের থেকেই জানলাম, সেই সম্মেলনে আমেরিকা-ইংল্যান্ড থেকেও মেহমান এসেছে। আমেরিকা থেকে যিনি এসেছেন তিনি খৃস্টধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। (মানে কাদিয়ানী হয়েছেন। ইন্নালিল্লাহ!) সম্মেলন উপলক্ষে একটা পত্রিকাও প্রকাশ করেছে তারা। যাতে নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস তুলে ধরেছিলো। কথায় কথায় জানলাম, এর সিংহভাগ অর্থই প্রাণ কোম্পানী যোগান দিয়েছে।

তাদের সাথে এসব কথার ভেতর দিয়েই এলো একজন সিআইডি। তিনি আবার আমার পুরো ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। জানালাম, একটু আগে একজনকে দিয়েছি। তিনি ধমক দিয়ে বললেন, একশোবার বললে একশোবার লিখে দিবি। যতো বার বলবো ততোবার লিখে দিবি। আমি অসহায়ের মতো চুপচাপ লিখে দিলাম। তবে ভেতরে কেন যেন কোন ধরনের ভয়ভীতি কাজ করছিলো না। কারণ আমি নিজের নির্দোষিতার বিষয়ে ছিলাম শতভাগ নিশ্চিত। কোন অপরাধ করার জন্য এখানে আমি আসিনি। এসেছিলাম শুধুই তাদেরকে কাছ থেকে দেখা ও তাদের সম্পর্কে জানার জন্য।

এবার একজন পুলিশের কর্মকর্তা এলেন। আমাকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করে অন্য আরেক অফিসারের কাছে ফোন দিয়ে বললেন, ‘আপনি তো পারলেন না। আমি একটা ধরে ফেলছি।’ তার বলার ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। এবার আর তার প্রমোশন কে ঠেকায়! প্রমোশনের হাতছানি তার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিচ্ছিল খুশির ঝলক। তার ভাবসাব দেখে তো আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ভালোভাবেই ফেঁসে যাচ্ছি তাহলে!

বারবার আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম। আমাকে বলা হল, যে ছেলে দুপুরে এসে ঘুরে গেছে এবং তার কাছে সংবাদ পেয়েই আমি এখানে এসেছি তাকে যেকোনভাবে এখানে হাজির করতে। নইলে দুজনের কপালেই শনি আছে। আমি ফোনে তাকে পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম। আমার সব সহপাঠী ঘটনা জেনে গেলো। আমার প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসার আবারো প্রমাণ পেলাম। তারা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে লাগলো আমার জন্য। আমিও আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগলাম।

প্রথমে সেই ছেলের থেকে তারা ভেতরে ঢোকার আগে ছবিসহ যে আইডি কার্ড দেয় তার নাম্বার দিতে বললো। সে নাম্বারটা দিলে একজন ভেতরে চলে গেলো। সেই নাম্বার মিলিয়ে দেখলো ওই নাম্বারে যার নাম-ঠিকানা এন্ট্রি করা তার সাথে এই ছেলের তথ্যের কোন মিল নেই। এবার তো তাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো। তারা এবার ছেলেকে ফোনে বললো স্বশরীরে উপস্থিত হতে। আসার সময় যেন কার্ডটি নিয়ে আসে। ছেলে জানালো, কার্ডটা সে হারিয়ে ফেলেছে। খুঁজে পাচ্ছে না। অফিসার এবার ক্ষেপে গেলো। বললো, ফাইজলামি পাইসস? একটু আগেও তো তোর কাছে কার্ড ছিলো। এখন বলিস হারিয়ে গেছে? দাড়া আমি এখনই ফোর্স পাঠিয়ে তোকে তুলে আনছি। তখন বুঝবি কতো ধানে কতো চাল।

আমার তো বুকের ডিবডিবানি আরও বেড়ে গেলো। সেই ছেলের উপর উঠলো চরম বিরক্তি। সে কি এটাকে ছেলেখেলা মনে করেছে! দশ মিনিট আগেও তার কাছে কার্ডটা ছিলো আর এখন কিনা হারিয়ে ফেলেছে! আমি আবার ফোন করে কাতর কণ্ঠে তাকে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করলাম। সময় বেশি নাই হাতে। রাত তখন বেশ হয়েছে। অফিসার বাসায় চলে যাবেন। সারাদিনের ডিওটিতে ক্লান্ত। যাবার আগে আমার মামলাটার একটা সুরাহা না করলে তো হবে না। অবশেষে সেই ছেলে পুলিশের হুমকিতে আসতে রাজি হলো।

এবার তারা আমাকে রাস্তা থেকে এনে বসাল একটা রুমে। কাদিয়ানী আস্তানার ভেতরে। দর্শনার্থীদের অনেকেই এসে উঁকি মেরে দেখছে। একজন ‘জঙ্গি’ সরাসরি দেখার লোভ হয়তো তারা সমালাতে পারছে না। আমার সামনেই অভিযোগপত্র লেখা হল। আমাকে বলা হলো সাইন করতে। সেখানে লেখা ছিল আমি নাশকতার উদ্দেশ্যে চুপিসারে আস্তানায় অনুপ্রবেশকালে ধৃত হয়েছি। হায়রে, সত্যতা বুঝি এভাবেই মাঠে মার খায়! এতো সহজে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। হয়তো অফিসারের প্রমোশন হবে এই মিথ্যার কারণে। কিন্তু আমার জীবনের কী হবে? পুরোটা জীবনই তো আমার সারখার হয়ে যাবে। সকল স্বপ্ন হয়ে যাবে ধুলিৎসাত। হয়তো বাকি জীবনটা আমাকে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুঁকেধুঁকে মরতে হবে। কখনো মুক্তি যদি পাই-ও তখন হয়তো ক্রোধের অনল আমাকে সত্যিকারের জঙ্গি বানিয়ে ছাড়বে। কিংবা সেটা না হলেও অন্তত আমার সাধারণ জীবনকে পরিবর্তন করে দিবে। এর দায় কার?

ইতোমধ্যে সে ছেলে এসে উপস্থিত হলো। তার পরিচিত এক লোক কাদিয়ানী। যিনি সে আস্তানায় কর্মরত। তার রেফারেন্স দিল সে। ওই লোক এসে এবার সত্যায়ন করলেন। আবার ছেলেটার বাড়িও ছিল গোপালগঞ্জ। সিআইডির একজনের বাড়িও গোপালগঞ্জ। তাদের দুজনের মধ্যে পরিচয় বিনিময়ের পর দেখা গেল তারা কাছাকাছি গ্রামের মানুষ। এবার সেই সিআইডির কর্মকর্তাও সদয় হলেন। সবমিলিয়ে আল্লাহ আমাকে সে বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আমি ফিরে পেয়েছিলাম একটা সম্পূর্ণ নতুন জীবন। ফিরে যেতে যেতে মনে মনে বলছিলাম, ‘আমি জঙ্গি নই’। ঘটনাটা বছর তিনেক আগের।

পুরোটা সময় যুবক বয়সের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা আমার প্রতি সদয় ছিলেন। তিনি মিরপুরের ওদিকে কোন এক কাদিয়ানি আস্তানার দায়িত্বশীল। লোকটা উচ্চ শিক্ষিত। আলাপচারিতায় যা বুঝেছিলাম তাকে ভুল বুঝানো হয়েছে। প্রকৃত কাদিয়ানী মতাদর্শগুলো তার সামনে পেশ করা হয়নি। তার থেকে ফোন নাম্বার রেখেছিলাম। বলেছিলাম, কাদিয়ানী মতাদর্শ সম্পর্কে আমি জানতে আগ্রহী। আপনার সাথে দেখা করকে যাবো। পরে নাম্বারটা হারিয়ে ফেলি। লোকটার প্রতি আমি আজও কৃতজ্ঞ। বিপদের সেই মুহূর্তে তাকে আমি সদয় পেয়েছিলাম।

আগের সংবাদকাদিয়ানি সম্প্রদায় : সূচনা ও বিকাশ
পরবর্তি সংবাদআল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে কাদিয়ানী সম্প্রদায়