হিজড়া সম্প্রদায়, পুনর্বাসন সম্ভব?

মুসান্না মেহবুব:

বাংলাদেশের গণপরিসরে হিজড়া মানে আতঙ্কের অপর নাম। তৃতীয় লিঙ্গের এ সম্প্রদায় বখশিশের নামে বাসে ট্রেনে দোকান-পাটে এমনকি ট্রাফিক সিগন্যালে হররোজ চাঁদাবাজি করে বেড়ায়। মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের দাবিকৃত বখশিশ প্রদান করে। অন্যথায় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি আর অকথ্য ভাষার ব্যবহার দিয়ে পরিবেশকে বিব্রতকর করে তোলে তারা।

রাজধানীসহ সারা দেশেই হিজড়াদের এমন উৎপাত আছে। কোথাও সহনীয় মাত্রায়, কোথাও আবার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রীতিমতো জুলুমের শিকার হতে হয় হিজড়াদের দ্বারা। সহনীয় পর্যায়ে থাকলে কেউই প্রতিবাদের জো দেখান না, ২০/৫০/১০০ টাকা দিয়ে রেহাই নিয়ে নেন নীরবে। কিন্তু চাঁদাবাজির মাত্রা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষেরা। কারও কারও অভিযোগ, পুলিশ মান-সম্মানের অজুহাত দেখিয়ে কোনো প্রতিকারে এগিয়ে আসে না।

বিয়ে বাড়িতে নেচে-গেয়ে, নতুন সন্তান জন্ম দেওয়া অভিভাবকদের কাছে টাকা চেয়ে জীবনযাপন করতেন। মানুষ যা দিত, তা নিয়েই খুশি থাকতেন হিজড়ারা। কিন্তু সম্প্রতি রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, দোকানপাট যেখানে-সেখানে টাকার জন্য মানুষকে নাজেহাল করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি সিগন্যালে ট্রাফিক পুলিশ, টহল পুলিশ বা সার্জেন্টের সামনেই এসব হয়রানি চলছে।

সাধারণ লোকজনের ওপর হিজড়াদের এসব হয়রানি দেখেও কোনো ব্যবস্থা কেন নেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যরা বলছেন, আমরা এ ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারি না। কিছু বলতে গেলে দলবেঁধে তারাই আমাদের হয়রানি শুরু করবেন। তাদের লাজ-লজ্জা না থাকায় কাপড়ও খুলে ফেলেন, সেটা অস্বস্তিকর।

তবে ট্রাফিক পুলিশের এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয়দানকারী হিজড়া লিসা বলেন, ‘এসব বলে লাভ নেই। সিগন্যালে থাকতে পারি, কারণ আমরা নিজেরাই তাদের টাকার ভাগ দেই। এখন এসব কথা বলে লাভ আছে? তারা থাকতে না দিলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। ঘরভাড়া থেকে শুরু করে পুরো মাসের খাওয়াদাওয়া বাবদ কম করেও কুড়ি হাজার টাকা লাগে। আমাদের তো সবাই বাসাভাড়াও দিতে চান না।

এদিকে, হিজড়া সম্প্রদায় থেকে পুনর্বাসিত হয়েছেন এমন অনেকে বলছেন, একদিকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকা, আরেকদিকে হিজড়া জনগোষ্ঠীর একেক দলের একেক রকম সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কিছু হিজড়া আছেন, যাদের প্রতি মাসে ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেও তারা রাস্তায় এ ধরনের হয়রানিমূলক আচরণ করা থেকে বিরত থাকবেন না। সেক্ষেত্রে কাউন্সিলিংয়ের মধ্য দিয়ে সরকারকেই পূর্ণ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

​২০১৩ সালে হিজড়ার ‘লিঙ্গ পরিচয়কে’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। হিজড়াদের পুনর্বাসনের জন্য কুড়িটিরও অধিক এনজিও কাজ করছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। হিজড়া সম্প্রদায়ের কারও কারও অভিযোগ, পুনর্বাসনের নামে যে সংস্থাগুলো কাজ করছে, তাদের অধিকাংশই নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। হিজড়া পুনর্বাসনের নামে কাড়ি কাড়ি টাকা তারা বাইরে থেকে আনছেন, কিন্তু সে অনুপাতে হিজড়াদের পুনর্বাসন করছেন না।

হিজড়াদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠন বা সমিতির কাছে এমনকি রাষ্ট্রের কাছেও হিজড়াদের কোনও সঠিক পরিসংখ্যান নেই। হিজড়াদের সংগঠন বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বলছে, সারাদেশে হিজড়ার সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার। আর বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তবে হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকজন বলছেন, এ সংখ্যা সারা দেশ মিলালে দেড় থেকে দুই লক্ষ হবে।

বিশাল এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের সাধারণ সমাজের কোনো সম্পর্ক নেই। নেই তাদের নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা। আমরা তাদের বাহ্যিক আচরণে লজ্জিত, বিরক্ত ও বিড়ম্বনাবোধ করি, কিন্তু জানি না তাঁদের ভেতরের কষ্টের গল্প। একই সমাজে জন্মগ্রহণের পরও শুধু হিজড়া হবার কারণে স্বাভাবিকভাবে তারা জীবনযাপন করতে পারে না। এমনকি মা-বাবা কিংবা আত্মীয়-স্বজনও তাড়িয়ে দেন কিংবা হিজড়া গ্যাং তাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ছোটবেলায়ই নিয়ে আসে মা-বাবার কাছ থেকে। হিজড়া হলেও তারাও তো মানুষ, হাসি-কান্না-সুখ-স্মৃতি-ভালোবাসা তাদেরও আছে। কিন্তু এসব অনুভবের কোনো ফুরসত নেই তাদের। দিনমান মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে হয়। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধর্ম সম্পর্কেও থাকে তারা বেখবর।

এ ব্যাপারে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছিল দেশের বিশিষ্ট দাঈ মুফতি যুবায়ের আহমাদের সঙ্গে। অমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতের পাশাপাশি হিজড়াদের মধ্যেও ধর্মীয় সচেতনতা তৈরি লক্ষ্যে তিনি ও তাঁর সাথিবর্গ কাজ করছেন।

মুফতি যুবায়ের জানান, এদের অনেকেই সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন যাপন করতে চায়। চায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে। ধর্ম সম্পর্কেও তাদের আগ্রহ তুমুল। মানুষের দ্বারে দ্বারে টাকার জন্য ঘোরা, মানুষকে হয়রানি করা তাদের ভালো লাগে না। কিন্তু পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে এটা তাদের করতে হয়। তারা যেকোনোভাবে পুনর্বাসিত হতে চায়। এ ক্ষেত্রে এনজিও সংস্থার ওপর ভরসা না করে সরকারকেই এগিয়ে আসা উচিত বলে মন্তব্য করেন মুফতি যুবায়ের।

মুফতি যুবায়ের আরও জানান, তবে হিজড়াদের মধ্যে এমন অনেকও আছে, যারা এ জীবনকেই আনন্দের সঙ্গে যাপন করছে। মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, মানুষকে হয়রানি করার মধ্যে তারা একধরনের আনন্দ পায়। ধর্ম সম্পর্কেও এরা খুব আগ্রহী নয়। এদেরকে পুনর্বাসিত করলেও খুব সহজেই আবার ওই পেশায় ফিরে আসতে চাইবে। তাই এদের নিয়ন্ত্রণ করে পুরো হিজড়া সম্প্রদায়কে পুনর্বাসিত করে তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এবং হিজড়া বিড়ম্বনা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেন মুফতি যুবায়ের আহমদ।

মুফতি যুবায়ের বলেন, সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ থাকলে খুব সহজেই হিজড়াদের পুনর্বাসিত করা সম্ভব। কারণ তুলনার বিচারে সারা বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা খুব বেশি না। তাদেরকে পুনর্বাসিত করলে একদিকে যেমন তারা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে, অপরদিকে সাধরাণ মানুষও রেহাই পাবে রাস্তাঘাটে বিড়ম্বনার শিকার হওয়া থেকে।

আগের সংবাদপ্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে সমকামিতার আইন
পরবর্তি সংবাদমানসিক বিকার থেকে শারীরিক বিকৃতি