হুমাইরা—দিলরুবায়ে সারওয়ারে কায়েনাত (৬ষ্ঠ পর্ব)

সুমাইয়া মারজান:

শুদ্ধতম ভালোবাসার লোবান

.এইযে অমন অভাব ছিলো দুজনার ছোট সংসারটিতে—তবু ভালোবাসার কমতি ছিল না কোনো। এখানে নিয়ম করে সুখের চাঁদ আলোর হাট বসাতো। আনন্দ, খুনসুটি আর পারস্পরিক দারুণ বোঝাপড়ার পসরা সাজিয়ে। কোমল ফুলের মতোই মসৃণ ছিলো এ সংসারের পথ। ঝর্ণার কলকল ধারার মতো উচ্ছ্বাসে, উচ্ছলতায় দিন গুজরান হচ্ছিলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জুটির। কোথাও কোন ছন্দপতন নেই, একনিয়মে শান্তির স্নিগ্ধ বাতাসের দোলায় দুলছিলো দুজন মানুষের জীবন নাও। রাগ, অনুরাগ, মান-অভিমান, ভালোবাসার খুনসুটিতে ভরপুর সুখের এক সংসার। নবীজির বয়স পঞ্চাশোর্ধ হলেও কিশোরী বধুয়ার মনের কাছে তার মনও যেন কিশোরী মনের বন্ধু হয়ে যেতো। চপলা আয়েশা রাদিয়ল্লাহু আনহার মনের চাওয়া, গতিবিধি সবই বুঝে নিতেন তিনি। যতোটা না পঞ্চাশোর্ধ স্বামী ছিলেন তার চেয়েও বেশি ছিলেন একজন বন্ধু হিসেবে। অথচ তার কাঁধে উম্মাহর সব গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, এলায়ে কালিমাতুল্লাহর দায়িত্ব পালনের পরে ঘরে ফিরে এসে কিশোরী প্রিয়তমার ছোট ছোট চাওয়া পূরণ করা, তার উচ্ছলতার সঙ্গী হওয়া, অভিমানের কালো মেঘ সরিয়ে প্রিয়তমার আপেলপেলব চেহারায় হাসি ফুটানো মোটেও সহজ ছিল না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঠিকই তা করতেন। ষাট বছর বয়েসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। তিনি ছিলেন পৃথিবীর বুকে সবচে প্রেমিক পুরুষ । ছিলেন একজন বন্ধু। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে স্বামী হতে পারেন সবাই। কিন্তু বন্ধুর মতো স্বামী বা বন্ধু প্রেমাস্পদ হতে পারে কজন! নবীজি এক্ষেত্রে সমস্ত পৃথিবীর পুরুষদের থেকে আলাদা ছিলেন। তিনি একসাথে বন্ধু ও স্বামী দুটোই ছিলেন।
.
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি হচ্ছি এ দলের নেতা। ”

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তার মুখনিঃসৃত এ বাণীর সাথে নিজে সবার আগে আমল করেছেন। তিনি তার সকল স্ত্রীদের নিকট ছিলেন বন্ধুর মতো। ইনসাফ ও ন্যায়ের সর্বোচ্চ উদাহরণ। তবুও কারোর হৃদয়ই নিয়ন্ত্রিত নয়। অন্তরের টান কারোর প্রতি হয়তো বেশি হয়েই থাকে। নবীজি তাই সকল স্ত্রীদের অধিকার সমান ভাগে প্রদান করলেও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি তার টান ছিল বেশি। ভালোবাসার একটা ঝর্ণাধারা তার জন্য আলাদা করে হৃদয়ে বইতো। মূলত নিজের অনুভূতির উপরে নিজের ক্ষমতা থাকে না । তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন :

‘হে আমার প্রভু! এটুকু সমতাই আমি করতে পারি। আপনি আপনার ক্ষমতায় যে সমতা করতে পারেন, সেটা দিয়ে আমার বিচার করবেন না।’

এ দোয়া আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে সম্পৃক্ত। তার প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অন্য স্ত্রীদের তুলনায় গভীর ভালোবাসা ছিল। তবে নবীজি চাইতেন সবার সাথে সমান আচরণ করতে। তা করতেনও। কিন্তু হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণ তো তার হাতে ছিল না। অন্তরের নিয়ন্ত্রণহীনতার জন্য তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। তার দোয়া কবুল করে আল্লাহ তাআলা আয়াতে কারিমা নাজিল করলেন :

‘আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনোই পারবেন না, তবে তোমরা কোনো একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না ও অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখো না ; যদি তোমরা নিজেদের সংশোধন কর ও সাবধান হও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিশেষ ভালোবাসার কথা সবাই জানতেন।

অনেক সাহাবীরা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবীজির প্রিয়তমা বলে ডাকা শুরু করলেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহুর সামনে কেউ একজন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিয়ে মন্দ কথা বলেছিলো। তিনি খুবই রাগান্বিত হয়ে যান এবং চিৎকার করে বলেন, তোমরা কিভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে এরকম মন্দ কথা বলতে পারো! কিভাবে তাকে কষ্ট দিতে পারো! তারপর যে ব্যক্তি মন্দ কথা বলেছে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে সামনে থেকে দূরে সরে যেতে বলেন।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের যেদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে থাকার পালা আসতো, সেদিন সাহাবীরা নবীজির জন্য হাদিয়া তোহফা পাঠাতে পছন্দ করতেন। কারণ ঐদিন নবীজির হাসিতে অন্যরকম আনন্দভাব অনুভূত হতো।

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মেয়ে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘হে আমার কন্যা! আশা করি তোমার একজন সঙ্গিনীর প্রতি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিশেষ ভালোবাসা ও মহব্বত তোমাকে বিপথগামী করবে না।’

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মেয়ের কাছে আসলে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিশেষ মর্যাদার কথা বলতে চেয়েছেন এবং আশা করেছিলেন যে, তার মেয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে প্রতিযোগিতা করবে না।

মদিনায় আসার পরবর্তী কয়েকটা বছর নবীজির পরিবারে অভাব-অনটন বেশি ছিল। আর এসময়টাতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজির সাথী ছিলেন। কোনপ্রকার অনুযোগ, অভিযোগ ছাড়াই। ভালোবাসা ভরা চপলতা দিয়ে মুছে দিতেন নবীজির ক্লান্তিকর অনুভূতিগুলো। তখন মদিনায় ইসলামি ইমারতের সূচনাকাল চলছিলো। সারাদিন নবীজি রাষ্ট্র গঠনের বিশাল দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকতেন। দিনশেষে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ভালোবাসা, কিশোরী মনের উচ্ছলতা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মনে বইয়ে দিতো প্রশান্তির স্নিগ্ধ সমীরণ। সকল ক্লান্তি যেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাসিমাখা মুখখানি দেখলে কোন এক অচিনপুরে হারিয়ে যেতো। নবীজি নতুন প্রেরণাশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠতেন। এজন্য অন্যসব স্ত্রীর চেয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার পারদ একটু বাড়তিই ছিলো।

একজন পার্সিয়ান প্রতিবেশী সাহাবি নবীজিকে তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার সাথে আয়েশাও যাবে। সাহাবি বাড়ি গেলেন। একটুপর ফিরে এসে বললেন না, শুধু আপনাকে নেমন্তন্ন করলাম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আবার আগের কথাই বললেন। সাহাবি আবার বাড়ি গেলেন। তৃতীয়বারও যখন নবীজিকে একা নেমন্তন্ন করলেন। তখন নবীজি একা যেতে অস্বীকার করলেন। কিভাবে তিনি তার প্রিয়তমাকে ছাড়া খেতে যাবেন যেখানে তার সাথে তার প্রিয়তমাও দিনমান অভুক্ত ছিলেন। নবীজি যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পর সাহাবি বললেন, আচ্ছা, চলুন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশাও আমার যাবে তো? সাহাবি হেসে বললেন, জি হ্যাঁ।

তারপর নবীজি ও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা দুজনেই তার বাড়িতে গেলেন।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মধ্যকার ভালোবাসা এত প্রকাশ্য ছিল যে, নবীজির অন্য স্ত্রীগণ নবীজির সাথে তাদের মনোমালিন্য দূর করে তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে প্রার্থী হতেন। একবার নবীজি কোন এক কারণে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার উপর রাগ করলেন। সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন বুদ্ধিমতী। তিনি এলেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে। সমস্যা খুলে বললেন। তারপর বললেন, আয়েশা! তুমি কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আমার উপর সন্তুষ্ট করতে পারবে? যদি পারো তো, আমি আমার এবারের পালার দিনটি তোমাকে দিয়ে দিবো।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাতে সম্মত হলেন। তারপর তিনি নবীজির পাশে গিয়ে বসলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জানতেন আজকের দিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য নয়। এজন্য আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার আগমনে অবাক হলেন। তাকে বললেন ঘরে ফিরে যেতে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার চোখেমুখে দুষ্টুমির রহস্যময় হাসি। চপল ঠোঁটের সে হাসির পরশ নবীজির মনে ছড়িয়ে দিতে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ যাকে খুশি তাকে রহমত দান করেন।

এবারে নবীজির পূর্ণ দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হলেন তিনি। নবীজি মূল ব্যাপার জানতে চাইলে পুরো ঘটনা তুলে ধরলেন । সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার অনুতপ্ত হওয়ার কথাও বললেন। এটি ছিল এক সুখময় সময়ের চেষ্টা। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বুদ্ধিমত্তা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সন্তুষ্ট করে। নবীজির চেহারায় ফুটে উঠে সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার অভিব্যক্তি।

একবার এক সফরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার উটটি পথ হারিয়ে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জায়গাটার নাম ছিল খাররা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এই ঘটনায় খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। কাফেলার সবাইকে নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে লাগলেন। প্রিয়তমাকে হারানোর ব্যথায় কাতর হয়ে বিহ্বল কণ্ঠে বলে উঠলেন, ওয়া আরুসাহ! (হায়! আমার বধূ!) এটি আরবরা তাদের প্রিয়তমার বিয়োগব্যথায় দুঃখকে ব্যক্ত করার জন্য উচ্চারণ করতো।

আমর ইবনে আস রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন? তিনি মূলত নবীজির কাছে নিজের অবস্থান জানার আগ্রহে ছিলেন। আশা করেছিলেন যে, সম্ভবত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তার নাম বলবেন। কিন্তু নবীজি কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই বললেন,আয়েশা। আমর ইবনে আস রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের নাম শোনার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। তাই আবার জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষদের মধ্যে কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, তার পিতা।

আমর ইবনে আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে তার নাম নবীজির প্রিয়দের তালিকায় নেই। নিজেকে এ তালিকার সবচেয়ে নিচে মনে করে এ ব্যাপারে আর কোন প্রশ্ন করা থেকে বিরত রইলেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নববধূ হয়ে নবীজির ঘরে আসার কিছুদিন পরের কথা। কিশোরী মনের ভাবনা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কৌতূহলী করে তোলে। নবীজি তাকে কী সত্যিই ভালোবাসেন? কতটুকু ভালোবাসেন? অকারণেই প্রশ্নেরা দোলা দেয় তার মনে। নবীজিকে জিজ্ঞেস করবেন কী না দ্বিধায় ভুগেন। একদিন কীভাবে যেন সাহস করে নবীজিকে জিজ্ঞেস করে ফেললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সত্যি করে বলুন তো, আপনি আমাকে কতটা ভালোবাসেন?

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কিছুক্ষণ প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, তোমার আমার মধ্যে ভালোবাসার বন্ধনটা এমন শক্ত, যেমন একটা রশির মধ্যে সুতাগুলো একই বাঁধনে শক্তভাবে জড়িয়ে থাকে।

নবীজির জবাব শুনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা পুলকিত হলেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন প্রেমাস্পদের দিকে। এরপর থেকে প্রায়ই তিনি নবীজিকে জিজ্ঞেস করতেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ভালোবাসার রশির বন্ধনের কী অবস্থা? তা আগের মতোই আছে, নাকি ঢিল হয়ে গেছে?

নবীজি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রশ্নের জবাবে মুচকি হেসে বলতেন, ভালোবাসার বাঁধন আগের মতোই শক্ত আছে। কোনরকম দুর্বল বা পরিবর্তন হয়নি।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মেজাজ মাঝে মাঝে বেশ কড়া হয়ে উঠতো। একবার কোন এক কারণে নবীজির উপর রাগ করে কথা বলছিলেন। রাগের কারণে গলার আওয়াজ সামান্য উঁচু হওয়ায় ঘরের বাইরে থেকেও তা শোনা যাচ্ছিলো। ঠিক এসময়ই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মেয়ের গলার আওয়াজ পেয়ে তিনি ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে গেলেন। বুঝতে পারলেন তার মেয়ে নবীজির উপর রাগ করে জোরে জোরে কথা বলছে। নবীজির সাথে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ের পর থেকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মেয়েকে উম্মুল মুমিনীন হিসেবেই দেখতেন, তবু তিনি ছিলেন তার পিতা। নিজের মেয়ের কোন আচরণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পাবেন এটা ছিল তার সহ্যের বাইরে। এজন্য তিনি মেয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, উম্মে রুম্মানের বেটি! তুমি কীভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সামনে এত উঁচু আওয়াজে কথা বলছো? একথা বলে তিনি ঘরে ঢুকে মেয়েকে শাসন করতে উদ্যত হলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দ্রুত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিজের আড়ালে নিয়ে গেলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তারপরেও চেষ্টা করলেন মেয়েকে থাপ্পড় মারার। নবীজি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আড়াল করে ফেলায় আর পারলেন না। তারপর নবীজি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পক্ষে সাফাই গেয়ে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে শাসন করা থেকে বিরত রাখলেন। মেয়েকে শাসন করতে না পেরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে কয়েকটি ধমক দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বেরিয়ে যেতেই নবীজি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, এবার সামনে এসো। প্রিয়তমা সামনে এলে দেখলেন তার চোখ ভীত হরিণীর চোখের মতো কাঁপছে যেন। প্রিয়তমাকে বললেন, দেখলে! কীভাবে আজকে আমি তোমার আব্বার হাত থেকে বাঁচালাম? আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার একটু আগে করা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ছিলেন। লজ্জায় নবীজির দিকে তাকাতে পারছিলেন না যেন। নবীজির এককথায় লাজুকতামাখা হাসিতে রাঙা হয়ে গেলেন। নবীজির শুকরিয়া আদায় করলেন।

সেদিন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মনক্ষুণ্ণ হয়ে মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর আবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেদিনের বিপরীত দৃশ্য দেখলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। কয়েকদিন আগের সে অস্বস্তিকর পরিবেশের পরিবর্তে এমন আনন্দমুখর সময় তাকে বিস্মিত করলো কিছুটা। তিনি তাদের এই হাসি, আনন্দময় সময়ের রহস্য জানতে চাইলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে হাসিমুখে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাদের আনন্দে আমাকে শরীক করুন, যেভাবে আপনি প্রতিটি যুদ্ধে আমাকে সঙ্গী করেন।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের মান-অভিমানকে হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে স্বাভাবিক করে তুলতেন। একদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হারিরা রান্না করলেন। নবীজির জন্য বিশেষভাবে তৈরি করেছেন। কারণ খাবারটি নবীজির পছন্দের। নবীজি খেতে বসেছেন এসময়ে সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা এলেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকেও খেতে বললেন। সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা না করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অভিমান ভরা কণ্ঠে বললেন, হয় আপনি খাবেন, না হয় আমি এগুলো আপনার মুখে লাগিয়ে দিবো। সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা তারপরেও খেতে চাইলেন না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে খুবই ভালোবাসতেন। কারণ তার বিয়ের পরে নবীজির ঘরে এসে তিনি সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে পেয়েছিলেন বড় বোনের মতো। সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহাও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সংসারের নানান আনুসাঙ্গিক বিষয়াদি শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। তাছাড়া সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার পালার দিনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। তো সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন একথার পরেও আবার না করলেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাতে কিছুটা হারিরা নিয়ে সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহার মুখে মাখিয়ে দিলেন। তাদের এমন কাণ্ড দেখে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হেসে উঠলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার এই চপলতা নবীজির ভালো লাগলো। সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। নবীজি তাকে বললেন এবার তুমিও তার মুখে মাখিয়ে দাও। সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহাও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মুখে কিছুটা হারিরা লাগিয়ে দিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার চেহারা দেখে নবীজির আবার হেসে উঠলেন। হারিরামাখা চেহারা ও হাত নিয়ে সবাই একযোগে হাসতে লাগলেন। এসময় বাইরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর গলা শোনা গেলো। তিনি তার ছেলেকে হে আব্দুল্লাহ, হে আব্দুল্লাহ বলে ডাকছিলেন।

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা না করে যাবেন না তা নবীজি জানতেন। তাই নবীজির যখন মনে হলো যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘরে প্রবেশ করতে পারেন, তখন কলহাস্যেরতা তার দুই স্ত্রীকে বললেন, চলো আমরা উঠি। তোমরা মুখ ধুয়ে আসো। উমর আসতে পারে। যদিও এটা একটি হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার ছিল তাও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সামনে প্রকাশ করতে চাইলেন না। কারণ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মেয়েদের এইসব খুনসুটি একদম পছন্দ করতেন না।

তথ্যসহায়িকা :

১.সহীহ বুখারী।
২.সহীহ মুসলিম।
৩.তিরমিযী।
৪.তাবাকাতে ইবনে সাদ।
৫.সিয়ারু আলামিন নুবালা।
৬.মুসতাদরাকে হাকিম।
৭.মুসনাদে আহমাদ।

 

আগের সংবাদমরক্কোর পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী দলের পরাজয়
পরবর্তি সংবাদইজরাইলের কারাগার থেকে পালানো দুই ফিলিস্তিনি আটক