হেফজখানায় শিক্ষক-সঙ্কট

মুসান্না মেহবুব:

রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় প্রায় সবগুলো শহরেই ব্যাপকভাবে গড়ে উঠছে প্রাইভেট মাদরাসা। এসব মাদরাসার প্রতিটাতেই অনিবার্যভাবে থাকছে নুরানি ও হিফজবিভাগ। কোনো কোনো মাদরাসা কেবল নুরানি ও হেফজখানাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ তাদের শিশুসন্তানদের ভর্তি করেন এসব নুরানি ও হেফজখানায়। ফলে প্রতিটা হেফজখানায়ই শিশু শিক্ষার্থী উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাওয়া যায়। কিন্তু দক্ষ, স্থায়ী ও চাহিদামাফিক শিক্ষকের সংকট রয়েছে এ ধরনের প্রায় প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে মোটা দাগে বেশ কয়েকটি কারণে হেফজখানায় শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, হেফজখানার শিক্ষকদের ডিউটি থাকে ২৪ ঘণ্টা। খাওয়া-ঘুম-গোসল-সহ দিনরাতের পুরোটা সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটাতে হয় তাদের। ডিউটির তুলনায় সম্মানী থাকে খুব অল্প। এ ছাড়া হেফজখানায় শিক্ষকতাকে অপেক্ষাকৃত ছোট দৃষ্টিতে দেখা হয় আলেম ঘরানায়। যার ফলে ধর্মীয় জ্ঞানে মোটামুটি পারদর্শীরাও হেফজখানায় শিক্ষকতা করতে অনাগ্রহবোধ করেন।

রাজধানীর শনির আখড়ায় অবস্থিত একটি প্রাইভেট মাদরাসা—মাদরাসা দারুল কুরআনের পরিচালক মুফতী ইমরান জহিরী ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, আমাদের হেফজখানায় ছাত্রসংখ্যা আশাতীত, কিন্তু দক্ষ এবং স্থায়ী শিক্ষকের সংকটে আমাদের প্রায় নিয়মিতই হিমশিম খেতে হয়।

মুফতী ইমরান জহিরী আরও বলেন, দক্ষ শিক্ষক পাওয়া গেলেও তাদেরকে স্থায়ীভাবে রাখা যায় না। কিছুদিন পর অন্য হেফজখানায় তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেলে চলে যান। অথবা অন্য যেকোনো সমস্যার কারণে আমরাই বাধ্য হই অব্যাহতি প্রদানে। চাহিদামাফিক শিক্ষকের সঙ্কট ছাত্রদের পড়াশোনায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানান মুফতী ইমরান জহিরী।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি হেফজখানায় শিক্ষকতা করেছেন এমন একজন সাবেক শিক্ষক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, হেফজখানার শিক্ষকদের পরিশ্রম বেশি। ২৪ ঘণ্টাই ছাত্রদের সঙ্গে তাঁদের থাকতে হয়। কিন্তু এ পরিশ্রমের তুলনায় সম্মানী নিতান্ত অল্প। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ তদারকি করতে গিয়ে হেফজশিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণও করেন। যার ফলে অনেকেই হেফজখানার শিক্ষকতায় আগ্রহবোধ করেন না।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের যদি এতো দীর্ঘ ডিউটি না দিয়ে ডিউটিটা অর্ধেকে কমিয়ে আনা হতো, বা শিফট শিফট করে কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে ডিউটি বণ্টন করে দেওয়া হতো, তাহলে বোধহয় চাপটা কম থাকত। হেফজখানায় একাধিক শিক্ষক থাকলেও প্রত্যেককেই রাতদিন ডিউটি করতে হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এই নিয়ম। এ থেকে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে বেরিয়ে না এলে হেফজখানায় শিক্ষক-সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা মুশকিলই হবে বলে আমি মনে করি৷

মাওলানা হাফেজ আহমদ হুসাইন নামে হেফজখানার সাবেক আরেকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয় ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের। ২৪ ঘণ্টা ডিউটি ও কর্তৃপক্ষের অসদাচরণের পাশাপাশি আরেকটা কারণ উল্লেখ করেছেন বিদ্যমান এ শিক্ষক-সঙ্কটের। তিনি বলেন, আমাদের আলেম সমাজে হেফজখানায় শিক্ষকতাকে অনেকটা হেয়ভাবে দেখা হয়। হাফেজ মাওলানা কেউ যদি হেফজখানায় শিক্ষকতা করেন, তাহলে মনে করা হয় তাঁর ইলমি যোগ্যতা কম অথবা শূন্যের কোঠায়, যার কারণে তিনি হিফজের শিক্ষকতা করছেন। অথচ যোগ্য অনেক আলেমও প্রথম দিকে হেফজখানায় কিছুদিন পড়াতে চান, বা নিয়মিতই পড়াতে চান। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা পড়াতে পারেন না।

মাওলানজ হাফেজ আহমদ বলেন, হেফজখানার শিক্ষক-সংকট কাটাতে হলে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। পাশাপাশি হিফজ শিক্ষকদের ২৪ ঘণ্টা ‘বন্দী’ করে না রেখে কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে কয়েক শিফটে দায়িত্ব ভাগ করে দিলে দায়িত্ব পালনেও গাফলতি থাকবে না, পাশাপাশি হেফজখানায় শিক্ষকতার প্রতি হুফফাজদের আগ্রহও সৃষ্টি হবে।

আগের সংবাদতিন মাসের মধ্যে বিটিআরসিকে আরও ১ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে গ্রামীণফোনকে
পরবর্তি সংবাদঅষ্ট্রেলিয়ার হাজার হাজার উটকে ক্রয় করে মৃত্যুদন্ড থেকে মুক্তি দিলেন মুসলিম ব্যবসায়ী