
বাংলাদেশে নাস্তিক-মুরতাদদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং ইসলাম ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীদের ফাঁসির দাবিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৬ এপ্রিলের লংমার্চের ৬ বছর পূর্ণ হলো গতকাল। এই লংমার্চের মধ্য দিয়েই সূচনা হয়েছিল হেফাজতের মহাজাগরণের। সেই সময়ের প্রেক্ষাপট, স্মৃতি ও আনুষাঙ্গিক বিষয়ে হেফাজতের যুগ্মমহাসচিব ও লংমার্চের অন্যতম সংগঠক মুফতী ফয়জুল্লাহর সঙ্গে কথা হয়েছিল ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমের। কথা বলেছেন হামমাদ রাগিব।
৬ এপ্রিলের লংমার্চের মধ্য দিয়েই তো হেফাজতে ইসলাম নাস্তিক্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনকে মহাজাগরণের রূপ দিয়েছিল। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটটা একটু বলবেন?
প্রেক্ষাপট তো সবারই জানা। আন্দোলনের তো আর খুব বেশি দিন পার হয়নি। ২০১৩-এর ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর শাহবাগে রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে যখন হাজার কয়েক মানুষ সমবেত হলো, এর গোড়ায় ছিল নাস্তিক্যবাদী ব্লগাররা। তারা প্রথমে রাজাকারদের ফাঁসির দাবি তুললেও ক্রমান্বয়ে ইসলাম ও এ দেশের ইসলামি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে। নানা প্রকারের উস্কানিমূলক ক্রিয়াকর্মের সূচনা করে। ইসলাম ও ইসলামি লেবাস-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। কুকুরের মাথায় টুপি দিয়ে ইসলামি লেবাসকে চরম অবজ্ঞা করে। এমনকি বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তোলে তারা, যা নিতান্তই অযৌক্তিক এবং অমূলক। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই সময় এই নেতৃত্বের গোড়ায় থাকা লোকজনের ইসলাম এবং ইসলামের মহানবি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সম্মানিত পরিবার নিয়ে চরম বেয়াদবিপূর্ণ ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক লেখাজোখা জনসমক্ষে প্রকাশ হতে শুরু করে। আর এটা তারা অব্যাহতভাবে চালিয়েই যাচ্ছিল। শাহবাগে তাদের অবস্থানের সময় তা আরও ভয়ানক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।
তাদের এসব উস্কানিমূলক কার্যকলাপ—যা এ দেশের সিংহভাগ মানুষের বিশ্বাস ও ঈমানে আঘাত হানছিল, রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছিল অসংখ্য নবিপ্রেমিকের হৃদয়ে—তা প্রতিরোধ এবং নবিজির শানে বেয়াদবিমূলক কথাবার্তার শাস্তি স্বরূপ তাদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতেই মূলত হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে এ দেশের তওহিদি জনতা গর্জে ওঠেন।
হকপন্থী ওলামায়ে কেরামের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম বেশ কয়েকটি হবার কারণে তাঁরা ভিন্ন ভিন্নভাবেই কর্মসূচি পালন করে থাকেন, তো হেফাজতের ব্যানারে ওই সময় সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেন কীভাবে?
দেখুন, হেফাজতে ইসলাম সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। এটার মূল লক্ষ্য ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা। আমি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তাছাড়া আমাদের দেশে হকপন্থী আলেমদের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম বেশ কয়েকটি থাকলেও ইসলাম ও ইসলাম-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর যখন আঘাত আসে সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। হেফাজতে ইসলামের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
২০১৩-এর ফেব্রুয়ারি থেকে যখন শাহবাগে ইসলাম-বিরোধী নানা ধরনের দাবি ওঠতে থাকে এবং ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাহবাগি ব্লগারদের অব্যাহতভাবে ছড়াতে থাকা ইসলাম-বিদ্বেষ জনসমক্ষে চলে আসে, চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা. বা. ওলামা সম্মেলন আহ্বান করেন। এবং এখান থেকেই বাংলাদেশের সকল ওলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে ৬ এপ্রিলের ঐতিহাসিক লংমার্চ কর্মসূচির ঘোষণা আসে।
আরও পড়ুন : হেফাজতের ৬ এপ্রিলের লংমার্চ : প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে
লংমার্চের দিনের আপনার একান্ত কোনো স্মৃতি বলবেন?
স্মৃতি তো আছে অসংখ্য, তবে যে স্মৃতিটা আজও আমাকে আপ্লুত করে এবং যেটার কারণে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি, তা হলো লংমার্চ পরবর্তী মহাসমাবেশে শাপলা চত্বরের মঞ্চ থেকে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি ঘোষণা। আমিরে হেফাজত শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা. বা. এ ঘোষণাপত্রটি পাঠের দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। তাছাড়া হেফাজতে ইসলামের এ মহাজাগরণ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য হয়ে থাকবে, একে সংগঠিত করার পেছনে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা. বা.-এর নেতৃত্বে আমার সম্পৃক্তি এবং এর জন্য নিজেকে নিবেদিত ও উৎসর্গিত করা আমার জীবনের অন্যতম পরম সৌভাগ্য। এ সৌভাগ্যের স্মৃতি আমাকে আজীবন প্রেরণা যোগাবে।
কেউ কেউ বলছেন লংমার্চের সময় সরকারপক্ষ এতটা মারমুখো ছিল না, পরবর্তী এক মাসে এই আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত-বিএনপি তথা সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অধিক মাত্রার একাত্মতা-পোষণ ও সমর্থনের কারণে সরকারপক্ষ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বুঝতে ভুল করে এবং এ আন্দোলনকে সরকার-পতনের আন্দোলন মনে করে। ফলশ্রুতিতে তারা মারমুখো হয়ে ওঠে এবং চূড়ান্ত দমননীতি অবলম্বন করে। ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
এটা হেফাজতের কোনো কোনো সমর্থক বা কর্মীরও মন্তব্য। আসলে কোনো কাজের গভীরে না গেলে বা কোনো কাজের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে না থাকলে সেই কাজের গভীরতা বোঝা মুশকিল। সংকটটা ঠিক কোথায়, তখন ধরা যায় না। ভেতরের পরিস্থিতি না জানলে শুধু বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করলে এমন মন্তব্য আসবে—স্বাভাবিক।
কিন্তু সেসময়ের প্রেক্ষাপট ও আন্দোলনের ভেতরগত পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে দেখতে পারতেন সংকটটা আসলে অন্য জায়গায় ছিল। হেফাজতে ইসলামের মহাজাগরণ দলমত নির্বিশেষে এ দেশের সকল মুসলমানের আন্দোলন ছিল। মুসলমান মাত্রই যে-কেউ এ আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য। তাই নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর সমর্থনের কারণে আন্দোলনকে দমানোর জন্য সরকার মারমুখো হয়েছিল, তা বলা সঠিক নয়।
কারণ, হেফাজতের ডাকে যে মহাজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল, তা খুব দ্রুতগতিতে বাংলাদেশে ইসলামি একটা গণবিপ্লবের রূপ নিচ্ছিল ক্রমান্বয়ে। মূল নেতৃত্বের উদ্দেশ্য কেবল ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ হলেও আন্দোলনের গতি ও প্রকৃতি অটোমেটিকলি ইসলামি গণবিপ্লবের দিকেই মোড় নিচ্ছিল। আর কোনো আন্দোলন ইসলামি গণবিপ্লবে রূপ নিচ্ছে—এমনটা দৃষ্টিগোচর হলে সরকার তো অবশ্যই, বহির্শক্তিও চাইবে তা যেন যেকোনোভাবে দমিয়ে ফেলা হয়। হেফাজতে ইসলামের মহাজাগরণের বিরুদ্ধে সরকারের মারমুখো হবার এটাই মূল কারণ। বহির্শক্তির চাপের কারণে সরকার চাইলেও এ মহাজাগরণকে আর আগ বাড়তে দিতে পারত না।
হেফাজতে ইসলামের নাস্তিক্যবাদ-বিরোধী সেই আন্দোলন কতটা সফল বলে আপনি মনে করেন?
হেফাজতে ইসলাম এ দেশের মানুষের ভেতর একটা চেতনা জাগিয়ে দিয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে কেউ আঘাত করলে এখন প্রতিটা মানুষই সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাছাড়া নাস্তিক-মুরতাদরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক সময় একচেটিয়াভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও কুৎসা রটাতো, হেফাজতে ইসলামের মহাজাগরণের কারণে বাংলাদেশে এটা বন্ধ হয়েছে। কেউ এখন ইসলাম ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে যথেষ্ট হিসাব-নিকাশ করে মুখ খোলে।
তাছাড়া হেফাজতের মহাজাগরণের পর থেকে বাংলাদেশের জাতীয় প্রেক্ষাপটে ওলামায়ে কেরাম নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষের ওপর ওলামায়ে কেরাম কতটা প্রভাব রাখেন, এ মহাজাগরণ থেকে সকল ঘরানার নেতৃত্বই একটা ধারণা পেয়ে যায়। সবচেয়ে বড়কথা, হেফাজতের এ আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশে নাস্তিক-মুরতাদের দুঃস্বপ্ন এবং প্রকাশ্য দৌরাত্ম্যের কবর রচিত হয়েছে। আর এটাই হেফাজতে ইসলামের সবচেয়ে বড় সফলতা এবং এটাই তাদের মূল চাওয়া ছিল।
ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য মোবারকবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানবেন।
আপনাদেরকেও অশেষ শোকরিয়া। ধন্যবাদ।
