রাগিব রব্বানি:
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আহ্বানে নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে লাখো জনতার জমায়েত হয়েছিল। তারপর ৫ মে বিকাল থেকে নিয়ে রাত ও পরদিন সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে প্রশাসনের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন অসংখ্য নিরীহ মুসল্লি। হাটহাজারীসহ রাজধানীর বাইরের কয়েকটি স্থানেও চালানো হয়েছিল এই নিপীড়ন। ফলে অসংখ্য মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিলেন, শাহাদাত বরণ করেছিলেন অনেকে।
হেফাজতের আন্দোলনে শাহাদতবরণকারীদের তালিকায় যেমন ছিলেন মাদরাসার শিক্ষক ছাত্র, তেম্নি ছিলেন খেটে খাওয়া দিনমজুরও। গুরুতরভাবে আহতদের তালিকায়ও আছেন সর্বশ্রেণির লোকজন। শাহাদতবরণকারীদের অনেকে ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, ফলে তাঁদের শাহাদাতের পর তাঁদের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবার মতো কেউ নেই।
আর আহতদের অনেকে অর্থসংকটে চিকিৎসার অভাবে ধুকছেন বছরের পর বছর ধরে। অনিবার্যভাবে তাঁদের পরিবারও দিন কাটাচ্ছে নিতান্ত দুঃখ-কষ্টে।
হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থার সহায়তা
ধর্মীয় ঘরানার সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হাফেজ্জী হুজুর রহ. সেবা সংস্থা বিগত কয়েক বছর ধরে এসব শহিদের পরিবার ও আহতদের খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করছে নিয়মিতভাবে। শহিদ অনেক পরিবারকে বিভিন্নভাবে আর্থিক সহায়তা করেছে তারা। পাশাপাশি গুরুতর আহতদের চিকিৎসাসেবার জন্যও কাজ করছে এ সংগঠন।
হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থার পরিচালক মাওলানা রজীবুল হকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংগঠনটি এ পর্যন্ত হেফাজতে শাহাদতবরণকারী ৩৩ জনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। আহত আরও অসংখ্য লোককে সহায়তা করে আসছে। বর্তমানে শহিদ ও আহত মিলিয়ে ২০টি পরিবারকে নিয়মিতভাবে খোঁজখবর রাখা ও সামর্থ অনুযায়ী সহায়তা করার কাজ করছে তারা।
গুলিবিদ্ধ হাফেজ রফিক
সম্প্রতি গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাফেজ রফিকুল ইসলাম নামে হেফাজতে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তির সংবাদ আলোচনায় এসেছে। চিকিৎসার অভাবে গুলিবিদ্ধ পায়ে গত কয়েক বছরে পঁচন ধরে গেছে তাঁর। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পা কেটে কৃত্রিম পা সংযোজনের প্রয়োজন ছিল। হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থার মাধ্যমেই তাঁকে আলোচনায় আনা হয় এবং তাঁর জন্য সাহায্যের আবেদন করা হয়। কিন্তু এভাবে সাহায্য নিতে হাফেজ রফিক বারবার বিব্রত হচ্ছিলেন। উদ্যোক্তারা প্রয়োজনের ব্যাপারটা বুঝিয়ে তাঁকে সাহায্য গ্রহণের জন্য রাজি করান। মাওলানা রজীবুল হক জানান, সাহায্যের আবেদনের পর প্রায় দুই লক্ষ টাকা এসেছে তাঁর জন্য। ইতিমধ্যে তাঁর পায়ের অপারেশন হয়েছে।
মাওলানা রজীব আরও জানান, পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে হাফেজ রফিকই। আহত হবার আগে ইমামতি করতেন, আহত হবার পর সেই চাকরিটাও চলে যায়। ফলে দুই মেয়ে, বাবা-মা ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসার পরিচালনা অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এখন অপারেশনের পর কৃত্রিম পা নিয়ে তিনি চাকরি-বাকরি করতে পারবেন না। হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থা পরিবারটির স্থায়ী আয়ের বন্দোবস্ত করে দেওয়ার একটা চিন্তা-ভাবনা করছে। চিকিৎসাবাবদ আসা সাহায্যের টাকা থেকে কিছু বাঁচলে সেগুলোসহ আরও কিছু টাকার দরকার পড়বে তাঁর কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে।
নাম-ধাম প্রকাশ করে সাহায্য নিতে বিব্রতবোধ
মাওলানা রজীবুল হক বলেন, হেফাজতে আহত ও শহিদানের আরও অনেক পরিবার আছে, যাঁরা এভাবে নাম-ধাম প্রকাশ করে ঘোষণা দিয়ে সাহায্যের আবেদন করাকে পছন্দ করেন না। আমরাও চাই না শাহাদাত এবং গাজীর সম্মানে ভূষিত পরিবারগুলোকে ছোট করতে। তাই নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে নাম-ধাম যথাসম্ভব আড়ালে রেখে তাদেরকে সহায়তা করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা যা দিই, একটা পরিবারের জন্য তা কিছুই না। নামকাওয়াস্তে সহযোগিতা মাত্র। তাঁদের প্রয়োজন মেটাতে আরও ব্যাপকভাবে সহযোগিতার প্রয়োজন।
তিনি জানান, বরিশালের ভ্যানচালক এক ভাই শাহাদাত বরণ করেছিলেন হেফাজতের আন্দোলনে। তাঁর পরিবারের মোটামুটি স্থায়ী আয়ের জন্য একটা অটো কিনে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন জনের সহযোগিতায়। এখন মোটামুটি ভালোই আছে পরিবারটি।
দিনমজুর শহিদের অসহায় পরিবার
কিন্তু মুন্সিগঞ্জের আরেক দিনমজুর শহিদের স্ত্রী ও সন্তানরা অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান মাওলানা রজীবুল হক। তিনি বলেন, তাঁদের স্থায়ী একটা আয়ের ব্যবস্থা করা খুবই প্রয়োজন। আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি, মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসি, যা পারি কিছু হাদিয়া দিই, কিন্তু এটা পরিবারটির ভরণপোষণের জন্য কিছুই না। মহৎপ্রাণ কোনো ভাই যদি চান শহিদ পরিবারটির স্থায়ী একটা আয়ের বন্দোবস্ত করে দিতে, তাহলে আমরা সরাসরি তাঁর সঙ্গে পরিবারটিকে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি।
এ ছাড়া হাফেজ্জী হুজুর সেবা সংস্থার জানাশোনা এমন আরও বেশ কয়েকটি পরিবার নিদারুণ অভাব ও অর্থকষ্টে দিন পার করছে বলে জানান মাওলানা রজীবুল হক। হেফাজতের নেতৃস্থানীয়দের কেউ কেউ কোনো কোনো পরিবারের সাথে এক-দুই বার যোগাযোগ করে সাহায্য করলেও পরে আর কোনো খোঁজ রাখেননি। এদিকে অর্থ কষ্টে থাকলেও নামপরিচয় প্রকাশ করে ঘোষণা দিয়ে সাহায্য নিতে চান না তাঁরা। আর সাহায্যের জন্য সেভাবে কেউ তাঁদের কাছে যায়ও না। ফলে মানবেতর জীবনযাপনকে নিত্যসঙ্গী করে দিন পার করছে পরিবারগুলো। জানান মাওলানা রজীবুল হক।
