‍আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়ার কবিতা : পাঠের ভূমিকা

রাকিবুল হাসান :

কওমি অঙ্গনে প্রবন্ধ চর্চার যে একটা ধারাবাহিকতা আছে, কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে তা নেই। কবিতায় কেউ কেউ খণ্ড খণ্ড চর্চা করেছে, তবে সেটা ধারাবাহিকতা পায়নি। কবিতাটা কওমি অঙ্গনের হয়ে উঠেনি। ব্যক্তিগতভাবে যারা চর্চা করছেন, তারাও খুব একটা শক্তিমত্তা দেখাতে পারেননি।

আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া সাহেব প্রবন্ধ প্রচুর লিখেছেন। সেই তুলনায় তার কবিতা খুবই অল্প। তবে এই কথা অনস্বীকার্য, তার ভেতরে কবিতার প্রয়াস ছিল। কবিতার প্রতি গোপন একটা ভালোবাসা লালন করতেন তিনি। হয়ত বিস্তৃত আকারে, ডঙ্কা বাজিয়ে তিনি কবিতা ছাপাননি, কিন্তু তার লেখার ব্যক্তিগত টেবিলে নিয়মিতই জন্ম নিত কবিতা। নিজের দুঃখবোধ, স্মৃতিকাতরতা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ব্যথা ফুটিয়ে তুলতেন সেইসব কবিতায়। সমর্পণ, নিবেদন, জাগরণ তার কবিতার এক চেনারূপ।

কবিতার বিষয়বস্তু

বিষয়ের বিচারে আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়ার কবিতা এক কথায় নির্মল, নিটোল, নির্বিরোধ। মোটাদাগে তার কবিতাগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। ঘুরেফিরে এই চারটি বিষয় প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়েছে তার কবিতায়।

ক. রাসূল প্রেম। রাসূলকে নিয়ে আমাদের যে আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং তার রওজার পাশে দাঁড়ানোর যে আকুলতা, সবই চিত্রিত হয়েছে এইসব কবিতায়।

‘তব সমাধি পরে’ কবিতায় লিখেছেন—’কতবার আসতে চেয়েছি তোমার কাছে/তব সমাধি পরে/ হৃদয় গহীনে মিলনের সুতীব্র কামনায়/মরু-মৃত্তিকা সরোবরে।’ এই কবিতার শেষদিকে লিখেছেন—’শুনেছি যার প্রতি পড়ে প্রসন্ন দৃষ্টি তোমার/তারই জীবনে মিলে সান্নিধ্য তব, আরাধ্য দিদার/তারই সৌভাগ্য হয় যিয়ারতে মদীনার/হে রাসূল আমার, ওগো প্রিয়তম/একবার তাকাও, প্রিয় বলে ডাক মোরে/ওগো, একটিবার কাছে ডাক মোরে, তব সমাধি পরে।’

তেমনি ‘হে রাসূল আমার’ এবং ‘নবী প্রেমের একি ধরন’ কবিতায় নবিকে ঘিরে তার আবেগ, রাসূলকে মানার প্রয়োজনীয়তা ফুটিয়ে তুলেছেন।

খ. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও জীবন জিজ্ঞাসা। জীবন যাপন করতে গিয়ে নানান অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই আমরা। কখনো চেপে বসে হতাশা, ক্লান্তি, বেদনা। কখনো আনন্দের আতিশয্যে উচ্ছ্বাস, উচ্ছ্বলতা, উৎসব। পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়ালে কখনো সামনে এসে দাঁড়ায় কিছু প্রশ্ন। টুকরো টুকরো এইসব দিন যাপনের নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপারগুলোও তিনি তুলে এনেছেন কবিতায়।

ব্যক্তিগত বিষণ্ণতার কথা বলতে গিয়ে ‘জমাট বাঁধা বিষণ্নতা’ কবিতায় বলেছেন—’আমার জীবনের সোনালী স্বপ্নগুলো/মুখ থুবড়ে পড়ে আছে অজানা বালুচরে/ দূর থেকে কোনো সৌখিন রাজার/বিরান রাজ প্রসাদতুল্য মনে হয় তাদের।’ ‘মনের বিষণ্ণ উদ্যানে’ কবিতায় বলেছেন—’যে প্রত্যয়ী স্বপ্নগুলো মনের গহীনে উঁকি দিয়েছিল/জীবন জাগার পথে যে সুর ঝংকার তুলেছিল/কিংবা মুক্তির মিছিলে যে বজ্রধ্বনি/হৃদয়ের পরতে পরতে সঞ্চিত হয়েছিল/তারা আজ ব্যর্থ আক্রোশে আমায় কুরে কুরে খায়।’

স্বপ্নভঙ্গের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি ভালোবাসার কথাও বলেছেন। ‘ভালোবাসার একান্ত স্বাক্ষর’ কবিতায় বলেছেন—’মিলনের সেতুবন্ধন এপারে ওপারে/দাঁড়িয়ে রয়েছি প্রতীক্ষায় তোমার, অনেক কাল ধরে।’ অনূদিত কবিতা ‘ভালোবাসা জীবনে মরণে’ বলেছেন—’তোমার কথা স্মরণ হলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ি/আবার আমি জীবন্ত হই তোমার প্রেমের যাদুবলে।’ এই কবিতার শেষে বলেছেন—’পেয়ালার পর পেয়ালা কত/প্রেমের শরাব হয় না শেষ/কণ্ঠ তলে ঢালি যত।’

গ. স্মৃতিচারণমূলক কবিতা। এই বিষয়ের কবিতা মধ্যে অন্যতম মৃত মায়ের স্মরণে লেখা ‘আমার শেষ ঠিকানা হারিয়ে গেছে’ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ মাওলানা ইসহাক ফরিদীর স্মরণে লেখা ‘অমর ভাস্কর্য’।

ঘ. জাগরণী কবিতা। তিনি বেশকিছু জাগরণী মূলক কবিতা লিখেছেন। তার মধ্যে অন্যতম ‘পরাশক্তির মালিকেরা শোন’, ‘তোমাকে যেতে হবে বহুদূর’, ‘যুদ্ধ যেন এক যৌবনা নারী’, ‘আমাকে যোদ্ধার বেশে সাজিয়ে দাও’, ‘জেগে ওঠো হে ঘুমন্ত শতাব্দী’।

কবিতার আঙ্গিক

কবিতার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তিনি আধুনিক কবিতার আঙ্গিকের পূর্ণ অনুসরণ কিংবা নতুন কোনো আঙ্গিক তৈরী করেছেন এটা বলা যাবে না। তবে আঙ্গিকের ক্ষেত্রে ফররুখ এবং নজরুলের অনুসরণ করেছেন তিনি। শব্দ ব্যবহার, বাক্য গঠন, রূপক স্থাপন, দৃশ্য তৈরী সবক্ষেত্রেই। বিশেষ করে জাগরণী কবিতাগুলোতে ফররুখের অনুসরণ করেছেন খুব।

যেমন ‘নব জীবনের বার্তা’ কবিতায় বলেছেন—মুসলমানের দিন এল ঐ জিন্দাবাদ/নব জীবনের বার্তা নিয়ে এল মাঝি সিন্দাবাদ।’ এছাড়াও ‘মিনতি মোর রাখ’ কবিতায় বলেছেন—’বিয়াবানে আজ নেমেছে আঁধার, ভয়াল তিমির তমসা কালো/ ঈশান কোণে বইছে বাতাস এলোমেলো/বহু শতকের সঞ্চিত ধূম, জমাট বেঁধে হয়েছে ঘন/কাল বৈশাখীর তাণ্ডবে তাই, বসুন্ধরা কাঁপছে যেন।’ ফররুখেরই অনুসরণ দেখা যায় এই কবিতাগুলোত। ফররুখের মতোই ব্যবহার করতেন খর্জুর, সিন্দাবাদ, পাঞ্জেরি, বালিয়ারি, মরূ শব্দগুলো।

শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি ক্লাসিক্যাল কবিতার তব, মম, সম শব্দগুলো ব্যবহার করতেন।

কবিতার ভাল-মন্দ

আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া সাহেবের আরবি থেকে অনূদিত কবিতাগুলো যথেষ্ঠ সফল বলা চলে। কিন্তু নিজস্ব রচিত কবিতাগুলো তার গদ্যের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেনি। আরও সময় দিলে, আরও একান্তভাবে চাইলে হয়তো পারতেন। হয়তো তিনি অতটা সিরিয়াসভাবে চানও নি।অন্ত্যমিল এবং ছন্দ দুটো এক নয়। আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া সাহেবের কবিতার কোথাও কোথাও অন্ত্যমিল প্রচেষ্টা দেখে গেছে। তবে ছন্দের নিয়মে অনেক জায়গায় ছন্দপতন ঘটেছে। হয়ত তিনি অন্ত্যমিলকেই ছন্দ ভাবতেন।

উপসংহার

এতটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কবিতাকে সিরিয়াসভাবে না নিলেও ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথাগুলো বলার জন্য তিনি কবিতার আশ্রয় নিতেন। তার কবিতাগুলো আসলে তার আত্মার বয়ান। যে কথাগুলো মুখ ফুটে বলা যায় না সবসময়, কবিতায় তিনি সে কথাগুলো বলতে চেয়েছেন। বিষয় বিচারে তার কবিতা যথোচিত। কোনো লুকোচুরি রাখেননি, অকপটে বলে গেছেন মনের ব্যথা, স্বপ্ন, জাগরণের কথা। তার কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে আয়নায় যেন আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া সাহেব রহ.-কে দেখছি।

আগের সংবাদচেতনার আকাশ ছোঁয়া মিনার
পরবর্তি সংবাদজীবনী ‍সাহিত্য : ইসলামি ইতিহাসে যেভাবে চর্চিত হয়েছে