মিশরে মৃত্যুদণ্ডের শিকার ব্রাদারহুডের ৯ তরুণের হৃদয়বিদারক শেষ চিঠি

৯ তরুণের একজন আহমদ তহা (নিচে ডানে), তাঁর স্ত্রী (ওপরে) এবং তাঁদের মেয়ে লায়লা (মাঝখানে ও নিচ থেকে বামে) ছবি : আল-জাজিরা

রাগিব রব্বানি

গত ২০ ফেব্রুয়ারি বুধবার মিশরের অবৈধ স্বৈরশাসক আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি’র রোষানলের শিকার ইখওয়ানুল মুসলিমিন (ব্রাদারহুড)-এর কারাবন্দী ৯ তরুণ সদস্যকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শহিদ করা হয়েছে। নয়জনেরই বয়েস ছিল তিরিশের নিচে। এদের অনেকেই ছিলেন শিক্ষার্থী। কেউ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, কেউ অন্য কোথাও।

মিশরের সাবেক এক অ্যাটর্নি জেনারেল হিশাম বারকাত হত্যার অভিযোগ এনে এই ৯ তরুণের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সিসি-নিয়ন্ত্রিত মিশরি আদালত। সিসি সরকারের আজ্ঞাবহ এই অ্যাটর্নি জেনারেল ২০১৫ সালে অফিসে যাওয়ার সময় একদিন তাঁর গাড়িবহরে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন।

৯ তরুণের প্রত্যেকেই ছিলেন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের আদর্শে উজ্জীবিত। তাঁদের এ মৃত্যুদণ্ডের সমালোচনা করেছে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। অ্যামনস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, মিশরে একনায়কতন্ত্রের বিস্তার এবং বিচার বিভাগের ওপর সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে এমন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

আল-জাজিরা অনলাইন এ ৯ যুবকের নাম-পরিচয় ও শেষ চিঠি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ৯ যুবকের নাম হলো, আহমদ তহা ওয়াহদান, আবুল কাসেম আহমদ, আহমদ জামাল হিজাজি, মাহমুদুল আহমদি, আবু বকর আস-সাইয়্যিদ, আবদুর রহমান সুলায়মান, আহমদ মুহাম্মদ, আহমদ মাহরুস সাইয়্যিদ এবং ইসলাম মুহাম্মদ।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার আগে তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের পরিবারের কাছে লিখেছেন নিজেদের অন্তিম অনুভূতির কথা। আল-জাজিরা সে চিঠিগুলো প্রকাশ করলে অসংখ্য মানুষ কেঁদেছেন হৃদয় ভেজানো এবং প্রাণোদ্দীপক এসব চিঠি পড়ে।

৯ তরুণের একজন আহমদ তহা ওয়াহদান। অ্যাটর্নি জেনারেল হিশাম বারাকাত নিহত হবার পর যখন তিনি বন্দী হন, তাঁর স্ত্রী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি কারান্তরীণ হবার এক মাস পর তাঁর স্ত্রী একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। কন্যার সঙ্গে এই ক’বছরে তাঁর দেখা হয়েছে সাকুল্যে দুই বার। একবার কোর্টে বিচার চলাকালীন কন্যার মা কন্যাকে উঁচু করে দেখান। তিনি তখন কাঠগড়ায়।

আরেকবার কোর্টেই, মেয়ের যখন দাঁত গজাচ্ছে, স্ত্রী মেয়েকে দেখিয়ে ইশারা দিয়ে বোঝান, মেয়ের দাঁত গজাচ্ছে। আহমদ তহা আনন্দিত হয়ে শিকের ভেতর থেকে হাত দিয়ে লাভ বানিয়ে দেখান। বন্দী থেকেও কী নিদারুণ আনন্দ তখন ঝরে পড়ছিল তাঁর চেহারা থেকে, সাংবাদিকদের তোলা সেই ছবি দেখলেই বোঝা যায়।

আহমদ তহা তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পূর্বমুহূর্তের অন্তিম চিঠি লিখেছেন তাঁর এই মেয়েকে উদ্দেশ্য করে। তিনি লিখেছেন, ‘আম্মুজান, তুমি আমার ভালোবাসা, আমার কলিজার টুকরো। কখনো ভেবো না যে, তোমার বাবা অপরাধ করেছেন। তোমার বাবা তোমার নিরাপত্তা চেয়েছেন। কেয়ার করে এমন রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছেন। বড় কারাগারে থাকেন, এটা চাননি। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিয়ো মা, পৃথিবী থেকে বিদায়ের আগে একবারের জন্যও তোমাকে বুকের মাঝখানটায় চেপে ধরতে পারলাম না। তোমার কোমল পবিত্র কপালে চুমু খেতে পারলাম না। তবে জান্নাতের দরজায় সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকব, মামণি। সেখানে কোনো বিদায় ও বিচ্ছিন্নতা নেই। আম্মুজান, আমার ভালোবাসা সবসময় তোমার সাথে থাকবে।’

৯ তরুণের প্রতিটা চিঠিই এমন হৃদয়বিদারক। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান সিসিকে অমানুষ বলে ডেকেছেন। শনিবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সিসির মতো ব্যক্তির সঙ্গে তিনি কখনোই আলোচনায় বসবেন না।

ব্রাদারহুডের এই তরুণদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এরদোগান আরও বলেন, মিসর সরকার-প্রধান হয়তো বলতে চাইবে আদালত তাদের (৯ তরুণ) সাজা দিয়েছে। কিন্তু দেশটিতে আদালত, বিচারবিভাগ ও নির্বাচন সব একজনের হুকুমে চলে। দেশটিতে একনায়কতন্ত্র ও সর্বাত্মকবাদ চলছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সেই সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবি জানাই।

আগের সংবাদদোতলার কেমিক্যাল বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত, সিলিন্ডার নয়
পরবর্তি সংবাদটাঙ্গাইলে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা