
ওমর ফারুক:
রাজধানীসহ গোটা দেশেই বাড়ছে বিয়ে বিচ্ছেদ। শিক্ষিত শ্রেণি থেকে নিয়ে সাধারণ শ্রেণি সকল পর্যায়ে একই চিত্র। তবে শহর শ্রেণির মানুষদের মাঝে এ প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন ২৪টিরও বেশি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে। এই তালাকের আবেদনে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা । স্বামীর মাদকে আসক্ত হওয়া এবং যৌতুক দাবিকে তালাকের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। পুরো দেশের চিত্রও এরকম।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন বাড়ছে। উত্তর ও দক্ষিণে তালাকের আবেদনের প্রায় ৭০ শতাংশই স্ত্রীর পক্ষ থেকে এসেছে। স্ত্রীর করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসা, মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, নৈতিকতাসহ বিভিন্ন কারণ। আর স্বামীর অবাধ্য হওয়া, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছেন স্বামী।
এদিকে আরও এক জরিপে জানা যায়, ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) তালাকের আবেদন পড়ে ৪ হাজার ৭৭টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ৪ হাজার ৭৬১টি। ২০১৬ সালে ডিএনসিসিতে তালাকের আবেদন পড়ে ৪ হাজার ৮৪৭টি এবং ডিএসসিসিতে ৪ হাজার ৮৯৭টি। গত বছর ডিএনসিসিতে তালাকের আবেদন পড়েছে ৫ হাজার ৪৬টি এবং ডিএসসিসিতে ৫ হাজার ২৪৫টি। সারা দেশে গত সাত বছরে তালাকের প্রবণতা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। তালাকের আবেদন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৭৫ শতাংশ। দক্ষিণ সিটিতে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয়, সমাজে মহামারির আকার ধারণ করেছে বিয়ে বিচ্ছেদ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম এম ই এস ওমরগণী কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ফাতেহ২৪কে বলেন, মুসলিমসমাজে বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। তবে এর বেশ কিছু কারণও রয়েছে। এ দেশে শশুড় শাশুড়ি তাদের মেয়েকে যে দৃষ্টিতে দেখতে চায় ছেলের বউকে কিন্তু সে দৃষ্টিতে দেখে না। এতে করে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণগুলোও উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়। সমাজে এখনো নারীদেরকে দাসী বলে মনে করা হয়। অথচ এখন নারীরা অনেক সচেতন হয়ে পড়েছেন। নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকেও বের হয়ে আসার প্রচেষ্টার কারণে এ প্রবণতাটি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জন্য পুরুষরাই প্রথমত দায়ী। স্ত্রীদের সম্পর্কে স্বামীদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সমঝোতা, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দু’জনের মাঝেই তৈরি করতে হবে। ইসলামের কালজয়ী আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে আমাদের সমাজের। ইসলামের ব্যাপক চর্চা শুরু হলে এ বিষয়গুলো অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। মানুষকে ইসলামের বিধানগুলো সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ইসলাম হচ্ছে একটি সুন্দর সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা। এ ব্যবস্থাটি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। ইসলামে নারীর অধিকার, স্বামীদের প্রতি স্ত্রীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এসব বিষয় সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন। দাম্পত্য জীবন পরিচালনা বা সুখী করার জন্য বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে এসব বিষয়গুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে যদি কিছুটা রোধ করা যায়।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি ও ধর্মীয় বিধানগুলোর বাস্তব প্রয়োগ। নারীদের অধিকার নিয়ে ইসলামের অনেক সুন্দর সমাধান রয়েছে। যেমন যদি কোনো স্ত্রী বলে আমার পক্ষে স্বামীকে রান্না বান্না করে খাওয়ানো সম্ভব নয়, আমারও জব করতে হয়, বিশ্রাম নিতে হয়। তাহলে কোনো স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে এ বিষয়ে চাপ দেওয়ার অধিকার ইসলাম দেয়নি। তেমনি কোনো মা যদি বলে আমার সন্তানদের দুধ পান করানোর বাবদ আমাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে তাহলেও স্বামীর ওপর কর্তব্য তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া। যদিও পৃথিবীর কোনো মা এটি গ্রহণ করবেন না। কিন্তু ইসলাম তাদের এ অধিকার দিয়েছে।
ড. খালিদ হোসেন আরও বলেন, পরকীয়া থেকে বেঁচে থাকা ও স্বামী স্ত্রীর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি ও বিশ্বাসের জায়গাটিও তৈরি করতে হবে। হিউমেন সাইকোলজিতে রয়েছে যে, প্রেমের বিয়েগুলো সাধারণত বেশি দিন টিকে থাকে না। কারণ অল্প কিছু দিনের মধ্যেই একে অপরের প্রতি ভক্তি ও আসক্তি দূর হয়ে যায়। ফলে তাদের আর বেশিদূর আগানো হয়ে উঠে না। ড. লুৎফুর রহমান প্রীতি উপহার বইয়ে বলেছেন, ২-৬ বছরের মধ্যে সুন্দরী স্ত্রীদের প্রতি স্বামীর আসক্তি দূর হয়ে যায়। তখন তাদের গুণ দিয়ে সংসারে টিকে থাকতে হয়। শশুড় শাশুড়ি, ননদ ও স্বামীদের মন জয় করে চলতে হয়। আর এটাই তাদের সংসার টিকিয়ে রাখে। এসব বিষয়গুলোর প্রতিও মেয়েদের গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে স্ত্রীদের কাউন্সেলিং করাতে হবে। তাদের স্বামীর সংসারের প্রতি ভক্তির বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। কাউন্সেলিং ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও সমাজের এ অধঃপতন প্রতিরোধ করা সম্ভব।
