আমিনে শাহিনের প্রতিবাদ: তুরস্কের রাজনীতিতে নতুন দিনের ইঙ্গিত

জোবায়ের আল মাহমুদ 

গত ১০ নভেম্বর তুরস্কের ‘এদিরনে’ শহরে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ২১ বছরের এক ছাত্রী বলেছেন, ‘তোমরা আতাতুর্ককে পূজা করছো। তোমরা আল্লাহর বিধান না মেনে আতাতুর্কের পশ্চিমা বিধান অনুসরণ করছো। অথচ, আতাতুর্ক তোমাদের প্রভু নয়।’ এ কথা বলার পর মৃত্যুবার্ষিকীতে কর্তব্যরত পুলিশ ঐ ছাত্রীকে গ্রেফতার করেছে। এ নিয়ে তুরস্ক ও বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়ায় প্রচুর সমালোচনা ও প্রতিবাদ হচ্ছে।

এখানে বেশ কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়।

প্রথমত, বাংলাদেশের পুলিশ-সেনাবাহিনী যেমন সরকারের কথা ছাড়া একবিন্দুও নড়েন না, তুরস্কের পুলিশ-সেনাবাহিনী তেমন নয়। তুরস্কের পুলিশ-সেনাবাহিনী তাদের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে সংবিধান ও আইন-কানুনকে বেশি অনুসরণ করে। তুরস্কের সংবিধানের ৫৪১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘আতাতুর্ক বা জাতির পিতার স্মৃতিসৌধকে কেউ উপহাস বা কটাক্ষ করলে তার ১ থেকে ৩ বছর জেল ও জরিমানা হবে। কেউ আতাতুর্কের মূর্তি, ভাস্কর্য বা কবর ভাঙলে বা নষ্ট করলে তাকে ১ থেকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হবে।’ সংবিধানের এ ধারাটির কারণেই পুলিশ আমিনে শাহিন নামের ঐ ছাত্রীকে গ্রেফতার করেছে।

দ্বিতীয়ত, আতাতুর্কের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের সময়ে আতাতুর্কের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্যে ঐ ছাত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার না করলেও পারতো। কিন্তু, তখন বামপন্থী ও আতাতুর্কপন্থী মিডিয়া ও রাজনীতিবিদরা সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলতো। এখন গ্রেফতার করার কারণে, ডানপন্থীরা এরদোয়ানের ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। যদিও এরদোয়ান ইচ্ছে করলেই সংবিধানের বাহিরে তেমন কিছুই করতে পারেন না। এরদোয়ান আস্তে আস্তে সংবিধান পরিবর্তন করছেন, কিন্তু একদিনেই সংবিধানের ইসলামবিরোধী সব ধারা-উপধারা পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। আমিনে শাহিন যেভাবে বোরকা ও নিকাব পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে পারছেন, সেটাও ১৫ বছর আগে সম্ভব ছিলো না। তখন কেবল হিজাব পরার কারণেও গ্রেফতার করা হতো। এমন কি উসমানি টুপি পরার কারণে তুরস্কে অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো। সংবিধানের কিছু ধারা-উপধারা পরিবর্তন করার ফলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীরা এখন বোরকা, হিজাব ও নিকাব পরে ক্লাস করতে পারেন। এবং আতাতুর্কের বিরুদ্ধে বলার আজকের এই সাহসও ধারাবাহিক পরিবর্তনেরই অর্জন।

তৃতীয়ত, ১০ নভেম্বর ২০১৮, সাবাহ পত্রিকার কলামিস্ট এনগিন আরদিচ (ENGİN ARDIÇ) লিখেছেন, ১৯৫৮ সালে ১০ নভেম্বর আতাতুর্কের শোক অনুষ্ঠানে হাসার কারণে তার শাস্তি হয়েছিলো। এরপর থেকে ১০ নভেম্বরের শোক অনুষ্ঠানে তিনি আর হাসেনও না, কাঁদেনও না। আরদিচ বলেন, তাঁরা যখন ছোট ছিলেন, তখন ১০ নভেম্বর হাসা নিষেধ ছিলো, ফুটবল খেলা নিষেধ ছিলো, সিনেমা ও নাটক দেখাও নিষেধ ছিলো। কিন্তু, এরদোয়ানের সময়ে বিষয়টা এমন হয়েছে যে, নিকাব পরা একজন মেয়ে আতাতুর্কের শোক অনুষ্ঠানে এসে মানুষকে বলতে পারছে, ‘তোমরা কেন আতাতুর্কের পূজা করছো? আতাতুর্ক তোমাদের প্রভু নয়।’ এমন বলার সাহস আগে কল্পনাও করা যেতো না।

চতুর্থত, ‘আতাতুর্ক প্রভু নয়’, এ কথার মাধ্যমে আতাতুর্ককে উপহাস বা কটাক্ষ করা হয় না। এটা যদি আদালতে প্রমাণিত হয়, তাহলে আমিনে শাহিন খুব দ্রুত মুক্তি পাবে।

সবিশেষ কথা এই যে, আমিনে শাহিনকে গ্রেফতার করার কারণে তুরস্কের তরুণদের মাঝে ব্যাপক প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। সোশাল মিডিয়াতে তরুণ মেয়েরা ও ছেলেরা ভিডিও আপলোড করে করে বলছেন, ” ‘আতাতুর্ক প্রভু নয়’, এ কথা বলা যদি কোনো অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে আমি এই অপরাধ করতে পারলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবো। আমিও বলছি, ‘আতাতুর্ক প্রভু নয়’। এবার আসুন আমাকেও গ্রেফতার করুন।” টুইটারে গত কয়েকদিন #আতাতুর্ক_প্রভু_নয় বা #Ataturkilahdegildir হ্যাশট্যাগ দিয়ে সবচেয়ে বেশি টুইট হয়েছে। তরুণদের এমন প্রতিবাদের কারণে আতাতুর্ক সম্পর্কিত সংবিধানের ৫৪১৬ নং ধারাটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে, আমিনে শাহিনের গ্রেফতার হবার ঘটনাকে কেন্দ্র করে, ৫৪১৬ নং ধারাটি পরিবর্তন করার জন্যে তুরস্কে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা ও আন্দোলনের সূচনা হয়েছে, যা মন্দ তো নয়ই, বরং তুরস্কের নতুন দিনের রাজনৈতিক অর্জনের পথে একটি মাইলফলক। সেই হিশেবে, আমিনে শাহিনের গ্রেফতারকে একরকম ‘শাপে বর’ই বরং বলা যেতে পারে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বর্তমানে তুরস্কের উলুদাহ ইউনিভার্সিটিতে ইসলামিক স্টাডিজে (তাফসির) মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

আগের সংবাদনির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন ইমরান এইচ সরকার
পরবর্তি সংবাদরাজধানীতে কুকুর জবাই করে আহার