
ওমর ফারুক
বিশ্ব তাবলিগ জামায়াতের অন্তর্কলহের প্রায় তিন বছর হতে চললো। এ তিন বছর নানা সংঘাত-সংঘর্ষ ও আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাবলিগ জামায়াতকে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী তাবলিগ জামায়াত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একটি গ্রুপ দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাযের বর্তমান আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভির পক্ষে, অপরটি তাবলিগের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু মুরুব্বীসহ আলেম ওলামাদের পক্ষে। দুটি গ্রুপের সঙ্গে কমবেশি আলেমরা জড়িত রয়েছে। মাওলানা সা’দ কান্ধলভির গ্রুপকে ‘এতায়াতি গ্রুপ’ বলেও সম্বোধন করা হয়। অপরটির সঙ্গে আলেম-ওলামাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি থাকায় ‘আলেম-ওলামাদের গ্রুপ’ বা ‘ওয়াজাহাতি গ্রুপ ‘বলে ডাকা হয়। আর এ গ্রুপের নেপথ্যে রয়েছে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা ও বাংলাদেশের আলেম-ওলামারা। সবমিলিয়ে বলা যায়, মাওলানা সা’দ কান্ধলভি একদিকে আর বিশ্বব্যাপী আলেমরা অন্যদিকে। বর্তমানে দুটি গ্রুপই মাঠে পর্যায়ে তাদের স্ব স্ব নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়ন এবং পক্ষের লোকদের সমর্থণ ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আলেমরা চাচ্ছেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের নীতি-আদর্শ থেকে যেন তাবলিগ জামায়াত এক চুলও সরে না যায়, অপরদিকে এতায়াতি গ্রুপটি চাচ্ছে বর্তমান আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভির আনুগত্য বজায় রাখতে।
দ্বন্দের সূত্রপাত
তাবলিগ জামায়াতের চলমান এ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৫ সালে। এ দ্বন্দের নেপথ্যে আছে তাবলিগের বর্তমান আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভির বিতর্কিত বক্তব্য ও ইসলামের মনগড়া ব্যাখ্যা। আলেমদের পক্ষ থেকে একাধিকবার মাওলানা সা’দকে সতর্ক করার পরও তিনি এর উপর অটল থাকেন। ফলে এ দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে এ দ্বন্দ্ব আজ সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ বি-বাড়িয়ার মারকায মসজিদেও সংঘর্ষে প্রায় ৩০-৩৫ জন আহত হয়েছে।
মাওলানা সা’দের বাড়াবাড়ি ও ভারতীয় আলেমদের যৌথ বিবৃতি
তাবলিগ জামাতের বিশ্ব মারকায হল দিল্লির ‘নিজামুদ্দিন মারকায’। ঐতিহ্য অনুযায়ী নিজামুদ্দিন মারকাযের আমিরকেই বিশ্ব তাবলিগের আমির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৪ সালে দিল্লির একটি হাসপাতালে তাবলিগ জামাতের আমির মাওলানা জোবায়েরুল হাসান মারা যাওয়ায় পর এর দায়িত্বে আছেন সম্প্রতি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব মাওলানা সা’দ কান্ধলভি। তিনি তাবলিগ জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.)-এর পুত্র মাওলানা হারুন কান্ধলভি (রহ.)-এর সন্তান।
দিল্লির নিজামুদ্দিনে প্রতিদিন বাদ ফজর তিনি বয়ান করে থাকেন। বেশ কিছুদিন ধরেই তার বক্তব্য নিয়ে নানা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, বিশেষত আলেমসমাজে। এরপর ধীরে ধীরে তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক প্রবল হয়ে উঠে, যখন ভারতের শীর্ষ উলামাগণ তার কোন কোন কথাকে ‘কুফরি কালাম’ সাব্যস্ত করে, এ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তার ব্যাপারে ফতোয়া দেওয়া হয়। তাতে সা’দ কান্ধলভির বেশ কিছু স্খলন, যেমন—ইজমার বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান, কোরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা এবং ইচ্ছেমত ভিত্তিহীন মনগড়া ফতোয়া ইত্যাদি উল্লেখ করে তাকে রুজু করা বা ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। ‘মাজলিসুল উলামা’ থেকে দেওয়া ফতোয়ায় সা’দ কান্ধলভির ৬টি বক্তব্যকে ‘কুফরি’ হিসেবে উল্লেখ করে পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়।
তার বিতর্কিত বক্তব্যের বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের পক্ষ থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজামুদ্দিনে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু এতে তেমন কোন ফল পাওয়া যায় না। বরং মাওলানা সা’দ তার বক্তব্যের ধারা বজায় রাখেন। এ বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রথম আলোচিত ঘটনা ছিল ২০১৬ সালের ২ ডিসেম্বর দারুল উলুম দেওবন্দের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি, নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্মৌর পক্ষে এর মুহতামিম মহাপরিচালক মাওলানা সাইয়্যিদ সালমান আহমদ নদভি এবং দিল্লির উলামাদের সর্বোচ্চ সংগঠন আইম্মা পরিষদের সভাপতি মুফতি ওয়াজাহাত কাসেমির মাওলানা সা’দের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি প্রদান। সম্মিলিত সেই বিবৃতিতে সা’দকে তওবার আহ্বান জানানো হয়, সেইসব বক্তব্য থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়। এভাবে ভারতীয় আলেম-উলামারা মাওলানা সা’দের বিভ্রান্তির ব্যাপারে একমত হন। খোদ ভারতীয় গণমাধ্যমে সেসময় মাওলানা সা’দের বক্তব্য সমালোচিত হয়। সবচে’ তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয় মক্কা-মদিনার পর দিল্লির নিজামুদ্দিনকে সর্বোচ্চ সম্মানীত ও মর্যাদাপূর্ণ জায়গা দাবি করার ব্যাপারটি। কোন কোন ভারতীয় গণমাধ্যম একে ‘সা’দের কুফরি কালাম’ বলে অভিহিত করে খবর প্রকাশ করে।
দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া
বিবৃতির পরও সা’দ কান্ধলভির পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। পূর্বের চিঠি চালাচালির মত এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এরপর দারুল উলুম থেকে ফতোয়া প্রদান করা হয়। সেই ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেন দারুল উলুম দেওবন্দের মুফতিয়ে আজম হাবিবুর রহমান খায়রাবাদি, দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি, চার মাজহাবের ফিকহে অত্যন্ত বিজ্ঞ হিশাবে প্রসিদ্ধ শায়খুল হাদিস মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি, মাওলানা আবদুল খালেক সাম্ভলি, মাওলানা আবদুল খালেক মাদরাজি, মাওলানা নেয়ামত উল্লাহ আজমি প্রমূখ খ্যাতিমান আলেমসহ আরও অনেক আলেম।
মাওলানা সা’দের রুজু বা ফিরে আসা
ফতোয়া প্রকাশের পর মাওলানা সা’দ দেওবন্দে রুজুনামা (বক্তব্য প্রত্যাহারপূর্বক একই ধরণের বক্তব্য আর না দেওয়ার অঙ্গিকারপত্র) প্রদান করেন। কিন্তু রুজুনামা যথাযথ প্রক্রিয়ায় না হওয়ায়, পূর্ণ রুজু না করায় মাওলানা সা’দের রুজুনামা দেওবন্দ প্রত্যাখ্যান করে। দেওবন্দ রুজুনামা লাভের কিছুদিন পরই মাওলানা সাহেবের কতিপয় ভক্তবৃন্দ বিশেষত মাওলানা সাহেবের নিকটাত্মীয় ও মাযাহেরে উলুম সাহারানপুরের নাযেম মাওলানা সালমান সাহেবের পক্ষ থেকে দারুল উলুম দেওবন্দের বক্তব্য খণ্ডন করে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে এবং তাদের খণ্ডনমূলক বক্তব্য এখনও অব্যাহত রয়েছে।
উপরন্তু মাওলানা সা’দকে দেওবন্দ থেকে বলা হয়েছিল যে, আল্লাহর পয়গাম্বর হযরত মুসা (আ.) সম্পর্কে ভুল ও অপবাদপূর্ণ বক্তব্য যেভাবে তিনি সর্বসাধারণের মাহফিলে দিয়েছেন, তেমনিভাবে সর্বসাধারণের মাহফিলে তিনি এ বক্তব্য প্রত্যাহারের ষোঘণা দিবেন। কিন্তু সা’দ সাহেব তা কখনই করেননি।
বাংলাদেশি আলেমদের ভারত সফর
ভারতীয় মিডিয়ায় দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া প্রকাশের পর মাওলানা সা’দ সম্পর্কে দেওবন্দের অবস্থান জানতে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ থেকে আলেমদের এবং কাকরাইলের শুরার সদস্যদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফর করেন। তারা দেওবন্দ, নিজামুদ্দিন, গুজরাট সফর করে। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার মোহতামিম মাওলানা মাহফুজুল হক, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার মুহাদ্দিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, কাকরাইলের শুরার পক্ষে ছিলেন মুরব্বি মাওলানা যুবায়ের আহমদ এবং সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, কাকরাইলের তরফে আরও ছিলেন কারি মাওলানা যুবায়ের আহমদ ও মাওলানা জিয়া বিন কাসেম। প্রতিনিধি দলের কাছে দেওবন্দ লিখিত বক্তব্য প্রদান করে। প্রতিনিধি দল ফিরে এসে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে প্রদান করে। জানা যায়, দেওবন্দ এখনও মাওলানা সা‘দ কান্ধলভির ওপর আস্থাশীল নয়৷ তাদের ভাষ্য, মাওলানা সা’দ আজ পর্যন্ত একবারও স্পষ্ট শব্দে রুজু করেননি৷ দেওবন্দ তাকে প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করে ঘোষণা দিতে বলেছিল। আজ পর্যন্ত তা তিনি করেননি।
২০১৮ সালের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের ঘটনা। মাওলানা সা’দ কান্ধলভিকে যেন বিশ্ব ইজতেমায় আসতে অনুমতি দেওয়া না হয় এ জন্য আলেমরা তৎপর হয়ে উঠেন। ২০১৭ সালে বছরব্যাপী এ বিতর্ক চলতে থাকে। বিশেষত ইজতেমার সময় এগিয়ে আসলে সে বিতর্ক নতুন করে প্রকট হয়। ইজতেমায় দিল্লির নিজামুদ্দিনের মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভির উপস্থিতি নিয়ে ২০১৮ সালের ০৬ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডের আয়েশা মসজিদে সারা দেশের উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিগণ পরামর্শ সভায় মিলিত হন। এতে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সর্বসম্মতভাবে।
প্রথমত, দাওয়াত ও তাবলিগ একটি দ্বীনি কাজ। দ্বীনের একটী গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং, দ্বীনের এই আহাম কাজের কোন বিশেষ মুরুব্বি, দারুল উলুম দেওবন্দের অনাস্থা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে এই আমলি কাজের বিশেষ ভূমিকায় থাকতে পারেন না।
অতএব, গত ২৪শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রতিনিধি দলের কাছে দারুল উলুম দেওবন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে মাওলানা সা’দের ব্যাপারে লিখিতভাবে অনাস্থাপত্র হস্তান্তর করায় আজকের এই সভা থেকে শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাওলানা সা’দের ব্যাপারে অনাস্থা প্রকাশ করছে।
দ্বিতীয়ত, ২৯ শে ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল আজকের এই শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখ পরামর্শ সভা তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানায়।
ওই একইদিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলেমদের ও তাবলিগের মুরুব্বিদের বৈঠক হয়। এ বৈঠকে ২১ জনের মধ্যে ১৩ জন এবারের ইজতেমায় মাওলানা সাদ না আসার পক্ষে মত দেন। এরা হলেন, বেফাকের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার মুহাদ্দিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা মোহাম্মাদ যোবায়ের, মাওলানা মুহাম্মাদ হোসাইন ও মাওলানা ফারুক, বেফাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, হাটহাজারী মাদরাসার সহকারী শিক্ষাসচিব মাওলানা আনাস মাদানী, তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা উমর ফারুক ও মাওলানা রবীউল হক, শাইখ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মাওলানা মিযানুর রহমান সাঈদ, হাটহাজারীর মুফতী কেফায়াতুল্লাহ, মাওলানা মুফতী মোহাম্মাদ আলী (আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের প্রতিনিধি), ভারত সফরকারী প্রতিনিধি দলের সদস্য জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হক।
তবে আলেমদের এ মতামতকে উপেক্ষা করে এবং বৈঠকের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দিনে মাওলানা সা’দ ঢাকায় আসেন। কওমি মাদ্রাসার ছাত্র এবং সাধারণ তাবলিগিদের একাংশ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘেরাও করে। দুপুর ১২টায় তিনি বিমানবন্দরে পৌছান। অবরোধের মুখে তিনঘণ্টা পর পুলিশি প্রহরায় তাকে কাকরাইল মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। কাকরাইলে বাড়তি পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, উলামায়ে কেরাম সা’দের ইজতেমায় অংশগ্রহণ না করার আশ্বাস পেয়ে অবস্থান কর্মসূচি তুলে নেন এবং যে কোনও মূল্যে মাওলানা সা’দকে ইজতেমায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দেন, ‘তাবলীগের দ্বন্দ্ব তারাই সুরাহা করুক।’
কাকরাইলে প্রথম সংঘর্ষ
মাওলানা সা’দ ফিরে গেলেও বাংলাদেশে তাবলিগ জামায়াতের ভেতরে চলতে থাকে অন্তর্দ্বন্দ্ব। এপ্রিল মাসে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্রে (মারকাজ) সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুটি গ্রুপ। সংঘর্ষের পর কাকরাইল মসজিদ দখলে নিয়েছেন আলেম ওলামারা। তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভির দেয়া কোনো সিদ্ধান্ত আর এ দেশে বাস্তবায়িত হবে না বলেই তারা ঘোষণা দেন।
দ্বন্দ্ব নিরসনে ওয়াজাহাতি জোড়
তাবলিগ জামায়াতের এ দ্বন্দ্ব নিরসনে তাবলিগের মুরুব্বী ও আলেমদের নেতৃত্বে গত ২৮ জুলাই রাজধানীর মুহাম্মদপুরে ওয়াজাহাতি জোড়ের আয়োজন করা হয়। সারাদেশ থেকে আলেম ওলামারা ও সাধারণ সাথীরা সেখানে জড়ো হন। জোড় থেকে ছয় দফা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, প্রয়াত তিন মুরব্বির উসুল থেকে ‘সরে যাওয়ায়’ মাওলানা সাদকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ।
এসময় আলেমদের শিরোমনি শাহ আহমদ শফী বলেন, ‘নবীর (সা.) লাঠির রেখার ওপর প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ। দেওবন্দের ফতোয়া মেনে চলতে হবে। তাবলিগের তিন মুরব্বি যে উসুলে কাজ করেছেন কেয়ামত পর্যন্ত সে উসুলেই চলবে। এ কাজের মুরব্বি হবেন উলামায়ে কেরাম। যারা আলেমদের অপমান করেছে, মারধর করেছে, তারা নয়। তাবলিগ আদব শেখায়। যাদের আদব নেই তাদের তাবলিগ কীসের!’
জোড়ে ৬ টি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
১. জমহুর উলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন, তিনটি মৌলিক কারণে- (ক) কোরআন ও হাদিসের মনগড়া ব্যাখ্যা, (খ) তাবলিগের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে তাবলিগ ব্যতীত দ্বীনের অন্যান্য মেহনত, যথা দ্বীনি শিক্ষা ও তাসাউফ ইত্যাদিকে হেয় প্রতিপন্ন করা। (গ) পূর্ববর্তী তিন হজরতজি (হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.), হজরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.) ও হজরত মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.)-এর উসুল ও কর্মপন্থা থেকে সরে যাওয়ার কারণে বর্তমানে মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ।
২. মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেব হজরত মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.) এর রেখে যাওয়া শুরায়ি নেযামকে উপক্ষো করে নিজেই নিজেকে আমির দাবি করেছেন, যা শরিয়তবিরােধী। তাই তার কোনােরূপ সিদ্ধান্ত-ফায়সালা বা নির্দেশ কাকরাইল তথা বাংলাদেশে বাস্তবায়িত করা যাবে না।
৩. দারুল উলুম দেওবন্দ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে নতুন কোনাে ফেরকা গঠনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কোনাে জামাত বা ব্যক্তিকে নেজামুদ্দিনে পাঠানাে বা কারো যাওয়া মুনাসিব হবে না। অনুরূপভাবে নেজামুদ্দিন থেকে আগত কোনাে জামাতকে বাংলাদেশের কোনো জেলায়/থানায় ইউনিয়নে কাজ করার সুযােগ দেওয়া যাবে না।।
৪. হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.), হজরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.) ও হজরত মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.) এর বাতানাে পদ্ধতিতে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ সারা দুনিয়াতে সমাদৃত ও গৃহীত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের তাবলিগের কাজ পূর্ববর্তী এই তিন হজরতের পদ্ধতিতে এবং উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। নতুন কোনাে পদ্ধতি চালু করা যাবে না। কাকরাইল, টঙ্গী ময়দান এবং জেলা মারকাযসহ সকল মারকায এই নীতিতেই পরিচালিত হবে।
৫. কাকরাইল মসজিদের যে সমস্ত শুরা সদস্য আমরণ মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবের ভ্রান্ত আকিদা অনুসরণের হলফনামা করেছেন যা শরিয়ত পরিপন্থী—তারা শুরার সদস্য থাকার যােগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন।অতএব, তাদেরকে তাবলিগের কাজে শুরা ও ফায়সাল না রাখার আহ্বান জানানাে যাচ্ছে ।
৬. ২০১৮-এ টঙ্গী ইজতেমায় সরকারের সাথে পরামর্শক্রমে আগামী ২০১৯-এর টঙ্গী ইজতেমার জন্য নির্ধারিত তারিখ- প্রথম পর্ব ১৮, ১৯, ২০ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় পর্ব ২৫, ২৬, ২৭ জানুয়ারি এর সাথে আজকের মজমা ঐকমত্য পোষণ করছে।
ফের কাকরাইলে সংঘর্ষ
ওয়াজাহাতি জোড়ের পরেও ফের প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে তাবলিগ জামাতের দুই গ্রুপ। ০৮ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর কাকরাইল মাসজিদ থেকে এক পক্ষকে বের করে দেয়ার অভিযোগ ওঠে আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে। এসময় বেশ কয়েকজনকে মেরে আহত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাবলিগ জামাতের একাংশের মুসল্লিরা। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বি-বাড়িয়ার মসজিদে সা’দপন্থীদের হামলা
সারাদেশব্যাপী ওয়াজাহাতি জোড় ছড়িয়ে পড়ার পর সা’দপন্থীরা হতে থাকে। সাধারণ মানুষদের মন থেকেও ভুল ধারণাগুলো উঠে যেতে থাকে। তবে সহিংস হয়ে উঠে এতায়াতিরা। তারাও পাল্টা জোড় ও বিভিন্ন মসজিদে আলেমদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। সর্বশেষ গত ৯ নভেম্বর বি-বাড়িয়ার মারকায মসজিদে তাবলিগের সাধারণ সাথীদের ওপর মাওলানা সা’দপন্থীদের হামলায় ৩০ জন আহত হয়েছে। মাগরিব নামাজের সময় সাধারণ সাথীরা মসজিদে প্রবেশ করার সময় মাওলানা সা’দপন্থীদের ৯০-১০০ জনের একটি বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাথীদের ওপর হামলা চালায়।
এ দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?
ওয়াজাহাতি জোড় আয়োজনকারীরা মনে করছেন এর মাধ্যমে মাওলানা সা’দ কান্ধলভির ভ্রান্তিগুলো তাবলিগ জামায়াতের সাধারণ সাথীদের থেকে দূর হয়ে যাবে। তবে চলমান অবস্থা বিবেচনাকরে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ সঙ্কট আরও ঘনিভূত হয়ে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে ভবিষ্যতে। হুমকর মুখে পড়তে পারে তাবলিগের পূণ্য কর্ম। সুতরাং, অতিদ্রুত এই সমস্যার সুরাহা করতে হবে।
