দেওবন্দি-বেরলভি বিতর্কের অবসান হবে কি?

ওমর ফারুক

দেওবন্দি ও বেরলভি। উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী দুটি ইসলামি ধারা। ইসলামের কিছু আকিদাগত বিষয়ে দুটি সিলসিলাতে যুগ যুগ ধরে তর্ক-বিতর্ক জারি আছে। দুটি ধারাই নিজেকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত বলে দাবি করে থাকে। তাদের মাঝে বিতর্কিত বিষয়গুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নবী (সা.) মাটির তৈরি নাকি নূরের তৈরি, ঈদে মীলাদুন্নবী পালন হবে নাকি সীরাতুন্নবী এসব। এ সকল বিষয় নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে চরম দ্বন্দ্ব তৈরি করে থাকে।

দেওবন্দি কারা ও দেওবন্দিয়াত কী? এ প্রশ্নের সুন্দর উত্তর দিয়েছেন দেওবন্দ মাদরাসার শাইখুল হাদীস মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী।

তিনি বলেন, ‘দেওবন্দিয়াত কী? তা আজ আলেমরা জানেনা, এমনকি দারুল উলুম দেওবন্দ পড়ুয়ারাও জানে না। দেওবন্দ তো এক শহরের নাম সবাই জানে কিন্তু দেওবন্দিয়াত কী আমাদের জানতে হবে। তিনি বলেন, দেওবন্দিয়াত তিন জিনিসের নাম : ১. ইহয়ায়ে সুন্নাত, তথা সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। ২. ইমহাউল বিদআহ তথাবিদআতের মূলোৎপাটন। ৩. তালাক্কি আনিস সালাফ, তথা সালাফে সালেহীন থেকে নেওয়া।

বেরেলভিদেরকে ‘রিজভী’ও বলা হয়। বেরলভি মতবাদের জন্ম ১৮৮০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলীতে, ইমাম আহমাদ রেযা খান (১৮৫৬-১৯২১ খৃ:) এর হাতে। ব্রিটিশ আমলে ‘আশেকে রাসূল’ নামে এই মতবাদটি সমধিক পরিচিত লাভ করেছিল। ব্রিটিশরা চেয়েছিল মহাভারতের আজাদী আন্দোলন ব্যাহত করতে হলে মুসলমানদের থেকেই এক দুইটা দলকে বেছে নিতে হবে। সেই চিন্তার সূত্র ধরেই তারা মুসলমানদের মধ্য থেকে কয়েকটি ভ্রান্ত/কথিত দলের সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এই দলটি শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ)-এর বংশধর, বিশেষত শাহ আব্দুল আযীয, শহীদ আহমেদ বেরেলী ও শাহ ইসমাঈল শহীদের (রহঃ)-এর ধর্মীয় চিন্তাধারা ও উলামায়ে দেওবন্দের আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য জন্মলাভ করে। রাসূল (সা.) প্রেমের আতিশয্য প্রকাশ করতে গিয়ে তারা জঘন্য ধরনের বহু শিরকী ও বিদ‘আতী আক্বীদা ও আমলের উদ্ভব ঘটিয়েছে।

বেরলভিদের উল্লেখযোগ্য আকিদা হচ্ছে, রাসূল (সা.) এমন ক্ষমতার অধিকারী, যার মাধ্যমে তিনি সারা দুনিয়া পরিচালনা করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নূরের তৈরী এবং তিনি হাযির (সর্বত্র উপস্থিত) ও নাযির (সর্বদ্রষ্টা)।

তাদের মতে, রাসূল (সা.) হলেন গায়েবজান্তা। এমন কি পঞ্চ-গায়েবের মধ্য হতে নানা শাখাগত জ্ঞান আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন। রূহের হাকিকত ও আল-কুরআনের মুতাশাবিহাত (প্রচ্ছন্ন বিষয়সমূহ) সম্পর্কে তিনি জ্ঞান লাভ করেছেন। ভূত-ভবিষ্যতের যতসব ঘটনা লাওহে মাহফূযে সংরক্ষিত হয়েছে এবং এ ছাড়াও অন্যান্য ঘটনা রাসূল (সা.) অবহিত ছিলেন। তবে, বেরলভিদের বড় বড় ইমামদের অনেকেই আবার এসব ব্যাপারে ভিন্নমত রাখতেন।

তাদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো ঈদে মীলাদুন্নবী বা রাসূল (স.) এর জন্মদিন। এই দিন তারা মহা ধুমধামে জশনে জুলুসের আয়োজন করে এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির আয়োজন করে থাকে। আর সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে তারা সাধারণত রাসূল (সা.)-এর ব্যাপারে বর্ণিত নানা দুর্বল ও জাল হাদীস দিয়ে তার অলৌকিকত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে।

বেরলভিদের অন্যতম আলেম ও দারুন্নাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতি ওসমান গনি সালেহী ঈদে মিলাদুন্নবী ও মিলাদের পক্ষে বেশ কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। ঈদে মিলাদুন্নবীর পক্ষে তিনি বলেন, ঈদ অর্থ হচ্ছে খুশি বা আনন্দ প্রকাশ করা। আর মিলাদ ও নবী দুটি শব্দ একত্রে মিলিয়ে মিলাদুন্নবী বলা হয়। আর নবী শব্দ দ্বারা রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) কে বোঝানো হয়েছে। এককথায়, ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ হুজুর পাক (সা.) এর পবিত্র ‘বেলাদত শরিফ’ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা।

আর পরিভাষায় বললে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর শুভাগমন স্মরণে খুশি প্রকাশ করে মিলাদ শরিফ মাহফিলের ব্যবস্থা করা, শান-মান, মর্যাদা-মর্তবা আলোচনা করা, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠ, তাওয়াল্লুদ বা জন্মকালীন ঘটনা মজলিস করে আলোচনা করা, দাঁড়িয়ে সালাম, কাসিদা বা প্রশংসামূলক কবিতা, ওয়াজ-নসিহত, দোয়া-মোনাজাত, সম্ভব মতো মেহমান নেওয়াজির সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করা।

তিনি বলেন, মহানবী (সা.) এর জন্মদিন সম্পর্কে আল কোরআনে আলোচনা করা হয়নি। কিন্তু হাদিস শরিফে মহানবী (সা.) এর জন্মকাল সম্পর্কে জানা যায়। হজরত আবু কাতাদা আল আনসারি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সোমবার দিন রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিনে (সোমবারে) আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমি নবুয়ত পেয়েছি।’ (মুসলিম)। ঐতিহাসিক মুহাম্মদ বিন ইসহাক (রহ.) এর মতে, রাসূল (সা.) হিজরি সালের (৫৭০ খ্রি.) রবিউল আউয়াল মাসে ১২ তারিখ সোমবার জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি আরও বলেন, নবী করিম (সা.) সোমবার রোজা রেখে নিজের জন্মদিন স্মরণ করতেন। এর দ্বারা ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের বৈধতা ও গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। তারপরও কিছু লোক ঈদে মিলাদুন্নবী পালন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন। তাদের জবাবে কোরআন মজিদ থেকে একটি আয়াত তুলে ধরছি। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা সেই নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা তোমাদের আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন।’ হজরত ওমর (রা.) বলেন যে, এই নেয়ামত দ্বারা মুহাম্মদ (সা.) কে বোঝানো হয়েছে।

এছাড়াও বেরলভিরা মনে করেন, নবী (সা.) নূরের তৈরি। এ প্রসঙ্গে মুফতি আব্দুল মালেক তাদের এ সকল আকিদাকে ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, কুরআনে কারীমের ঘোষণা ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা এই যে, আল্লাহর রাসূল বাশার তথা মানব ছিলেন। তবে তিনি ছিলেন সাইয়েদুল বাশার মানবকুল শিরোমণি। আল্লাহ পাক তাঁকে হেদায়েতের নূর ও ‘সিরাজুম মুনীর’রূপে প্রেরণ করেছেন। কিন্তু বেরলভি জনসাধারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মানবসত্তার অস্বীকারকারী। তাদের আকীদা হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তাকে নূর দ্বারা তৈরি করা হয়েছে, যা কুরআন-হাদীসের ঘোষণার সম্পূর্ণ বিরোধী। এছাড়া তিনি ঈদে মীলাদুন্নবীকেও তাদের নব্য আবিস্কার বলে উল্লেখ করেছেন।

দেওবন্দি ও বেরলভিদের এ তর্ক বিতর্কের কি কোনো নিরসন নেই? তর্ক বিতর্কের মাঝেও কী সামাজিক বা রাজনৈতিক ঐক্য সম্ভব নয়? এ বিষয়ে তেজগাঁও মাদরাসার শাইখুল হাদীস ড. মুশতাক আহমদ বলেন, সকল মানুষ আদম সন্তান। সকলে ভাই ভাই। মানুষ মানুষের শত্রু হয় না। তাই নিজেদের মধ্যে দেওবন্দি-বেরলভি, ওহাবী-সুন্নী শিরোনামে বিভেদের ঘৃন্য প্রাচীর নির্মান করা যাবে না। মানুষের শত্রু হল নাফস, শয়তান, দুনিয়া ও গাইরুল্লাহ।

তিনি বলেন, এসব রেষারেষি আর হানাহানি বাদ দিয়ে সকল আদম সন্তানকে ভাই হিসেবে নিজ বুকে জড়িয়ে নিতে হবে। আমরা গড়বো আমাদের মধ্যে পারস্পরিক দয়ামায়া, আনন্দ, প্রেম, ভালবাসা, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, অপরের মর্যাদাবোধ ও পরম কল্যাণকামিতা। এটাই হল বস্তুত আমাদের নবী সাহাবী আসলাফ ও পীর মাশায়েখের আদর্শ।

মুহাম্মদ ফুরকান হুসাইন জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়ার মুদাররিস ও আল্লামা সুলতান যওক নদভি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সহ. সেক্রেটারি মোহাম্মদ ফোরকান হুসাইন বলেন, ‘দু’দলের আকিদাগত মতান্তরের কারনেই আজকের এই সামগ্রিক মনান্তরের উদ্ভব। পরস্পরিক ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক ঐক্য যদিও সম্ভব কিন্তু সামাজিক ঐক্য সহজেই সম্ভব নয়। কারণ আমাদের ভৌগলিক পরিবেশ ও লালিত চেতনা এমনটা নয়। এখানে প্রত্যেকেই স্ব-স্ব চেতনায় আপোষহীন। কেউ কাউকে মেনে নিতে চায় না।’

দেওবন্দি-বেরলভি বিতর্ক বৃটিশ আমল থেকেই উপমহাদেশে মুসলিম ঐক্যের একটি প্রধান অন্তরায়। ইসলামের মৌলিক আকিদার জায়গায় ছাড় না দিয়েও সামাজিক-রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার সংস্কৃতিই ছিলো ইসলামের সোনালি যুগের সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি আবার ফিরে আসুক, এটাই সকলের চাওয়া।

আগের সংবাদবিএনপির ৩ নেতা গ্রেফতার
পরবর্তি সংবাদনির্বাচনে কালো টাকা, পর্যবেক্ষণ করবে দুদক