পাড়ি দিতে হবে এখনও অনেক পথ, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে আহামরি কোনো উন্নতি হয়নি : মাওলানা ইউসুফ সুলতান

মাওলানা ইউসুফ সুলতান। বিশিষ্ট ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ। সিটিও ও শরিয়াহ-টেক কনসাল্টেন্ট, ইথিস ভেঞ্জারস। কো-ফাউন্ডার, আই এফ অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কনসালটেন্সির। সাবেক সহকারী মুফতি, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ। তরুণ আলেম এ অর্থনীতিবিদের মুখোমুখি হয়েছিল ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর। বাংলাদেশের গত ১০ বছরের অর্থনৈতিক অবস্থান, সঙ্কট, সম্ভাবনা, আলেমদের করণীয়—নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। উঠে এসেছে গত ১০ বছরের অর্থনৈতিক চিত্র। এবং আরও নানা কিছু। ইফতেখার জামিলের নেওয়া সাক্ষাৎকার গ্রন্থনা করেছেন হামমাদ রাগিব।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সঙ্কটগুলো কী কী?

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলতে গেলে সঙ্কটগুলোর কথাই প্রথমে চলে আসে। এখানে প্রথমে আমি কয়েকটি সূচকের কথা উল্লেখ করতে চাই। এক নম্বর সূচক হচ্ছে, দুর্নীতি বা করাপশন ইনডেক্স। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানের র‌্যাঙ্কিং অনুসারে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ১৮০টা দেশের মধ্যে ১৪৩ তম হয়েছে। যত পেছনে তত করাপ্ট। বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৮। জিরো হচ্ছে হাইলি করাপ্ট এবং ১০০ হচ্ছে একদম শুন্য করাপ্ট। সে জায়গায় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৮ অর্থাৎ শূন্যের অনেক কাছাকাছি। ২০১৭-এর এ জরিপে যদি আমরা দেখি, তবে এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপরে রয়েছে মায়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, গুয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া, ভুটান—এ সবগুলো দেশ। বাংলাদেশের পরে রয়েছে শুধুমাত্র কম্বোডিয়া এবং আফগানিস্তান।

তো আফগানিস্তান একটা যুদ্ধ জর্জরিত দেশ। কম্বোডিয়াও ওরকম সমস্যা জর্জরিত। মানে বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার, নেপাল, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম—এসব দেশ ট্রান্সপারেন্সি বা দূর্নীতির দিক থেকে অনেক অনেক ভালো র‌্যাঙ্কিং-এ আছে।

দ্বিতীয় আরেকটা সূচক নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই, সেটা হচ্ছে যে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটা ইন্ডিকেটর আছে ‘ ডুইং বিজনেস’ নামে। ডুইং বিজনেস ডট ওআরজি। এখানে মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়ার ওপর ভিত্তি করে—যেমন সেখানে বিজনেস শুরু করাটা কতটুকু সহজ, বিভিন্ন পারমিট, লাইসেন্স নেওয়া, ইলেক্ট্রিসিটি লাইন নেওয়া, ইউটিলিটি নেয়া, প্রপার্টি রেজিস্ট্রেশন করা ইত্যাদি বিষয়কে সামনে নিয়ে তারা একটা র‌্যাঙ্কিং করে থাকে। র‌্যাঙ্কিংটা ইন্ডিকেট করে যে, দেশটা কতটা বিজনেস ফ্রেন্ডলি। মানুষ এখানে বিজনেস করতে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।

এ র‌্যাঙ্কিংটা যদি আমরা দেখি, তাহলে সাউথ এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে নীচে। বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ১৭৬। বাংলাদেশের উপরে আছে আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান। এবং ইন্ডিয়া সবার উপরে। ইন্ডিয়ার র‌্যাঙ্কিং হচ্ছে ৭৭। এমনকি পাকিস্তানের র‌্যাঙ্কিংও হচ্ছে ১৩৬। নেপাল ১১০। ভুটান ৮১। আর বাংলাদেশের র‌্যাঙ্কিং ১৭৬!

এই দুইটা জিনিসকে যদি আমরা পাশাপাশি রাখি, দুর্নীতির দিক থেকে বাংলাদেশের র‌্যাঙ্কিং যেমন, ১৪৩—অনেক নিচে এবং বিজনেস ফ্রেন্ডলি হওয়ার দিক থেকেও র‌্যাঙ্কিং ১৭৬ – অত্যন্ত নীচে।

আমরা যদি আরেকটা ড্যাটা দেখি, বৈদিশিক বিনিয়োগ— বাংলাদেশে কতটা এসেছে গত ১০ বছরে, তাহলে আমরা দেখব, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট এসেছে, সেটা ছিল জিডিপির ০.৮১ পার্সেন্ট। আর ২০১৭-তে এসে সেটা হয়েছে ০.৮৬ পার্সেন্ট। যেটা গত কয়েক বছরেও একের ওপরে ছিল।

তো এদিক থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ফরেন ইনভেস্টমেন্ট তো বাড়েনি, বরং কমের দিকে, বিদেশিরা এখনও এ দেশে বিনিয়োগ করতে সেভাবে আগ্রহী না। এবং কেন আগ্রহী না, সেটা আগের দুই ইন্ডিকেটর নিয়ে যে আলোচনা করলাম, তা দ্বারাই বুঝে আসে।

আরও দুইটা বিষয়, ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে একটা। ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণখেলাপির দিকে যদি আমরা নজর দিই, বিশ্বব্যাংকের ড্যাটা অনুসারে ২০১১-তে সেটা ছিল মাত্র ৫.৮৪ পার্সেন্ট। টোটাল যে লোন দেওয়া হয় ব্যাংকিং সেক্টরে সে লোনের মধ্যে নন পারফর্মিং বা ঋণখেলাপির পরিমান ছিল ৫.৮৪ পার্সেন্ট। আর ২০১৮-এর মার্চের ড্যাটা অনুসারে সেটা অলরেডি ১০.৮ পার্সেন্ট। অর্থাৎ ডাবল হয়ে গেছে গত সাত বছরে। তার মানে ব্যাংকিং সেক্টরে ইজি লোন এবং খেলাপি লোন অনেক অনেক বেড়ে গেছে৷যা মূলত দেশের অর্থব্যবস্থার অন্যতম উপাদান – ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্বলতা প্রকাশ করছে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুইফট হ্যাক করে কোটি টাকা সরানো, ভুয়া কোম্পানির নামে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারী ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রদান–এ সবই ব্যাংকিং সেক্টরের নিরাপত্তাহীনতা ও চূড়ান্ত দুর্বলতা প্রকাশ করছে।

অপরদিকে আমরা বৈদিশিক ঋণের দিকটা যদি দেখি, বিশ্বব্যাংকের ড্যাটা অনুসারে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বৈদিশিক ঋণ ছিল ২০ বিলিয়ন ইউ এস ডলারের মতো। ২০১৭-তে এসে সেটা ২৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার অতিক্রম করেছে। আমরা ক্রমান্বয়ে ঋণগ্রস্ত হচ্ছি, প্রতি বছর ঋণ সুদে আসলে পরিশোধ করছি, আবার অভ্যন্তরীন সম্পদগুলো লুট করে খাওয়া হচ্ছে।

এক্সপোর্টের দিকটা যদি দেখি, বিদেশে আমরা কতটা এক্সপোর্ট করছি, আমাদের জিডিপি কিন্তু গত দশ বছরে অনেকটা বলা যায় যে, প্রায় সমান্তরালে মুভ করছে, ৫-৬% প্রতি বছর। যদিও রিসেন্ট কিছু গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ যেভাবে জিডিপি করে থাকে এটা কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বাইরে। তো জিডিপির পার্সেন্টিজ হিসাবে ২০০৭-এ আমাদের টোটাল এক্সপোর্ট ছিল ১৬.৯৯ পার্সেন্ট। ২০১৭-তে এসে সেটা হয়েছে ১৫.০৩ পার্সেন্ট। গত দশ বছরে এক্সপোর্ট বাড়ে নি, উল্টো জিডিপির আনুপাতিক হারে প্রায় ২% কমেছে। এ হিসেবে এক্সপোর্ট আরও বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা সেভাবে আমাদের এক্সপোর্ট ডাটাতে রিফ্লেক্ট হতে দেখিনি। ২০১৭ সালে আমাদের মোট এক্সপোর্ট ছিল ৩৭.৫৪ বিলিয়ন ইউএসডি, আর ইম্পোর্ট ছিল ৫০.৬১ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এখানে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ইউএসডির ডেফিসিট আছে, যা জিডিপিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। অবশ্য বাংলাদেশ বরাবরই ইম্পোর্ট বেশি করে থাকে, এক্সপোর্টের চেয়ে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে হবে, এক্ষেত্রে আমরা চায়নাকে অনুকরণীয় হিসেবে দেখতে পারি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যথেষ্ঠ সম্ভাবনাময়। এখানে লেবার-কস্ট অত্যন্ত কম, প্রচুর পরিমাণ হিউম্যান রিসোর্স আছে, যাদেরকে একটু স্কিল্ড করে নিলে আমরা প্রচুর কাজ নিতে পারি, বিদেশেও এক্সপোর্ট করতে পারি। এছাড়াও আমাদের রয়েছে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক রিসোর্স। এখন প্রয়োজন শুধু দক্ষতা বাড়ানো, এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব।

এই সম্ভাবনার জায়গাটাকে আমরা ব্যবহার করতে পারছি না, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবকাঠামো দূর্বল হওয়ার কারণে। এই যে ট্র্যাফিক জ্যম, এটা থেকে শুরু করে অন্যান্য যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলোও একটা বড় বাঁধা। হ্যাঁ, ইন্টারনেট-ইলেক্ট্রিসিটি যথেষ্ট ভালো হয়েছে, তবে আরও ভালো হওয়া প্রয়োজন। ট্রাফিকজ্যামের কারণে এই যে সময়ের অপচয়, অন্যান্য সমস্যা, দুর্নীতি ও বিজনেস ফ্রেন্ডলি না হওয়া—এইসব আমাদের অর্থনীতিকে সামনে বাড়তে দিচ্ছে না। আমাদের কাছে কিন্তু যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে, অথচ আমরা এগোতে পারছি না। এক জায়গায় আটকে আছি। এমনিতে যে উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে, সেটা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়ার মতো। এমন না যে, এ উন্নয়নটা আমাদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর কারণে হচ্ছে। বরং বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে বিধায় অটোমেটিকলি এ উন্নয়ন হচ্ছে। কেউ যদি একটা ভিড়ের মধ্যে থাকে, আর ভিড়টা সামনের দিকে যেতে থাকে তাহলে ওই লোকটা যেমন অটোমেটিকলি সামনের দিকে যাবে, আমাদের এ উন্নয়নের ব্যাপারটা হচ্ছে তেমন। কিন্তু আমাদের যে সম্ভাবনাটা ছিল সে সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা সামনে যেতে পারছি না।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

নির্বাচনী ইশতেহারে আমি যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছি সেগুলোর সমাধানের ব্যাপারটা এসেছে। এই জায়গাটায় আমি দেখেছি বিভিন্ন দল ইতিমধ্যে কথা বলেছে। ঋণখেলাপি কমানোর কথা, দূর্নীতি দমনের ওয়াদা—মোটামুটি সব ব্যাপারেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তারা এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বাড়ানোর কথা বলেছেন, ভিসি ফান্ডের কথা বলেছেন। এ দুইটা ব্যাপার কিন্তু আমাদের দেশ বিজনেস ফ্রেন্ডলি না হলে আসবে না। আমাদের কিন্তু অনেকে স্কিলড ওয়ার্কার আছে, বিশেষ করে আইসিটিতে, অথচ ক্যাপিটাল ফান্ড তারা সেভাবে পাচ্ছে না। কারণ, দেশই যদি বিজনেস ফ্রেন্ডলি না হয়, তাহলে ভিসি ফান্ডগুলো কীভাবে এখানে আসবে?
ইশতেহারগুলোতে তো এই সব সমস্যা সমাধানের কথা রয়েছে, কিন্তু সে ইশতেহারগুলো কত পার্সেন্ট বাস্তবায়ন হবে, তা দেখার বিষয়। গত ৫ বছর আগে একটা নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছিল, নির্বাচন হলো কি হলো না, সেদিকে আমি যাচ্ছি না, সেসময়ও কিন্তু কিছু ইশতেহার আমাদের দেওয়া হয়েছিল। এরও ৫ বছর আগে ইশতেহার এসেছে। সেসব ইশতেহার কত পার্সেন্ট বাস্তবায়ন হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো স্টাডি আমরা দেখিনি। ইশতেহার তৈরির সময় কিন্তু ঠিকই অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। অনুরূপ বাজেট ঘোষণার সময়ও আমরা অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়, কিন্তু সেটা পরে বাস্তবায়ন হলো কী না, এ ব্যাপারে কোনো আলোচনা আমরা দেখতে পাই না। এই পর্যালোচনা থেকে কিন্তু আমরা বরাবরই বঞ্চিত হয়ে আসছি।

হ্যাঁ, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে যেটা বলেছে, আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এর বাস্তবায়ন নিয়ে অতীত ইতিহাস আমাদের আশান্বিত করতে পারছে না। তাই নির্বাচনের পর আমাদের প্রত্যেকেই যেন একে অপরকে এই ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সজাগ রাখে! আলোচনা-পর্যালোচনা অব্যাহত রেখে গর্ভমেন্টকে যেন একটা চাপ দেওয়া হয়। তাহলে আশা করি আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

এর মধ্যে ইসলামী বিকল্প কী হতে পারে?

ইসলামি বিকল্প কী হতে পারে, বলতে গেলে আমাদের যেতে হবে নবিজীবনের অধ্যায়ে। নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সময়কার মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে যদি আমরা নজর দিই, তাহলে দেখতে পাব, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদীনার বাজারে সবাইকে সমান সুযোগ করে দিয়েছেন। একচেটিয়া ব্যবসা, গুদামজাত করা—ইত্যাদি যেসব ব্যাপার স্বাভাবিক চাহিদা-যোগানকে বাধাগ্রস্ত করে, সেগুলো তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। সেখান থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে আমাদের অর্থব্যবস্থাকে বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্য দিয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বানাতে হবে। কেবল নির্বাচনের ক্ষেত্রেই আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলি, অর্থব্যবস্থাতেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দরকার আছে।
সরকারের কাজ সে ফিল্ডটা প্রস্তুত করা, অর্থনীতির চাকা এমনিতেই ঘুরবে। ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুদী ব্যাংকগুলোর সমান সুবিধা প্রদান করতে হবে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, এতে জনগণ স্বল্পমূল্যে পণ্য ও সেবা পাবে।

ইসলামি বিকল্প এটাই। উপরে যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম, সেটাকে এই ছাঁচে ফেলে সমাধানের চেষ্টা করা। ইসলামি দৃষ্টিকোণ এটাই বলে এবং সমাধানের জন্য এটাই কার্যকর পন্থা।

বেকারত্ব ও দুর্নীতি মোকাবেলায় ঠিক কী করা যেতে পারে?

এখানে দুইটা বিষয় আছে। একটা হচ্ছে, আমরা মালয়েশিতে যেটা দেখি, মানুষের নিত্তনৈমিত্তিক জীবনকে সুন্দর করে—এমন কিছু ম্যাসেজ বিভিন্ন অ্যাডভাইসের মাধ্যমে—চাই সেটা টেলিভিশনে হোক, ব্যানার-ফ্যাস্টুন দিয়ে হোক কিংবা বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে স্টিকার লাগিয়ে হোক—মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। একটা ম্যাসেজ মানুষের চোখে যখন বারবার পড়বে, সেটা তার মাইন্ডে ঢুকে যাবে এবং একসময় নিজের অজান্তেই সে এ থেকে অনুপ্রাণিত হবে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, দুর্নীতি মুকাবেলায় প্রত্যেককে সচেষ্ট হওয়া। রাষ্ট্রে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে নিয়ে সাধারণ জনতা পর্যন্ত সবাই এ ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন দৃষ্টি রাখা। রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতে দুর্নীতি করতে না পারে সে জন্য প্রত্যেকটা কাজে শক্ত জবাবদিহিতার অপশন রাখা। পাশাপাশি আমাদের শিক্ষাসিলেবাসে দূর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কিছু পাঠ যোগ করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষত ইউটিউবাররা শর্টফিল্ম তৈরির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মানুষকে দূর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতে হবে। এবং আলেমরাও যার যার অবস্থান থেকে দূর্নীতির ধর্মীয় কদর্যতার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করে তুলবেন।

আর বেকারত্বের ব্যাপারে কথা হচ্ছে, চাকরির বাজারে সঙ্কট থাকবেই। এবং এটা শুধু বাংলাদেশ না, পুরো বিশ্বেই সত্য। আবার এটাও সত্য যে, যখন কোনো স্কিলড ওয়ার্কার বা প্রফেশনালকে খুঁজতে যাই তখন কিন্তু আমাদেরকে বেগ পেতে হয়। অর্থাৎ আমাদের প্রচুর ওয়ার্কার আছেন, গ্র্যাজুয়েট আছেন, কিন্তু তারা যথার্থভাবে স্কিলড না। তাদেরকে বিভিন্ন স্কিল নিয়ে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার কিছু উদ্যোগ নিতে পারে, কিন্তু যার যার জায়গা থেকে এটার প্রেরণা আগে আসতে হবে৷ বিশেষ করে আমরা এখন নতুন একটা যুগের দিকে ট্রান্সফার হচ্ছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-র যুগ। শিল্পায়নের শুরুতে আমরা দেখছি প্রচুর মানুষ জবলেস হয়ে গেছে মেশিনের মুকাবেলায়। শিল্পায়নের যুগ পেরিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে আগামী ১০ বছরে অনেক অনেক মানুষ চাকরি হারাবে। তাই এখন থেকে যদি প্রত্যেকে নিজেকে স্কিলড না করে, তাহলে বেকারত্বের হার কেবল বাড়বেই। অফিস-ফ্যাক্টরিগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করবে। রোবট ব্যবহার করবে। যার কারণে মানুষদের জব কমে আসবে। তাই সবসময় নিজেদেরকে আপস্কিল করা বা নতুন স্কিল শেখা জরুরি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম প্রচুর পরিমাণ সময় নষ্ট করে থাকে। সরকারের কাজ কিন্তু তাদেরকে শিখিয়ে দেওয়া না। আমরা দেখেছি সরকার বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েছে তাদেরকে শেখানোর জন্য। এটা ভালো দিক, কিন্তু সরকারের মূল কাজ হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের বিভিন্ন অংশকে, যেমন স্টুডেন্ট যারা আছে তাদেরকে আগ্রহী করে তোলা। এবং বিভিন্ন এনজিও সংস্থাকে তরুণদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য উদ্যোগী করে তোলা হচ্ছে সরকারের কাজ। সরকারের মূল কাজ হচ্ছে এভাবে ফ্যাসিলিটেট করা, ক্ষেত্র তৈরি করা। কিন্তু সরকার যখন সব কাজ করতে যাবে, তখন ইনব্যালেন্স হবে, ঋণ বাড়বে ইত্যাদি। কোনো কাজই পুরোপুরি করতে পারবে না।

যাই হোক, বেকারত্ব দূর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে সবসময় আপ স্কিল করা।

মাদরাসার মেধাবীরা পড়াশোনা শেষ করে মাদরাসায়ই কাজ করছেন, সাধারণ শিক্ষিতদের মধ্যে সরকারী চাকরীতে ঢুকার প্রবণতাও অনেক বেশী, আপনার কাছে কি মনে হয়, আমাদের দেশে উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা অনেক কম, অনেকে অভিযোগ করছেন, আমাদের রাষ্ট্রের পরিসর অকারণে বাড়ানো হচ্ছে, ধর্মীয় অঙ্গনে অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অনেক মেধা নষ্ট হচ্ছে, এটা কি ঠিক?

প্রশ্নটা অনেক বড়। আমি জাস্ট একটা পয়েন্ট এখান থেকে নেবো। উদ্যোগ ও উদোক্তার কমতি আছে কি না। হ্যাঁ, আমাদের দেশে উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা অনেক কম। আজকে আমরা ফেসবুক নিয়ে গর্ব করি, গুগল নিয়ে গর্ব করি, এ ধরনের এন্ট্রিটি নিয়ে আমরা গর্ব করি, প্রাউড ফিল করি। তো এগুলো আসল কোথা থেকে? এ সবগুলোর রুট হচ্ছে সিলিকনভ্যালি। কিন্তু ওয়াই সিলিকনভ্যালি ইস সো স্পেশাল? এখানে আলাদাভাবে এত কী আছে, যা পৃথিবীর অন্য জায়গায় নেই? এখানে যেটা আছে—প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট, স্টুডেন্ট থাকাকাল থেকেই একজন ভাবি উদ্যোক্তা হিসেবেই বড় হচ্ছে। বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে তখন থেকেই তারা কাজ শুরু করে দেয়। এবং প্রজেক্টের জন্য সহজেই ফান্ড পায়। এই যে স্টুডেন্টদেরকে উদ্যোক্তার মানসিকতা নিয়ে গড়ে তোলা, একজন উদ্যোক্তার জন্য যে যে বিষয় জানা দরকার, সে বিষয়গুলো জানা এবং ফান্ডিং ব্যাপরটা—এই দুইটা জায়গা নিশ্চিত করতে হবে নতুন সরকারকে।

উদ্যোক্তার মানসিকতা তৈরির জন্য বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে ইউনিভার্সিটিগুলোতে। পাশাপাশি জব সৃষ্টির স্রষ্টা তৈরি করতে হবে। কেবল যদি আমরা ফরেন ইনভেস্টমেন্টের আশায় বসে থাকি, তাহলে হবে না।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমাদের কিন্তু অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ আইসিটি সার্ভিসের দিক থেকে অন্যতম একটা দেশ। এখান থেকে সফটওয়্যার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সার্ভিস কিন্তু অন্যান্য দেশে দিচ্ছে প্রচুর তরুণ। এই জায়গাটাকে জাস্ট আরেকটু ফুয়েল করতে হবে।

নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ সমস্যা হচ্ছে, আইনি জটিলতা ও ফান্ডিংয়ের অভাব, একে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

এটা কিন্তু আমি আগেই ডুইং বিজনেস নিয়ে কথা বলার সময় আলোচনা করে ফেলেছি। বাংলাদেশে এই জিনিসটা বেশ কঠিন। আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ এই জায়গাটায় যথেষ্ট রক্ষণশীল। দেখুন, অামেরিকাতে একটা বিজনেস শুরু করা অল্প সময়ের ব্যাপার। সকল উন্নত দেশেই এ চিত্র দেখা যায়। সিঙ্গাপুরে একই অবস্থা। তো, আমার একটা বিজনেস খুলতে যখন লম্বা সময় লাগবে, তখন সহজে আমি এ লাইনে আসতে চাইব না। তাই এই জায়গাটায় আমি মনে করি বাংলাদেশের যথেষ্ট কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে ফিনান্সিয়াল সেক্টরে আমি যেটা মালোয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন, সৌদিআরব, আরব আমিরাত—ইত্যাদি দেশে দেখেছি, সবাই ‘স্যান্ডবক্স’ নামে একটা জিনিস চালু করেছে। স্যান্ডবক্স বলতে তারা যেটা বুঝাচ্ছে, যে, সেন্ট্রাল ব্যাংকের আন্ডারে একটা ডিপার্টমেন্টের মতো থাকবে, যেটাকে তারা বলে রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স। এখান থেকে যেকোনো ধরনের উদ্যোক্তা বিভিন্ন ফিনেন্সিয়াল সার্ভিস নিয়ে কাজ শুরু করতে পারবে। এই শুরুর জন্য তাদেরকে বিশেষ কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন পড়বে না। বরং আভ্যন্তরীণ যে লাইসেন্সগুলো আছে, সেটার সঙ্গে যদি তাদের কোনো কনফেক্ট হয়, সেক্ষেত্রে সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদেরকে সুযোগ করে দেবে। যেন তারা লাইসেন্সের মারপ্যাঁচে না গিয়ে কমপক্ষে এক বছর বা দুই বছরের জন্য নিজেদের সার্ভিসটাকে পরীক্ষা করতে পারে। এক বছর বা দুই বছর পর যখন দেখবে সার্ভিসটা ভালো হচ্ছে, মানুষ সেটাকে গ্রহণ করছে, তখন তার জন্য প্রয়োজনে আইনকে সংশোধন করে সুবিধা করে দেবে। আমাদের দেশে হয় কী, আইনের মারপ্যাঁচের কারণে অনেক সময় উদ্যোক্তাদের বিমুখ করে দেওয়া হয়। কাজেই এটা না করে উদ্যোক্তাদের আগে কাজের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন।

ইসলামপন্থী দলগুলো ইসলামি অর্থনীতির বিকল্পের ওপর কতটুকু জোর দিতে পারছে?

আমার চোখে আসলে আলাদাভাবে তেমন কিছু পড়েনি। অন্যরা যেভাবে অর্থনীতির যে কথাগুলো বলেছেন, ইসলামি দলগুলোর ইশতেহারে সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি দেখেছি। বিকল্প তেমন কিছু পাইনি। বরং আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যে, এই ইসলামি দলগুলোর আলাদাভাবে একটা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে তেমন কোনো রূপরেখা নেই।

আগামী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের কোথায় নজর দিতে হবে বলে আপনি করেন?

আসলে অর্থনীতির পরিপূর্ণ কাঠামো নিয়ে তাদের ভাবতে হবে। একদম গর্ভমেন্টের বাজেট থেকে শুরু করে ব্যংকব্যবস্থা—সবকিছু নিয়ে তারা যখন চিন্তা করবেন, তখন বাংলাদেশের উপযোগী অর্থনীতির একটা মডেল আমরা দেখতে পারব আশা করি৷

একটা অর্থনৈতিক চিন্তা ও কৌশল প্রণয়নের জন্য সচেতনতা ও প্রতিবেদনও জরুরী। আপনি কি মনে করেন, এ ক্ষেত্রে ইফতা বিভাগগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে?

অবশ্যই এখানে ইফতা বিভাগগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, ইফতা বিভাগগুলোর স্টাডির বিষয় হচ্ছে শরিয়াহ। কাজেই তাদেরকে এককভাবে এভাবে আলোচনার দিকে ঠেলে না দিয়ে তাদের সঙ্গে যদি আমরা ইউনিভার্সিটির যারা ইকোনমিক্স নিয়ে পড়ছেন, স্টাডি করছেন, তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটা সমন্বয় করতে পারি, তাহলে সেটা অনেক ফ্রুটফুল হবে। এবং এতে যেটা হবে, যে, জেনারেল লাইনে যারা পড়াশোনা করছেন তারাও শরিয়াহর নীতিমালা সম্বন্ধে জানবেন, পাশাপাশি আমাদের ইফতার ছাত্ররাও অর্থনীতি সম্বন্ধে একটা ধারণা লাভ করতে পারবেন। এই সমন্বয়ের মাধ্যমে কিন্তু আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশের অবকাঠামো দাঁড় করাতে পারব ইনশাআল্লাহ।

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের অর্থনীতি বিষয়ক বেশ কিছু ফোরাম আছে, যেখানে তারা নিয়মিত প্রতিবেদন দিচ্ছেন, আপনি কি এমন প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি অনুভব করেন?

জি, অবশ্যই অনুভব করি। আমাদের দেশে ইসলামিক ইকোনমিক ফোরাম টাইপের কোনো কিছু এখনও নেই, যেটার খুবই দরকার, খুবই। ব্যক্তিগতভাবে অনেকে অনেকভাবে কাজ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমরা এখনও সে ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখতে পাইনি। এটার পেছনে আমার মনে হয় যে, আমাদের যারা উলামায়ে কেরাম আছেন তাদের একটা বড় অবদান রাখা প্রয়োজন। কারণ, ইসলামি অর্থনীতি বা ইসলামি যেকোনো ধরনের কথা যদি আমরা বলতে চাই, প্রথম তাগিদটা কিন্তু তাদেরই অনুভব করা উচিত; যেহেতু তারা শরিয়াহ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, করছেন, শরিয়াহর কথা মানুষকে বলেছেন, বলছেন।

আমরা এখন আপনাকে শরিয়া ফিন-টেক নিয়ে কাজ করতে দেখছি। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে কিছু বলবেন?

আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো ওয়ার্ল্ডের দিক থেকে ইসলামি অর্থনীতির ওপর কাজ করে যাওয়া। আর আগামীতে যদি কখনও সুযোগ আসে, তবে বাংলাদেশেরও অর্থনীতি বিষয়ক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যে কাজগুলো সেখানে কাজ করার সুযোগ আসলে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। তবে ইসলামি অর্থনীতির সুফল তুলে ধরা এবং সেটা বাস্তবায়ন করাটাই হচ্ছে আমার বৃহত্তর পরিকল্পনা।

ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য শোকরিয়া।

আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

আগের সংবাদমোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ দুই দিন
পরবর্তি সংবাদভোটের দিন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে : র‍্যাব মহাপরিচালক