
হামমাদ রাগিব
৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-তে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে ‘নিরঙ্কুশ বিজয়’ লাভ করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলগুলো ভোটে ব্যাপক কারচুপি, জনগণকে ভোট দিতে না দেওয়া, জালভোট দেওয়া, বিপরীত পক্ষের পোলিং এজেন্টদের হয়রানি ইত্যাদি নানা অভিযোগ তুললেও নির্বাচন কমিশন বলছে, এবারের নির্বাচন গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সে অনুযায়ী ‘বিজয়ী’ দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও একাধারে তৃতীয় বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ইসলামি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩০০ আসনের প্রায় সবক’টিতেই নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিসের বেশ কয়েকজন প্রার্থী বিএনপি জোটের শরিক দল হিসেবে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করেছেন। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও পৃথক পৃথকভাবে কয়েকটি আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে।
ইসলামি দলগুলোর বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে দেখা গেছে অনেক আসনেই ইসলামপন্থী একাধিক প্রার্থী ছিলেন। তাদের সবারই উদ্দেশ্য এক, জনগণের দ্বারে দ্বারে তাঁরা ভোট চেয়েছেন একই উদ্দেশ্যের বর্ণনা দিয়ে। ফলে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। কাকে তারা ভোট দেবে? অনেক জায়গায় এসব মানুষের প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয়েছে এসব প্রার্থীকে।
ভোটের মাঠে ইসলামপন্থী দলগুলো নিয়ে মানুষের এই যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়েছে, এটার ফলশ্রুতিতে ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদরা কী প্রতিকার নিতে পারেন আগামীতে—এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের ওসমান গনি কলেজের অধ্যাপক ও ইসলামি চিন্তাবিদ ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইনের সঙ্গে। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘একই মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি দলগুলোর পৃথক পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ খুব দুঃখজনক। সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামপন্থীদের এ অনৈক্যের কারণে একটা ভুল ম্যাসেজ যাচ্ছে যে, এরা নিজেরাই এক হতে পারে না, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে কীভাবে। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে তাঁরা জনগণের কাছ থেকে যে রিঅ্যাক্ট পেয়েছেন, আমি মনে করি এটা তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হবার একটা বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। মানুষের আস্থা ও সমর্থন লাভের জন্য এ ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ছোট খাটো বিভেদ ভুলে বৃহত্তর স্বার্থে আশা করি তাঁরা এখন এক প্লাটফর্মে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।’
‘আমি সবসময় একটা বিষয় চিন্তা করি, মানুষ আলেম-উলামাকে এত শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, কিন্তু ভোটের মাঠে গেলে তারা আলেমদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কেন? এই ‘কেন’র দৃশ্যমান একটা জবাব তো অনৈক্য, ঠিকাছে, কিন্তু জবাব আরও আছে। যেমন নিতান্ত ধর্মীয় ইস্যু ছাড়া ইসলামপন্থীরা জনসাধারণের নিত্তনৈমিত্তিক বিষয়াবলি—মানবাধিকার, শান্তি, সমৃদ্ধি, স্থিতি, জনগণের কল্যাণকামনা ইত্যাদি নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না বা কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেন না। অথচ ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্টগুলোর অন্যতম হচ্ছে এগুলো। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যদি তাঁরা মানুষের মধ্যে তুলে ধরতে পারেন এবং সকল ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক প্লাটফর্মে দাঁড়াতে পারেন, তবে আমি মনে করি একটা কিছু করা সম্ভব। ইনশাআল্লাহ।’
সদ্য গত হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইসলামপন্থী দলগুলোর ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে জানতে চেয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পক্ষ থেকে কথা বলা হয়েছিল আমেরিকা প্রবাসী লেখক ও ইসলামি রাজনীতি বিশ্লেষক মাওলানা রশীদ জামীলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইসলামপন্থী দলগুলো মানে যদি নেতৃত্ব মিন করা হয়, তাহলে আমি বলব, কোনো প্রভাবই ফেলেনি। প্রভাব ফেলার কোনো কারণও ছিল না। আদর্শের জায়গা থেকে যত ব্যাখ্যা করেই বিচ্যুত হওয়া হোক, হেকমতের কথা যত হেকমতের সাথেই বলা হোক, কাজ হয় না। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনকে ঘিরে ইসলামী নেতাগণ যে পর্যায়েরর আদর্শিক দেউলিয়াপনার জানান দিলেন, তাতে আমি অন্তত তাঁদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি।’
‘ইসলামি রাজনীতি করার কথা বলব, ভোটের জন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি এমনকি নাস্তিক মুরতাদ কাদিয়ানি দোসরদের সাথে নির্বাচনী গাঁট বাঁধতে পারব, কিন্তু নিজেরা নিজেদের সাথে অন্তত একটা নির্বাচনী ঐক্য করতেও রাজি হব না, আবার ভাবব আল্লাহর রহমত এসে আমাদেরকে একেবারে ধুয়ে দিয়ে যাবে—তা তো হয় না।’
ইসলামপন্থী প্রার্থীদের অনেকেই নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি—এ অভিযোগের বাইরে এর আর কী কী কারণ আছে বলে আপনি মনে করেন, এবং এর সমাধান কী? ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের এ প্রশ্নের জবাবে রশীদ জামীল বলেন, ‘অনেকেই জামানত খুইয়েছেন—এটা কোনো বিগ ডিল না। দেশে আদৌ কোনো নির্বাচনই হয়নি। মানুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেনি। সুতরাং জামানত বা ফলাফল নিয়ে আপসেট হওয়ার কিছু নেই। আপসেট হতে চাইলে অন্য কারণে হওয়া যায়। কারণের অভাব আছে নাকি!’
‘এক. বাংলাদেশের কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ; ইসলামি রাজনীতিবিদদের নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখত, তাদের সেই স্বপ্নের পাঁজরটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দুই. আস্থার জায়গাগুলো নিজেরাই অনাস্থায় ভুগতে ভুগতে বাইপাস রোডে বাইচান্স ক্ষমতার অংশিদারিত্ব চাইতে শুরু করেছেন, যা আগামীর জন্য একটি অশনী সংকেত। তিন. আদর্শের প্রশ্নে আপোস করতে করতে এতটা নিচে চলে যেতে হয়েছে যে, এরপরে আর তাগুত বলে কাউকে নিয়ে কথা বলার মুখ থাকছে না। এটাই সবচে ভয়াবহ ব্যাপার।’
‘সমাধানের পথ একটাই। ইসলামি রাজনীতি করতে চাইলে ইসলাম নির্দেশিত ফর্মূলায় করা। আর এখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের চাদরে ঢাকা সেই ফর্মূলাটা কেমন, এটা তাঁরা বেশ ভালো করেই জানেন।’
