
রাগিব রব্বানি
তাবলিগের আভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যাকে কেন্দ্র করে বিগত পুরো বছর জুড়েই উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সাদপন্থী তাবলিগিদের একটা দ্বন্দ্ব জনসমক্ষে আলোচিত ছিল। তাবলিগের বর্তমান আমির দাবিদার মাওলানা সাদ সাহেবের বিভিন্ন বক্তব্যে শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি থাকার কারণে তাঁকে সে বক্তব্যগুলো সংশোধনের অনুরোধ করেন উলামায়ে কেরাম। মাওলানা সাদ এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘নামকাওয়াস্তে রুজুনামা’ পেশ করেন, যা উলামায়ে কেরামের মনঃপুত হয়নি। ফলে আলেমপন্থী তাবলিগিদের সঙ্গে মাওলানা সাদের অনুসারীদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম সাদ সাহেবের এই ‘ফেতনা’ থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে দেশের নানা জায়গায় ‘ওয়াজাহাতি জোড়’ করেছেন গত বছরের বিভিন্ন সময়ে। এতে সাদপন্থীরা আলেমদের ওপর খেপে যায় এবং বিভিন্নভাবে অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত করে।
সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর আসন্ন ইজতেমার প্রস্তুতিকাজের জন্য ইজতেমা মাঠে অবস্থানরত আলেম, তালাবা ও সাধারণ তাবলিগিদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় সাদপন্থীরা। হামলায় প্রচুর সংখ্যক তাবলিগি হতাহত হন। এ থেকে আলেমদের সঙ্গে সাদপন্থী তাবলিগিদের দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।
তাবলিগের চলমান এই সঙ্কটে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পক্ষ থেকে আজ কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট আলেম ও লেখক মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীনের সঙ্গে।
মাওলানা আবিদীনের কাছে প্রথমে জানতে চেয়েছিলাম তাবলিগে তিনি কখনও সময় লাগিয়েছিলেন কি-না। উত্তরে তিনি জানান, ১৯৮৫ এবং ৯৩ সালে একাধিকবার তাবলিগের এই মেহনতে নিজেকে সরাসরি সম্পৃক্ত করেছিলেন।
সময় লাগিয়ে তাবলিগের আভ্যন্তরীণ কর্মপ্রক্রিয়াকে তিনি যেভাবে দেখেছেন, তাঁর কাছে এই কাজকে দীনি দাওয়াতের অন্যতম একটা অংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
মাওলানা আবিদীন বলেন, ‘এটা দীনের একটা কাজ। যারা এই কাজে সর্বদা নিজেদের নিয়োজিত রাখেন, তাঁরা কাজটাকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটু মজবুতি অবলম্বন করেন, যা দেখে স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হবে, কিছুটা বাড়াবাড়ি। কিন্তু এমনটা সব অঙ্গনেই হয়। যারা যে অঙ্গনে কাজ করেন, সে অঙ্গনকে একটু মজবুতির সঙ্গেই উপস্থাপন করেন। আমাদের মাদরাসার অঙ্গনের কথাই ধরুন। আমরা মাদরাসা-শিক্ষাকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তো ওরকম একটু মজবুতির সঙ্গেই উপস্থাপন করি। তাই না?’
তবে মাওলানা যাইনুল আবিদীন তাঁর এই পর্যবেক্ষণটা যখন তিনি সময় লাগিয়েছিলেন তাবলিগে, সেই সময়ের আলোকেই করেছেন। দারস-তাদরিস এবং লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকার কারণে পরবর্তী সময়কার তাবলিগ-পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ওয়াকিবহাল নন বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট এ আলেম লেখক।
তাবলিগের বর্তমান সঙ্কটটা ঠিক কী জানতে চাইলে মাওলানা যাইনুল আবিদীন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। শুধু এতটুকু জানি, মাওলানা সাদ সাহেবের যে মেজাজ, তা আমাদের তাবলিগের পুরনো মুরব্বিদের মেজাজের পরিপন্থী। এ কারণেই তাঁর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।’
এই সঙ্কটে আলেমদের বর্তমান অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উলামায়ে কেরাম দীনি জিম্মাদারি মনে করে যা করছেন, যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ইতিবাচক।’
তো এ বিষয়ে আপনি উলামায়ে কেরামের সব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একমত? এ প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা যাইনুল আবিদীন বলেন, ‘তাঁরা কী কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিচ্ছেন, সে ব্যাপারে আমি বিস্তারিত জানি না। আমার দৈনন্দিন কাজের নির্ধারিত রুটিন শেষ করে সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানার সুযোগও থাকে না। তাই সব সিদ্ধান্তেই যে আমি একমত—এমনটা বলতে পারছি না।’
চলমান এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ কীভাবে সম্ভব জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা জটিল প্রশ্ন। আমার মনে হয়, তাবলিগ নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরাই এটা অনুমান করতে পারবেন যে, অবস্থাটা এখন কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর সমাধান কীভাবে সম্ভব। যেহেতু তাবলিগের সঙ্গে সরাসরি আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, তাই এ প্রশ্নের উত্তর আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না।’
বাহ্যিকভাবে তো দেখা যাচ্ছে তাবলিগের এ সঙ্কট বর্তমানে সাদ সাহেবের অনুসরণ করা-না করা নিয়েই তৈরি হয়েছে। তো কেবল সাদ সাহেবের অনুসরণ থেকে বেরিয়ে এলেই কি তাবলিগ পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে? জানতে চাইলে মাওলানা আবিদীন বলেন, ‘এটাও জটিল প্রশ্ন। পাকিস্তান ও ভারতে তাবলিগের যারা শীর্ষ মুরব্বি আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে তাবলিগে সময় লাগাচ্ছেন এবং এর আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে যারা সম্যক অবগত, এ প্রশ্নের উত্তর তাঁরাই দিতে পারবেন। তাঁরাই বলতে পারবেন, তাবলিগে কেবল সাদ সাহেবকে নিয়েই কি সমস্যা, নাকি সমস্যা আরও আছে।’
