স্বামীর জোরপূর্বক সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সকে বিবিসি কর্তৃক ধর্ষণ আখ্যা : আলেমদের অভিমত

হামমাদ রাগিব

স্ত্রীর অনিচ্ছায় তার সঙ্গে স্বামীর সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সকে ‘ধর্ষণ’ আখ্যা দিয়ে কয়েক দিন আগে প্রকাশিত বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন অনলাইনে ভাইরাল হয়েছে। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে জোরপূর্বক সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সে নেওয়াকে ভয়াবহ রকমের পারিবারিক সহিংসতা দাবি করে বিবিসি বাংলার সাংবাদিক শাহনাজ পারভীন প্রতিবেদনটিতে এ বিষয়ে বাংলাদেশি সমাজের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী এক মহিলার সঙ্গে শাহনাজ পারভীন কথাও বলেছেন এ ব্যাপারে। কথা বলেছেন অধিকার বিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নীনা গোস্বামীর সঙ্গেও। নীনা গোস্বামী জানিয়েছেন, ‘আমাদের কাছে যারা আসেন তারা সুনির্দিষ্টভাবে এমন অভিযোগ করেন না। কিন্তু পারিবারিক সহিংসতা বা মারধরের অভিযোগ নিয়ে কথা বলার সময় তারা ম্যারিটাল রেপের কথাও বলেন।’

মিস গোস্বামীর এ ভাষ্য দ্বারা বোঝা যায়, বাংলাদেশে এই সমস্যাটা মোটামুটিভাবে ছড়িয়ে আছে। পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে থাকা এ দেশের এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই বাস্তবতা বিদ্যমান। কিন্তু এ সমস্যা তুলে ধরার জন্য বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন-পরিবেশনের ধরনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করছেন অনেকে। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ও পিস টিভির লেকচারার আলেম শায়খ আহমাদুল্লাহ এ প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘বিবিসি বাংলা সম্প্রতি ‘স্বামীর হাতে ধর্ষণ’ শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে স্ত্রীর অনিচ্ছায় স্বামীর সহবাসকে ‘ধর্ষণ’ আখ্যায়িত করে স্বামীদের বিরুদ্ধে স্ত্রীদেরকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার পুরাতন মোড়কে প্রচারিত এ ধরনের প্রতিবেদন দিনদিন ভঙ্গুর হতে থাকা দাম্পত্য সম্পর্কগুলোর ধ্বংসকে আরও তরান্বিত করবে।’

এই ধরনের সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সকে ধর্ষণ আখ্যা দেওয়ারও বিরোধিতা করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘হাজারে একটি দম্পতিও এটাকে জুলুম মনে করেন না। এ কারণেই বিবিসির সেই প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে, বেশিরভাগ মেয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে বিব্রতবোধ করেছেন। মূলত বিব্রতবোধ করারই কথা। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া আবদারমূলক বিষয়গুলোতে আইন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা টেনে আনা বিব্রতকরই বটে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সঙ্গীসূলভ জোর-জবরদস্তির বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অবৈধ মেলামেশার ফলে নীরব ধর্ষণ থেকে সৃষ্ট ‘মি টু’ সংস্কৃতির রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা এ দেশের সংস্কৃতি ও দাম্পত্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল।’

শায়খ আহমাদুল্লাহ আরও বলেন, ‘সন্দেহ নেই, কোনো কোনো স্বামী সহবাসের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অসুস্থতা কিংবা ইচ্ছাকে মোটেও আমলে নেন না। স্ত্রীকে সম্মত ও প্রস্তুত করে নেওয়ার মতো কমনসেন্স বা সুস্থ মানসিকতার অভাবও আছে। ইসলাম যে কারো প্রতিই জুলুমকে হারাম করেছে। স্ত্রীর প্রতি জুলুম হয়, এমন যেকোনো আচরণও তাই নিষিদ্ধ।’

বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, সমাজের একশ্রেণির মানুষ, যারা ধর্মীয় অনুশাসন তথা ইসলাম নির্দেশিত জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে উদাসীন, তাদের মধ্যেই এ সমস্যাটা বিদ্যমান। এর সমাধানের জন্য সচেতনতা দরকার। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, পশ্চিমা উদোম সংস্কৃতির অনুসরণ করে পরিবার ভেঙে দিতে হবে। বরং ইসলাম নির্দেশিত পরিবার-ব্যবস্থা সম্পর্কে এ শ্রেণির মানুষকে ওয়াকিবহাল করলেই এ সমস্যা কেটে যাবে।

কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয়, সহিহ বুখারি ও মুসলিমের রেফারেন্সে তো প্রসিদ্ধ হাদিস আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, স্ত্রী তাঁর স্বামীর সহবাসের ডাকে (যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া) সাড়া না দিলে ফেরেশতাগণ তার প্রতি অভিশাপ করেন।

এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম ইসলামিক ফিকহ ইন্সটিটিউট সিলেটের পরিচালক মুফতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। তিনি ইসলামি আইন শাস্ত্রবিদদের রেফারেন্সে এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘যেহেতু বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শারীরিক সম্পর্ক, তাই সঙ্গীর আহ্বানে সাড়া দেওয়া স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্যই কর্তব্য। তবে কোনো রকম অসুবিধা থাকলে এই বাধ্যবাধকতা উঠে যাবে। শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যস্ততা থাকলে এই বাধ্যবাধকতা থাকে না। কেননা অসুবিধার ফলে সঙ্গীর আহ্বানে সাড়া না দিলে এতে বৈবাহিক বোঝাপড়ায় কোনো অসুবিধা হয় না। বিবাহের মাকসাদেও কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। অসুস্থতার বিষয়টা উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান। তবে উপার্জনের দায়িত্ব যেহেতু প্রধানত স্বামীর হাতে ন্যস্ত, তাই তার ব্যস্ততার প্রসঙ্গ বেশি আসবে। ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল ঘর গোছানোর দায়িত্ব স্ত্রীর হাতে থাকে, তাই স্বাভাবিক কারণেই তার ব্যস্ততার অজুহাতের সুযোগ কম।

‘অসুস্থতা বা ব্যস্ততা না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কের ধরণেও ভিন্নতা থাকে। বৈবাহিক সম্পর্ক আনন্দময় করার লক্ষ্যে পরস্পরের মধ্যে এসব বিষয়ে বোঝাপড়াও গড়ে উঠে। বোঝাপড়া না হবার বিষয়টা খুবই বিরল। তবুও এমন বিরলতম ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনা আছে। ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স করতে কারো শারীরিক কষ্ট হলে উলামায়ে কেরাম পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর জোর দেন। আনন্দ পূরণের সাথে সাথে কষ্ট কীভাবে লাঘব করা যায়, সে তরিকা বের করার নির্দেশনা দেন। পাশাপাশি নিতান্তই অক্ষম হলে তালাকের হুকুমও আছে এসব ক্ষেত্রে। কেননা বৈবাহিক সম্পর্ক হচ্ছে সুন্দর ও আনন্দের সম্পর্ক। এই আনন্দ ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য শারীরিক সম্পর্কে কষ্ট না হওয়া ও অক্ষম না হওয়া আবশ্যক। এসব ক্ষেত্রে ইসলাম কখনোই সহবাসের ডাকে সাড়া না দেওয়ার বিধান আরোপ করে না। বরং বিকল্প তরিকার কথা বলে দেয়। সর্বোপরি ইসলাম যেমন স্বামীকে স্ত্রীর ওপর নির্দয় না হবার নির্দেশনা দেয়, ঠিক তদ্রুপ স্ত্রীকেও স্বামীর দিকটি খেয়াল করা এবং কোনো ধরনের উদাসীনতা প্রদর্শন না করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে৷’

আগের সংবাদবিএনপি ও বাংলাদেশের আগামীদিনের বিরোধীদল
পরবর্তি সংবাদএরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করে প্রজ্ঞাপন