
হামমাদ রাগিব
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘বিপুল ভোটে বিজয়ী’ হয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। এর আগে দুই মেয়াদে বিগত ১০ বছর ধরে একাধারে তারা দেশ শাসন করেছে। প্রথম মেয়াদের শাসনামলে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল না এই সরকারের। ধর্মভিত্তিক নানা ইস্যুতে উলামায়ে কেরাম সরকারের বিপরীতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। ফলে সরকারও অ্যাকশনমূলক অবস্থানে ছিল তাঁদের ব্যাপারে। তাই শক্তহাতে দমন করার চেষ্টা করেছে নারীনীতি, নাস্তিক্যবাদ ইত্যাদি ইস্যুতে গড়ে ওঠা দুর্বার আন্দোলনগুলো।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এসে দেখা গেছে সরকার নিজেদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। উলামায়ে কেরামের সঙ্গে তাদের দূরত্ব কমিয়ে আনতে নানাভাবে আলেমদের কাছে টেনেছে। সর্বশেষ কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের সঙ্গে আরও নিবিড় করে তুলেছিল আলেমদের সম্পর্ক। ফলে দেখা গেছে, একসময় যারা আওয়ামী লীগ-বিরোধী মানসিকতা লালন করতেন, তাঁরাই একমঞ্চে বসে সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিকতা দেখিয়েছেন সরকারকে।
তবে উলামায়ে কেরাম বারবার বলে এসেছেন, তাঁরা সরকারের বিরোধী নন। অতীতে যে আন্দোলন-সংগ্রামগুলো তাঁরা করেছেন, তা সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং ধর্মীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতেই তাঁরা ময়দানে নেমেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সরকার যখন তাঁদের বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত দাবি ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি’ বিনা শর্তে প্রদান করেছে, তখন কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য সরকারের সঙ্গে এক মঞ্চে বসেছেন তাঁরা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহী আজ ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গে বিশেষ এক আলাপচারিতায় বলেছেন, ‘ধর্মীয় স্বার্থে কোনো ধরনের আঘাত এলে উলামায়ে কেরাম কোনোভাবেই আপোস করবেন না কারও সঙ্গে। অতীতের মতো তাঁরা আবারও ঝাঁপিয়ে পড়বেন আন্দোলনে।’
মহাজোট সরকারের নতুন এই মেয়াদে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে কেমন হবে তাদের সম্পর্ক? গত মেয়াদের মতো আপোসকামী অবস্থান গ্রহণ করবে তারা, নাকি অ্যাকশনমূলক মনোভাব রাখবে?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যেহেতু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে তাই বৈধতার জন্য ‘সুশীল সমাজ’ ও ‘বিদেশি’দের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়বে। এ কারণে আলেমদের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্কে যাওয়া আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা তাতে ‘বিদেশি শক্তি’ মনে করবে আওয়ামী লীগ যখন বিএনপির ভূমিকাই পালন করছে, তাহলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে তো কোনো তফাৎ নেই। এই মনোভাব থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের ধারণা বদলে যেতে পারে এবং ক্ষমতা বদলের একটা চিন্তা তাদের ভেতর চলে আসতে পারে।
তবে উগ্রবাদ ও জামায়াতকে দমন করার জন্য আলেমদের সহযোগিতা চাইতে পারে আওয়ামী লীগ। কেননা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিপুলভাবে ইসলাম-সমর্থন আছে। ফলে উগ্রবাদ ও জামায়াতকে প্রতিরোধ করার সময় ভিন্ন কোনো ইসলামি বিকল্প না থাকলে মানুষ মনে করতে পারে, রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে ইসলাম-বিরোধিতা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ এই পথ বন্ধ করতে আলেমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখাতে পারে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে ভারতও এমন বিকল্প তৈরিতে আগ্রহী। কিন্তু হেফাজতের নেতাদের তারা এখনও ‘নিরাপদ’ মনে করতে পারছে না।
এদিকে নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকে যাওয়ায় আলেমদের পক্ষেও ব্যাপকভাবে সরকারকে সমর্থন করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। কারণ, শোকরানা মাহফিলের প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা নিতান্তই নেতিবাচক ছিল। পাশাপাশি হেফাজতের ঘটনা সরকার এখনও ভুলতে পারেনি। কৌশলগত কারণে যদিও তারা বিগত টার্মে আলেমদের সঙ্গে আপোসের মনোভাব দেখিয়েছে, কিন্তু আলেমগণ কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষায়ও অতটা পটু নন।
তবে সর্বশেষ বাস্তবতা হলো, সরকার অরাজনৈতিক আলেম ও ইসলামি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কে আগ্রহ দেখাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও নিরাপত্তা ও সম্পর্ক বিষয়ে সতর্ক। তিনি আলেমদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রক্ষা করে চলছেন। চাপও প্রয়োগ করছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও নতুন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ। আলেমদের সঙ্গে তাঁরও যোগাযোগ ভালো। এবং ধর্মপ্রাণদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য তিনি পটু। সম্প্রতি ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে আলেম-উলামাদের ‘দোআ’ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। এ উপলক্ষে ১১ জানুয়ারি শুক্রবার হজরত শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর কবর জিয়ারতও করে এসেছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ মহলের অনেকেই মনে করছেন, এসব কারণে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সরকারের বড় কোনো সংঘাতের আশঙ্কা আপাতত নেই। আর আলেমদের শক্তি, দুর্বলতা, কোন্দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ‘সম্পর্কের’ কল্যাণে এতদিনে সরকারের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে, তাই আলেমদের দিক থেকেও বড় কোনো আন্দোলন সংগঠিত করা সাম্প্রতিক সময়ে কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
