পাবলিক প্লেসে নারীর নিরাপত্তাহীনতা, বিস্তারিত পরিসংখ্যান

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশের পাবলিক প্লেসগুলোতে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কর্মক্ষেত্র হোক কিংবা শিক্ষাক্ষেত্র—প্রতিটা জায়গায়ই নারীরা নানাভাবে যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। ৩ বছরের শিশু থেকে নিয়ে ৬০ বছরের বৃদ্ধা—কেউই নিরাপদ নন এই নির্যাতন থেকে।

মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে ৯৬৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২৪ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৫৮ জনকে। সদ্যসমাপ্ত ২০১৮ সালের (জানু-জুন) ছয়মাসে ২০৬৩টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৩২টি, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৮ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৯ জনকে। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হযেছেন ১০ নারী। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৭৭টি। পাচার করা হয়েছে ১৩ জনকে। যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ৫১ জন নারীকে। উত্ত্যক্ত করার জেরে আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩ নারী।

শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি
শিক্ষাক্ষেত্রে নারীরা মারাত্মকভাবে যৌন হয়রানির শিকার। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নিয়ে উচ্চাতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান ঘাটলে ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসে নারীদের যৌন হয়রানির ব্যাপারে। ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে এই তালিকায়। ঘটনা একই। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি। কুপ্রস্তাব, হুমকি-ধমকি।

ইউএনউইমেন-এর এক জরিপের তথ্যমতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৮৭% ছাত্রী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অশ্লীল কথাবার্তা বা কটূক্তির মুখোমুখি হন তারা।

২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দেশের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তখনকার মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ কিশোরী জীবনে কোনো না কোনো সময় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

হয়রানির শিকার নারীশ্রমিকরাও
নারীদের নিয়ে কাজ করা বিশেষায়িত সংগঠন ‘সজাগ’-এর উদ্যোগে গত ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিশেষ এক সেমিনারে নারী-শ্রমিকদের ওপর জরিপ চালিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের জরিপ অনুযায়ী ৮৫ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মেক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। পরিসংখ্যানমতে ৬৬ শতাংশ নারী শ্রমিক বলেছেন কর্মক্ষেত্রে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

গণপরিবহনে যৌন হয়রানি
গণপরিবহনগুলোতেও পরিবহন শ্রমিকদের দ্বারা ঘটে চলেছে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা। গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা-আশুলিয়া সড়কের সুইসগেট এলাকায় এক নারীকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের চেষ্টা করে গাড়িচালক ও হেলপার। পরে বাঁচার জন্য সেই নারী চলন্ত গাড়ি থেকে জানালা দিয়ে লাফ দেন। গাড়িতে ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা এটা প্রথম নয়। গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে পরিবহন শ্রমিকরা চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে শিক্ষার্থী রূপাকে।

শিশুধর্ষণের চিত্র ভয়াবহ
শিশু অধিকার ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার ৫৯৩টি শিশু। অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে ৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ৬৩৯ জন শিশু।

অন্যদিকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ গত চার বছরে সারা দেশে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩১ জন শিশুকে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ১৯ জন শিশু। আর ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ গত তিন বছরে সারা দেশে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩১ শিশু। একই সাথে এই তিন বছরে সারা দেশে ১১২ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে নারীদেরকে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এমনকি ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা যেন নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নারীদের নিরাপত্তার জন্য বেশ কঠোর রকমের আইন রয়েছে বাংলাদেশে। আইন থাকা সত্ত্বেও কেন কমছে না এই ধরনের ভয়াবহ অপরাধচিত্র? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। সচেতনতারও অভাব রয়েছে। রয়েছে অবক্ষয়।

ইসলাম বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হবার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে প্রথমত মানুষের ঈমানি ও নৈতিক ব্যাপক অধঃপতন ঘটেছে। ফলে মানুষ আগের মতো নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারছে না। করা আবশ্যক মনে করছে না। সুযোগ পেলেই যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের চেষ্টা করছে।

পাশাপাশি মৌলিক শিক্ষা-তরবিয়াতেরও অভাব অনুভূত হচ্ছে। পিতামাতা, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেলেদেরকে সামাজিক মূল্যবোধ ও আচরণ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অপরদিকে টিভি, সিনেমা, বিজ্ঞাপন ও পাবলিক ফাংশনে নারীদের শরীর ও যৌনতাকে উপজীব্য করে বিনোদন ও ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে একরকম অবদমিত যৌনবোধের সৃষ্টি হচ্ছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে বিবাহ অনেক কঠিন হয়ে গেছে। ছাব্বিশ-সাতাশের আগে বিবাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকের বয়েসের কাঁটা ত্রিশের ঘর পেরিয়ে গেলেও সামাজিক কারণে বিয়ের বন্দোবস্ত করতে পারছে না।

তাছাড়া বিশেষভাবে নারীদের মধ্যে নিজেকে আবেদনময় করে উপস্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে একরকম যৌন সুরসুরির সৃষ্টি হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এখন নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ-মেলামেশার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। নারী-পুরুষ কোনো স্থানে একা হয়ে যাচ্ছেন। তৃতীয় কেউ থাকছেন না। ফলে পুরুষরা জুলুমের সুযোগ পাচ্ছেন। যারা শিক্ষা ও চাকরীতে ঢুকেছেন, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা অনেক বেশি। এবং একে আধুনিকতা ও যুগের সচেতনতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

নারীরা অপমান ও অসহযোগিতার ভয়ে যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করছেন না। যৌন হয়রানির শিকার হলেই মানুষ এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসছেন না। মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের নৈতিক বল কমে গেছে।

সর্বশেষ যে কারণটা ইসলামপন্থীরা উল্লেখ করেন, তাহলো যৌন হয়রানির যথাযথ বিচার না হওয়া। প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীন হবার কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাকশন নেয় না। নিলেও অভিযুক্তরা খুব দ্রুত মামলা থেকে ছাড়া পেয়ে যান।

যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ বিষয়ক সমস্যা সমাধানের জন্য উল্লিখিত কারণগুলোর ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে বলে মনে করছেন ইসলাম বিশেষজ্ঞরা।

তাছাড়া রাষ্ট্রের আইনকে আরও ভালোভাবে সাজিয়ে এই ধরনের মামলায় দ্রুত বিচার পাওয়ার ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ধর্ষকদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত করে জনসমক্ষে এর বিচার করা হলে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা।

আগের সংবাদমার্চ থেকে উপজেলা নির্বাচন, সদরে ভোট ইভিএমে
পরবর্তি সংবাদকুর্দি যোদ্ধাদের ওপর অভিযান চালালে তুরস্কের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের