দেওবন্দে তাবলিগের কার্যক্রম কেন বন্ধ?

রাগিব রব্বানি

কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার মুরব্বি প্রতিষ্ঠান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ গতকাল মাদরাসা-অভ্যন্তরে তাদের ছাত্রদের ব্যাপারে বিশেষ এক নির্দেশনা জারি করেছে। দারুল উলুমের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসিম নোমানি স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দারুল উলুমের কোনো ছাত্র এখন থেকে আভ্যন্তরীণ কিংবা বহিরাগত কোনো তাবলিগি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এবং বিশ্ব তাবলিগের চলমান সঙ্কটে বিবাদমান দুই পক্ষের কারও সঙ্গে তারা তাবলিগ বিষয়ক কোনো সম্পর্ক রাখবে না। এমনকি কারও পক্ষাবলম্বন করে কোনো কথাও বলবে না। কোনো ছাত্র এ নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও হুঁশিয়ারি রয়েছে নির্দেশনা-নামায়।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আজ কথা বলেছিলাম দেওবন্দে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি ছাত্র আবরার আজিজের সঙ্গে। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানিয়েছেন, দারুল উলুম দেওবন্দ একটি ইলমি মারকাজ। এবং ইলমি মারকাজ হিসেবেই নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে চায়। তাই ইসলাম বিষয়ক কোনো শাখাগত মতনৈক্য থেকে দারুল নিজেদের দূরে রাখে। তবে আকিদাগত মতানৈক্যে বিশুদ্ধ আকিদার ব্যাপারে কারও সঙ্গে আপোস করে না। তাই তাবলিগের বিবাদমান বিষয়ে দারুল উলুম কারও পক্ষাবলম্বন করেনি কখনও। তবে মাওলানা সাদ সাহেবের কিছু বক্তব্যে আকিদাগত সমস্যা থাকার কারণে সে বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে একটা ফতোয়া প্রকাশ করেছে। দেওবন্দ এটা বারবার বলে এসেছে যে, এ ফতোয়া ব্যক্তি সাদ কিংবা তাঁর কার্যক্রমের ব্যাপারে নয়, বরং কেবল তাঁর আপত্তিকর বক্তব্যগুলোর বিরুদ্ধে। তিনি সেগুলো সংশোধন করে ফেললে দেওবন্দের আর কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু সাদ সাহেব এ পর্যন্ত দেওবন্দের পছন্দ মাফিক রুজু না করায় তাদের জারিকৃত ফতোয়া থেকে তারা সরে আসেননি। তবে বিবাদমান কোনো পক্ষকে সরাসরি সমর্থন বা অসমর্থনও করেননি। নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন।

আবরার আজিজ আরও বলেন, তাবলিগের চলমান বিবাদ আলোচনায় আসার পর থেকেই দেওবন্দে অনেকটা অঘোষিতভাবে তাবলিগের কার্যক্রম সামগ্রিকভাবে বন্ধ রয়েছে। ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদে আগে তাবলিগের মারকাজ ছিল, এখান থেকে দেওবন্দকেন্দ্রিক তাবলিগের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হতো, কিন্তু বিবাদ শুরুর পর থেকে নিরপেক্ষতার স্বার্থে মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ সাত্তা মসজিদে তাবলিগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তারপরও দেওবন্দের একটা মৌন সমর্থন পরিলক্ষিত হতো তাবলিগের শুরাপন্থী গ্রুপের প্রতি। এবং এর যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল।

আবরার আজিজ বলেন, দেওবন্দের এ মৌন সমর্থনের কারণে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হওয়ায় গতকাল চূড়ান্তভাবে কর্তৃপক্ষ থেকে এ ঘোষণা জারি করা হয় যে, দারুল উলুম-সংশ্লিষ্ট কেউ যেন তাবলিগের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত না রাখে। এ ঘোষণা কেবল দেওবন্দের ছাত্র, উসতাদ ও অন্যান্য স্টাফের বেলায় প্রযোজ্য। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও নিয়ম সুষ্ঠু রাখতে তা করা হয়েছে। দেওবন্দ-সংশ্লিষ্টদের বাইরের কেউ এ ঘোষণার আওতাভুক্ত নন।

তিনি বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দ দাওয়াতে তাবলিগের এ মেহনতকে আগের মতো এখনও গুরুত্বপূর্ণ ও দীনের অন্যতম একটা কাজ বলে মনে করে এবং এ কাজে সম্পৃক্তির জন্য সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করে। কিন্তু চলমান অনাকাঙ্ক্ষিত বিবাদে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে মাদরাসা-সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্তির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

আবরার আজিজ আরও বলেন, দাওয়াতে তাবলিগের সাথি ভাইদের উদ্দেশ্যে দেওবন্দের বিশেষ আহ্বান রয়েছে। সেটা হলো, তাঁরা আগে যেভাবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য দাওয়াতে তাবলিগের কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করেছিলেন, সেভাবে এখনও কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যই কাজ করে যাবেন এবং সবধরনের মতানৈক্য থেকে নিজেদের দূরে রাখবেন।

তবে সাদ সাহেবের আপত্তিকর বক্তব্যগুলো থেকে তাবলিগি ভাইদের বেঁচে থাকার এবং যথাসম্ভব এসব বক্তব্য এড়িয়ে চলার ব্যাপারেও দারুল উলুমের বিশেষ আহ্বান রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবরার আজিজ।

আগের সংবাদএকুশে বইমেলায় ইসলামি প্রকাশনীগুলো যেতে পারে না কেন?
পরবর্তি সংবাদচীন ও ফিলিস্তিনে অব্যাহত মুসলিম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের বিক্ষোভ