নায়ক-ক্রিকেটার-সেলিব্রেটিদের সঙ্গে মুফতি উসামা : দীনের দাওয়াত নাকি অন্যকিছু?

রাগিব রব্বানি

তাবলিগ জামাতের বাংলাদেশি শুরা সদস্য ও বিতর্কিত তাবলিগি মুরব্বি ইঞ্জিনিয়ার ওয়াসিফুল ইসলাম-পুত্র মুফতি উসামার ফেসবুক ফ্যানপেজে পোস্ট করা একটি ছবি নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ছবিটিতে দেখা যায় উসামা বিপিএল ম্যাচে অংশ নেওয়া রংপুর রাইডার্সের ক্রিকেট-তারকাদের নিয়ে মুনাজাত করছেন।

ইসলাম-বহির্ভুত একটা কাজের ইউনিফর্ম পরা লোকদের নিয়ে মুফতি উসামা কেন মুনাজাত করলেন—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই সমালোচনা করতে দেখা গেছে। কিন্তু মুফতি উসামার ফেসবুক পেজে গিয়ে দেখা গেছে আলোচিত এ ছবির ক্যাপশনে লেখা আছে, ‘Mufti usama damat barakatuhum giving dawah to cricket player’s and made dua for hidayet.’

মুফতি উসামা তাবলিগের দাওয়াত নিয়ে সিনেমা ও ক্রিকেটপাড়ার বিভিন্ন তারকাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় যান। এর ছবিও প্রকাশ করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তার কল্যাণে এমন বেশ কয়েকজন তারকাকে ইসলামি লেবাস পরে তাবলিগের কাজে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু তাবলিগে সময় লাগালেও নিজেদের পেশা ত্যাগ করেননি অনেকেই। এবং এসব পেশা ইসলাম-বিরোধী নয় বলেও মনে হয় তাদের অনেকের কথা-বার্তা ও আচরণে।

পুরো ব্যাপারটি নিয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পক্ষ থেকে আজ কথা হয়েছিল রাজধানীর যাত্রাবাড়িস্থ জামিআ আবু বকর রা.-এর মুফতি, লেখক ও অনুবাদক মাওলানা রেজাউল করীম আবরারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দাওয়াত শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাহর উপর দাওয়াতপ্রদানের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে দাওয়াত হলো দুই প্রকার। দাওয়াত ইলাদ দীন এবং দাওয়াত ইলাল ইসলাহ। দাওয়াত ইলাদ দীন হলো অমুসলিমকে ইসলামের দাওয়াতপ্রদান করা। আর দাওয়াত ইলাল ইসলাহ হলো মুসলমানকে সংশোধনের দাওয়াতপ্রদান করা। এখন কোনো মুসলমানকে আমরা নামাজ-রোজা ইত্যাদির দাওয়াত প্রদান করলাম, সেটা দাওয়াত ইলাদ দীন নয়, বরং মুসলমান হিসেবে একজন অপরজনকে সংশোধনের দাওয়াতপ্রদান করলাম।

‘মুসলমানকে দাওয়াতপ্রদানের মূল লক্ষ্য হলো তাকে সংশোধন করা। সে সংশোধন না হলে বিশুদ্ধ নিয়তে দাওয়াতপ্রদান করলে আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নেকি পেয়ে যাবেন।

‘দাঈর কাছে কোনো শ্রেণি বিন্যাস থাকবে না। তার দৃষ্টিতে সকলেই সমান। কিন্তু আজকে দাওয়াত অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। দুনিয়ার বড় একজন সেলিব্রেটির বাসায় গেলাম। তাঁর সাথে চা-নাস্তা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর ছবি ছেড়ে দিলাম। ব্যস! সেটাকে দাওয়াত মনে করে বসে থাকলাম! এটা কিন্তু কুরআন, সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতের সংজ্ঞায় পড়ে না। দাওয়াতের মাকসাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত দায়িত্ব পালন। দায়িত্ব পালন আর সেলিব্রেটিদের সাথে বসা এক জিনিস নয়। এখানে অনেকেই প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলেন।’

মুফতি আবরার আরও বলেন, ‘আমি কারো নিয়তের উপর হামলা করছি না। কিন্তু এর দ্বারা বাহ্যিকভাবে দাওয়াতের উদ্দেশ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এ ছাড়া এটা আমাদের সালাফ এবং খালাফের পথ ও পন্থা নয়।’

কোনো সেলিব্রেটির কাছে তাবলিগের মেহনতের দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হলো, তিনি দাওয়াত কবুল করলেন এবং তাবলিগের মেহনতে সময়ও দিলেন, নামাজ-কালামে পাবন্দির পাশাপাশি ইসলামিক লেবাসও মাঝে মাঝে পরিধান করলেন, কিন্তু তিনি তাঁর আগের পেশা—সেটা খেলাধুলা হোক কিংবা সিনেমা—পরিত্যাগ করলেন না, উল্টো আরও নিজের কাজের ব্যাপারে সাফাই গাইলেন, নামাজ-কালাম করার জন্য বা তাবলিগে সময় লাগানোর জন্য একজন ধার্মিক হিসেবে আত্মতৃপ্ত থাকলেন, তো এ ধরনের দাওয়াত এবং দাওয়াতের কারণে সংশোধিত ব্যক্তির দ্বারা কি ইসলাম বিষয়ে একটা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে না সমাজে, যে, নামাজ-রোজা ও তাবলিগ করে সিনেমা বানানো বা ক্রিকেট খেললে ইসলামের কোনো সমস্যা নেই?

এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি রেজাউল করীম আবরার বলেন, ‘মুসলমানকে দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো সংশোধন। এখন আগে কেউ নামাজ পড়তো না, দাড়ি রাখতো না, এখন নামাজ পড়ে, দাড়ি রাখে, তাহলে সে সংশোধন হলো। একজন খেলোয়াড় আগে ধর্মের ধারে কাছে আসতো না। তাবলিগের ছোঁয়া পেয়ে নামাজ পড়া শুরু করে, তাবলিগে সময় দেয়, তাহলে তার মধ্যে কিছু সংশোধন হলো। কিন্তু পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। আপনার পেশা হারাম হলে সেটাও সংশোধনের প্রয়োজন। একজন নায়ক দিনে বেগানা নারী নিয়ে স্য্যূটিং করে রাতে তালীমে বসার মাঝে বিশেষ কোনো ফায়েদা নেই। দায়ীর জন্য উচিৎ হলো তাকে বুঝানো। বাকী সংশোধনের মালিক তো আল্লাহ তায়ালা। অন্তর পরিশুদ্ধ না হলে বাহ্যিক ধর্ম পালনের মাঝে আসলে তেমন কোনো ফায়দা নেই। কারণ এরদ্বারা মানুষের কুপ্রবৃত্তি আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। কয়েক বছর আগে দেখলাম, তাবলিগের একজন শীর্ষ লোক বিপিএলের মতো বিখ্যাত জুয়ার আসরে একটি দলের মালিকানা ক্রয় করেছে! তার পরনে কিন্তু বিশাল পাগড়ি! মাথায় সিজদার দাগ। কিন্তু বাহ্যিক এগুলো দিয়ে কি লাভ? এতদিন তাবলিগ করে যদি জুয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারেন? এদের দ্বারা মানুষের কাছে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ম্যাসেজ যাচ্ছে অবশ্যই। কারণ, মানুষ তখন মনে করতে পারে, ইসলাম হারাম এবং হালাল উভয়টার সুযোগ দিয়েছে।’

আগের সংবাদভারতে এবার গরুর জন্য শ্মশান!
পরবর্তি সংবাদঅনলাইন-ভিত্তিক ব্যবসায় প্রতারণার অভিযোগ, কী করছে প্রশাসন