অনলাইন-ভিত্তিক ব্যবসায় প্রতারণার অভিযোগ, কী করছে প্রশাসন

আয়নাল হোসেন

সার্ভিস চার্জ ৫ হাজার টাকা এবং এক মাসের অগ্রিম বেতন পরিশোধ করলেই ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাসায় গৃহপরিচারিকা সরবরাহ দেয়া হবে— এমন চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অনলাইনে গ্রাহক আকৃষ্ট করছে বিকল্প মেইড এজেন্সি। রাজধানীর মহাখালী এলাকার এ প্রতিষ্ঠানের ফাঁদে পা দিয়ে এরই মধ্যে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকেই।

ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃতির সুবাদে দেশব্যাপী ব্যবসা করছে অনলাইনভিত্তিক পণ্য ও সেবা সরবরাহকারী নানা প্রতিষ্ঠান। এগুলোর কোনো কোনোটি ক্রেতা-গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে পারলেও, অধিকাংশের ক্ষেত্রেই রয়েছে প্রতারণার নানা অভিযোগ।

অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি দেখে গৃহপরিচারিকা সরবরাহের জন্য গত বছরের এপ্রিলে বিকল্প মেইড এজেন্সিতে ৫ হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ এবং এক মাসের অগ্রিম ৬ হাজার টাকাসহ মোট ১১ হাজার টাকা জমা দেন রাজধানীর গুলশানের একজন বাসিন্দা। কিন্তু গত নয় মাসেও ওই বাসায় গৃহপরিচারিকা সরবরাহ দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

শুধু গুলশানের এ বাসিন্দা নন, বিকল্প মেইড এজেন্সি আরো অনেকের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ ও অগ্রিম বেতন বাবদ অর্থ নিয়ে গৃহপরিচারিকা সরবরাহে নানা টালবাহানা করে আসছে। এ ঘটনায় রাজধানীর বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন কেউ কেউ।

প্রতারণা মূল লক্ষ্য হলেও গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনে চুক্তিপত্রও করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ চুক্তিপত্রে রয়েছে বেশকিছু শর্তের কথাও। সেখানে উল্লেখ আছে— কাজে যোগদানের পর পরই গৃহকর্মীর সব ধরনের দায়দায়িত্ব নিতে হবে নিয়োগকর্তাকে। গৃহকর্মীর কোনো ধরনের অসদাচরণের দায় নেবে না এজেন্সি। এজেন্সির পাওনা অর্থ গৃহকর্মীর কাজে যোগ দেয়ার সাতদিনের মধ্যে চূড়ান্ত করতে হবে। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে গৃহকর্মীর মাসিক বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর গৃহকর্মীকে তার মাসিক বেতনের ৫০ শতাংশ হারে দুটি বোনাস দিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী, গৃহকর্মী পেতে এজেন্সিকে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৫ হাজার টাকা দিতে হবে, যা অফেরতযোগ্য। তবে চুক্তির সাতদিনের মধ্যে গৃহকর্মী সরবরাহে ব্যর্থ হলে এ অর্থ ফেরত দেবে এজেন্সি। গৃহকর্মীর প্রথম মাসের বেতন এজেন্সিকে দিতে হবে। এটি ১২টি কিস্তিতে গৃহকর্মীর বেতন থেকে কেটে রাখা হবে।

এ বিষয়ে অনলাইনভিত্তিক বিকল্প মেইড এজেন্সির কর্ণধার ভুলু শেখ ওরফে লিটনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, যে গৃহপরিচারিকা কাজ করবেন, তার জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সার্টিফিকেট ও আত্মীয়স্বজনদের পাঁচটি রেফারেন্স সেলফোন নাম্বার থাকবে সেবাগ্রহীতার কাছে। নিয়োগ চুক্তির শর্ত এক বছরের জন্য প্রযোজ্য। এক বছর পর এ সেবাটি পেতে আবারো সার্ভিস চার্জ দিয়ে নবায়ন করতে হবে।

শুধু গৃহপরিচারিকা নিয়োগ নয়, অনলাইনভিত্তিক ক্রয়সেবা গ্রহণ করতে গিয়েও প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে মানুষ। প্রতারণার জন্য অনলাইনকে বেছে নেয়া এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই থাকে না নির্দিষ্ট কার্যালয়। প্রতারণার পর অস্তিত্বহীন এসব প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরাও থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনলাইনভিত্তিক সেবার নামে প্রতারণার বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, অনলাইন সেবার নামে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ আইনি পদক্ষেপ নেবে। এছাড়া অনলাইনভিত্তিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় তদারকি বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি।

অনলাইনভিত্তিক পণ্য ও সেবা প্রদানকারী নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও তাদের তদারকির জন্য নেই কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ অবস্থায় নিজেদের অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দ্বারস্থ হচ্ছেন ক্রেতা-গ্রাহকরা। বছর বছর এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-২০১৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে লিখিত অভিযোগের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭৯টি, যার সবগুলোই নিষ্পত্তি করা হয়। এরপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৬৪টি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৬২, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ হাজার ১৪০ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার ১৯টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের সবই নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে ৪ হাজার ৯৮৫টি। এর মধ্যে অনিষ্পন্ন রয়েছে ২ হাজার ৪৪০টি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দারাজ ডটকমের বিরুদ্ধে মোট ২৫৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। আজকের ডিল ডটকম নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে ৩৫টি। অভিযোগ রয়েছে চালডালের বিরুদ্ধেও। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অক্টোবরে অভিযোগ জমা পড়েছে চারটি। এছাড়া পিকাবু ডটকমের বিরুদ্ধে ছয়টি, অথবা ডটকমের বিরুদ্ধে দুটি, রকমারি ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, বাগডুম ডটকমের বিরুদ্ধে দুটি, রবি শপডটকমের বিরুদ্ধে দুটি, সহজ ডটকমের বিরুদ্ধে নয়টি, ক্লোথ স্টোরের বিরুদ্ধে একটি, সাদমার্ট ডটকমের বিরুদ্ধে দুটি, কিকশা ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, বিক্রয় ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, বিডিশপ ডটকমের বিরুদ্ধে দুটি, বিডি গেজেট২৪ ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, মিরবাজার ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, ফ্যাশন মার্ট ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, ওয়েস্টার্ন কালেকশনের বিরুদ্ধে একটি, ওবে স্লিমের বিরুদ্ধে একটি, বাসবিডি ডটকমের বিরুদ্ধে একটি, রিট্রো ডটকমের বিরুদ্ধে একটি ও বাইবাই ডটকমের বিরুদ্ধে একটিসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩৩২টি অভিযোগ জমা পড়েছে এ তিন মাসে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনভিত্তিক পণ্য ও সেবার বিপণন ব্যবস্থায় ভোক্তাদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে। এগুলো হলো আসল পণ্য বা সেবার নিশ্চয়তা, ভোক্তা বা ক্রেতার সুবিধামতো পৌঁছে দেয়া, গ্রাহকসেবা সহজতর করা ও বৈচিত্র্য আনা এবং প্র্রদেয় অর্থে সেবার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা। দেশে অনলাইনভিত্তিক পণ্য ও সেবার ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বেশির ভাগই সেবার মানে ক্রেতার আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, অনলাইনভিত্তিক সেবা যেমন বাড়ছে, তেমনি অপরাধও বাড়ছে। অনলাইনভিত্তিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে জরিমানা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থবহ ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে তারা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

কৃতজ্ঞতা : বণিক বার্তা

আগের সংবাদনায়ক-ক্রিকেটার-সেলিব্রেটিদের সঙ্গে মুফতি উসামা : দীনের দাওয়াত নাকি অন্যকিছু?
পরবর্তি সংবাদডাকাতি চেষ্টার অভিযোগে জনতার হাতে ধরা পড়লেন পুলিশের এক এসআই