
বিশেষ প্রতিবেদক
আজ ৩১ জানুয়ারি। আন্তর্জাতিক অনেক সংগঠন ও সংস্থা আজকের দিনটিকে পথশিশু দিবস হিসেবে পালন করে।সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখেরও অধিক। এদের অধিকাংশেরই কোনো পরিবার নেই। আবার অনেকেই পরিবার থেকে পালিয়ে কিংবা পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য পথশিশুদের দলে যোগ দেয়। চরাঞ্চল, নদী ভাঙন, বন্যা কিংবা সাইক্লোন-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি হারানো মানুষদের একটি বড় অংশ শহরের বস্তিগুলোতে এসে ঠাঁই নেয়। এই পরিবারগুলো যে চরম দারিদ্র্যের শিকার, তা বলাই বাহুল্য। আর এই দারিদ্র্যের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই শিশুসন্তানদের একটি বড় অংশ পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্যই রাস্তায় নেমে আসে।
রাজধানীর বস্তি বা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে বেকারত্ব, শিক্ষার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে সামাজিক এবং পারিবারিক কলহ চলে। বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ বা পারিবারিক নানা কলহের কারণে শিশুরা অনেক প্রভাবিত হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ছোট বয়সে পারিবারিক কলহ বা নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশুদের বড় একটা অংশ ঘর ছেড়ে পথশিশুতে পরিণত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ঢাকা শহরের পথশিশুদের দৈনন্দিন জীবন শীর্ষক সমীক্ষায় দেখা যায়, শতকরা ৯৮ দশমিক ৬৭ ভাগ শিশুই জীবনযাপনে নির্যাতনের শিকার হয়। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা ঝুঁকছে বিভিন্ন পেশায়। আমাদের শ্রমশক্তির ৩০ ভাগই শিশুশ্রমিক, যার মধ্যে অনেকেই পথশিশু। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা এই শিশু-কিশোররা হরহামেশা বিদেশ পাচারের শিকার হচ্ছে। সুষ্ঠু পারিবারিক ব্যবস্থার অভাব, বাবা-মায়ের ভালোবাসার শূন্যতা, অর্থনৈতিক দীনতা, সামাজিক অব্যবস্থাপনা এই পথশিশুদের ঠেলে দিচ্ছে পঙ্কিলতার দিকে। হাজারো সমস্যা বুকে নিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রির সঙ্গে। পাশাপাশি সহজলভ্যতার কারণে নিজেরাও হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত। অঙ্কুরেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই পথশিশুদের মধ্যে মাদকাসক্তি থাকলেও সরকারের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে তাদের চিকিৎসার কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। ড্যান্ডি নামে এক ধরনের মাদক দিন দিন প্রিয় হয়ে উঠছে মাদকসেবী পথশিশুদের কাছে। রাজধানীসহ সারা দেশে ড্যান্ডি নেশাসক্ত পথশিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ড্যান্ডি হচ্ছে জুতা, সাইকেলের টিউবের ছিদ্র মেরামতের কাজে ব্যবহৃত পেস্টিং আঠা বা সলিউশন গাম। পলিব্যাগে নিয়ে মুখ বা নাক ডুবিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলে নেশা হয়। এ নেশা নাকি গাঁজার চেয়েও কঠিন। টোকাই পথশিশুদের কাছে এ বস্তুটি ড্যান্ডি নামে পরিচিত। সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় এই ড্যান্ডি ছিন্নমূল শিশুদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বড়রাও এর থেকে দূরে নয়। ড্যান্ডি শরীরের জন্য ক্ষতিকর– এটা অনেক পথশিশুর জানা থাকলেও দারিদ্র্যের কশাঘাতে খাবারের অভাব পূরণের জন্য তারা মরণক্ষয়ী এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। ড্যান্ডি গ্রহণে অনেকক্ষণ নেশাচ্ছন্ন হয়ে থাকা যায়, ক্ষুধামন্দা সৃষ্টি হয়। যার ফলে অসহায় এই শিশুরা ভাত খাওয়ার অভাব পুষিয়ে নেয় এই নেশা করে। নেশাচ্ছন্ন থাকার কারণে তাদের ঘ্রাণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা যে কোনো ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো সহজেই কুড়িয়ে নিতে পারে। ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ আড়াল করার এ এক ব্যর্থ প্রয়াস।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানায়, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র সাত বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য ও সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা, এমনকি নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
এ তো গেল কেবল দৈশিক পরিসংখ্যান। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেও পথশিশু ও তাদের অন্ধকার জীবনের চিত্র বেশ ভয়াবহ। ইউনিসেফ বলছে বিশ্বজুড়ে একশ মিলিয়ন শিশু ঘরহীন। ইউনিসেফের হিসেবে, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে প্রতি বছর আটাশ মিলিয়ন শিশু ঘর হারাচ্ছে, স্বজন হারাচ্ছে।
স্বপ্নের দেশ আমেরিকাতেই প্রতি বছর আড়াই মিলিয়ন শিশু পথশিশু হচ্ছে। আমেরিকার প্রতি ত্রিশটি শিশুর একজন পথশিশু হতে বাধ্য হয়, যা আমেরিকান ইতিহাসের সর্বোচ্চ হিসাব। এই শিশুদের গড় বয়স নয় বছর। এরা বাস করে পথে পথে। এরা স্কুলে যায় না। শিক্ষার কোন সুযোগ পায় না। এরা কেউ চকচকে রঙিন গল্পের বই দেখেনি। প্রতি দিন নানা অসুখ আর অপুষ্টিজনিত কারণে এরা পথেই মারা যায়। যারা বেঁচে থাকে, তারা অপরাধ করা শেখে। এই শিশুদের প্রায় দুই মিলিয়ন ফাঁদে পড়ে যায় যৌন নিগ্রহের, আর তাদের বেশির ভাগই মেয়েশিশু।
মানবশিশু জন্মলগ্ন থেকেই সৌন্দর্যপিপাসু। অজস্র মৌলিক জ্ঞান-গুণের এক বিশাল সুবিন্যাস মানবশিশুর মাঝে। আর এ সুবিন্যাসের মাঝেই গোছানো আছে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য, সব ভবিষ্যৎ। তবে বহুকাল থেকে তারা তৃণমূল; যেন এখনো পরাধীন, এখনো কাঁদছে ক্ষুধার্ত, বস্ত্রহীন, বসতহীন, শিক্ষাহীন, চিকিৎসাহীন, মাতা-পিতাহীন, পৃথিবীর সৌন্দর্য মানব পথশিশুরা। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই তারা অবহেলা, অনাদর, বঞ্চনা, লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে ধাপে ধাপে। বাবার কোলের অপার স্নেহ, মায়ের শাড়ির আঁচলে মুখ লুকানোর স্বর্গীয় সুখ তাদের কপালে জোটেনি। দারিদ্র্যের সর্বনিম্নে এদের বসবাস।
তবে পথশিশুদেরকে নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানই কাজ করছে। ঢাকা আহসানিয়া মিশন তাদের প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বয়সের পথশিশুকে নিয়ে কাজ শুরু করেছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার কাজ শুরু হয়েছে। অনেক ছোট বড় এনজিও, সরকারি সংস্থার উদ্যোগে পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও এগুলো সংখ্যায় অনেক কম।
সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষের একটু সহানুভূতি দরকার। সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরে আমার-আপনার দেখানো একটু সহানুভূতি হয়তো এই শিশুদেরকে সমাজের আর দশটা শিশুর মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে। এদের দিয়ে গঠনমূলক কোনো কাজ করানো যেতেই পারে। পাশাপাশি এরা পড়াশুনা করলো, থাকা-খাওয়ার একটা সুব্যবস্থা পেলো, নিরাপত্তা পেলো। অন্তত ভবিষ্যত কিছুটা স্বচ্ছ থাকলো। একটা মজবুত ভবিষ্যত জাতি গঠনে আমাদের এই ত্যাগের কোনো বিকল্প নেই।
