
আশরাফ উদ্দিন খান
শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর, তাদের হাতেই জাতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই অনুভাবনা থেকেই শিক্ষক শ্রেণীর প্রতি প্রতিটি সমাজ শ্রদ্ধা ও সমীহ পোষণ করে থাকে। শিক্ষকের প্রতি এই সমীহবোধ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল ক্ষেত্রেই বিদ্যমান দেখা যায়। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি বা গোষ্ঠী পাওয়া যাবে না শিক্ষকের প্রতি যাদের চরম শ্রদ্ধাবোধ নেই। সম্ভাবত এটা মানব জাতির স্বাভাবিক স্বভাবজাত বোধ থেকেই উঠে আসা একটি প্রবণতা যে, কারো প্রতি অনুগ্রহ করার কারণে অনুগ্রহকারীর প্রতি একটা আলাদা শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়ে থাকে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে যত ধরণের অনুগ্রহ করতে পারে তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অনুগ্রহ হচ্ছে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে, জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে আসা, আলোর পথ দেখানো। আর শিক্ষকগণ ঠিক এই কাজটিই করে থাকেন। আর এই শিক্ষকগণ যখন কওমি মাদ্রাসার সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকেন তখন সেখানে আরো অনেক কারণে তাদের প্রতি শিক্ষার্থীদের ও সমাজের শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
কওমি মাদ্রাসার সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত থাকার কারণে এখানকার শিক্ষকদের ত্যাগ-কুরবানি, ইখলাস আমাদের নিজের চোখেই দেখা। দেশের আনাচে-কানাচে শত-শত মাদ্রাসার হাজার হাজার শিক্ষকের অবস্থা আমাদের সামনে বিদ্যমান। লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা, ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যা জানার আগ্রহ নিয়ে একটু তালাশ করে মনে হল এই বিষয়ে আমাদের হাতে স্পষ্ট কোন পরিসংখ্যান তৈরি হয়নি। দেখা যায় যে, কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা, সেখানে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ইত্যাদি তথ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরণের ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা সামনে আসে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, এবং সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি। তবে বেসরকারি হিসেব মতে, সারা দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি।
বেফাকের একটি নিজস্ব সূত্র অনুযায়ী প্রতি বছর কওমী মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সূত্র অনুযায়ী—২০১৩ সালে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল ৫৫,০০০, যে সংখ্যা পর্যায়ক্রমে নিম্মরুপ ছিল: ২০১৪ সাল: ৬৩,০০০; ২০১৫ সাল: ৭৪,০০০; ২০১৬ সাল: ৮৬,০০০; ২০১৭ সাল: ১,০৫,০০০; ২০১৮ সাল: ১,২১,০০০। অন্যদিকে উইকিপিডিয়াতে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী শুধুমাত্র বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৯০০০টি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়ে থাকে।
১৮৬৬ সালে ভারতের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটিই সর্বপ্রথম কওমি মাদ্রাসা। এর ৩৫ বছর পরে ১৯০১ সালে বাংলাদেশের প্রথম কওমি মাদ্রাসা দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ৩৬ বছরের ব্যবধানে ১৯৩৭ সালে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এ দেশে প্রায় ৪৪৩টি কওমি মাদ্রাসা ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫১টি ছিল দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসা। (যেভাবে এলো কওমি মাদরাসা)
সঠিক ও নিখুঁত পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও এখানে থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়, এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলার প্রতিটি অঞ্চলেই ছোট-বড় কওমি মাদ্রাসার উপস্থিতি দেখা যায়। সেখানে থেকেই অনুমান করা যায় যে, এই সকল মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালনরত শিক্ষকদের সংখ্যা কী পরিমান হতে পারে। তবে এই সকল বিষয়ে স্পষ্ট ও সঠিক পরিসংখ্যান জোগাড় করা জরুরি।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের প্রতি কতটুকু নিবেদিতপ্রাণ, এবং এই খেদমত আঞ্জাম দিতে তাদেরকে কি পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা কওমি মাদ্রাসার সাথে যারা মোটামুটি সম্পর্ক রাখেন তাদের সামনেও বিষয়টি স্পষ্ট। শিক্ষকগণ সমাজেরই অধিবাসী। আর অন্যান্য মানুষের মত তাদেরও বিভিন্ন জাগতিক জরুরত ও প্রয়োজন রয়েছে। তাদেরকে সেই প্রয়োজন পূরণ করতে হয়। যেহেতু তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সমাজের কল্যাণে কাজ করে থাকেন তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাদের জাগতিক জরুরত পূরণ করার ব্যবস্থা সমাজ নিজের দায়িত্ব হিসাবে মনে করে থাকে। তাদেরকে তাদের খেদমতের কারণে বিশেষ সম্মানী প্রদান করা হয়ে থাকে। সম্মান ও মর্দাযার দিক থেকে শিক্ষককে দুনিয়ার সকল দেশ ও সমাজেই সমীহের চোখে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তাদের জাগতিক জরুরত পূরণ করার দিক থেকে বা সম্মানির দিক থেকে সকল সমাজে এক স্তরে বিবেচনা করা হয় না বা এটা সম্ভবও না, কারণ সকল দেশেই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এক ধরণের নয়।
কওমি মাদ্রাসার পাশাপাশি আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে এবং যেগুলোতে জাতীয় বেতন স্কেল দ্বারা সরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত। যেমন সরকারি নিয়ম অনুযায়ি বর্তমানে প্রধান শিক্ষকরা প্রশিক্ষণবিহীন অবস্থায় ১২তম গ্রেডে চাকরি শুরু করেন, প্রশিক্ষণের পর তাঁরা যান ১১তম গ্রেডে। আর চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে দশম এবং ১৬ বছর পূর্তিতে যান নবম গ্রেডে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকরা প্রশিক্ষণবিহীন অবস্থায় ১৫তম গ্রেডে চাকরি শুরু করেন, প্রশিক্ষণের পর তাঁরা যান ১৪তম গ্রেডে। ১০ বছর পূর্তিতে যান ১৩তম গ্রেডে এবং ১৬ বছর পূর্তিতে যান ১২তম গ্রেডে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী ১২ তম গ্রেডের মূল বেতন হচ্ছে ৫৯০০ সেই সাথে বিভিন্ন অবস্থা অনুযায়ি বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা যোগ হয়ে থাকে। আর নবম গ্রেডের মূল বেতন হচ্ছে ১১০০০ + বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা। বিভিন্ন কারণে ও পর্বে এর সাথে আরো কিছু ভাতা যুক্ত হয়ে থাকে। এটা ছিল ২০০৯ সালের কথা। এরপর এই স্কেলে পরিবর্তন আনা হয়, যেমন ২০১৫ সালের স্কেলে ১২তম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ১১,৮৭০, সেই সাথে অন্যান্য ভাতা ও সুবিধাও যুক্ত রয়েছে।
এটা আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষকদের বেতনের অবস্থা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিক্ষকদের সম্মানি তাদের অবস্থা অনুযায়ী হয়ে থাকে। নিচের পরিসংখ্যানের দিকে একটু খেয়াল করি: ‘২০১২-র তথ্য অনুযায়ী, জাপানে প্রতিমাসে একজন শিক্ষক (গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-১০) প্রায় আড়াই লাখ ইয়েন (গ্রেড-১১ থেকে গ্রেড-২০) প্রায় সাড়ে তিন লাখ ইয়েন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ ইয়েন কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে এরও বেশি পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার একজন শিক্ষকের সর্বনিম্ন বাৎসরিক আয় ৪১,১০৯ মার্কিন ডলার আর সর্বোচ্চ আয় ৯৫,১০১ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য প্রায় মাসিক ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা। (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক: মর্যাদা ও দায়িত্ব)
কওমি শিক্ষার সাথে এই ভাবে অর্থের বিষয়টি জড়িয়ে আলোচনা করা মোটেও মানানসই নয়, এর পরেও শুধুমাত্র বিষয়টি একটু স্পষ্ট করার জন্যে এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষকদের কথা বাদ দিয়েও যদি শুধুমাত্র আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষকদের বেতন বা সম্মানীর সাথে কওমি মাদাসার শিক্ষকদের সম্মানী বা অজিফাহ নিয়ে তুলনা করে দেখা যায়, তাহলে এটা স্বীকার করতে হয় যে, কওমি শিক্ষককে তাদের জাগতিক উপযুক্ত অজিফার ব্যবস্থা এখানো আমরা করতে পারিনি। বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেখা যায় যে, অধিকাংশ মাদ্রাসার শিক্ষকদের মাসিক অজিফাহ বাকি রাখা হয়, সময় মত সেটা তাদেরকে প্রদান করা হয় না। এর আগেই এটা বলা উচিত যে, বেতন নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সাধারণত তেমন কোন মূলনীতির অনুসরণ করা হয় না, বরং এখানে সাধারণ মূলনীতি হচ্ছে যত কম খরচে শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে সেই চেষ্টা করা। এই অবস্থা সৃষ্টির পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে, যেমন—.
এক. শিক্ষকদের অনেকেই এটাকে দ্বীনী দায়িত্ব মনে করে এই কাজ করে থাকেন অর্থাৎ তারা মনে করেন যে, এই কাজ নিজের পক্ষ থেকেই আঞ্জাম দেওয়া জরুরি, এখানে অজিফার চিন্তা করা সমুচিত নয়, তাই তাদের চিন্তায় অজিফার বিষয়টি তারা রাখেন না। তাদের এই মনোভাবকে অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার করা হয়ে থাকে।
দুই. শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অর্থাৎ ইচ্ছা থাকলেও কর্তৃপক্ষের সাধ্যের বাইরে অনেক কিছু থাকার কারণে অনেক কিছু করা যায় না বা শিক্ষকদের জাগতিক উপযুক্ত অজিফাহ প্রদান করতে পারেন না।
তিন. কর্তৃপক্ষের অবহেলা স্বেচ্ছাচারিতা করার মানসিকতা, অর্থাৎ এখানে ক্ষমতা থাকা স্বত্বেও শিক্ষকদেরকে যথাযত অজিফাহ প্রদান করা হয় না।
চার. উপযুক্ত নীতিমালা ও তদারকি না থাকা।
শিক্ষকগণ হচ্ছে জাতি তৈরির কারিগর, তাদেরকে আমরা যতখানি স্বাধীন ও মুক্ত করে দিতে পারবো, তারা ঠিক ততখানি নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতি তৈরির কাজ আঞ্জাম দিতে পারবেন। যদি তাদেরকে আমরা স্বাধীন ভাবে কাজ করার পরিবেশ দান করতে না পারি, তাহলে তাদেরকেও নিজের জরুরত পূরণ করার জন্যে অন্য কোন ভাবে চিন্তা ও ফিকির করতে হবে। ফলে যেই সময়ে তারা ছাত্রদের উন্নতির জন্যে ব্যয় করতে পারতেন সেই সময়ে তাদেরকে নিজেদের সাধারণ জরুরত পূরণ করার জন্যে ফিকির করতে হয়ে থাকে।
কওমি মাদ্রাসার ভিতরের খোঁজ নিয়ে দেখা হলে, দেখতে পাবো যে, এখানে হাজার হাজার শিক্ষক রয়ে গেছেন যাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনের খেদমত করে যাওয়া। এর কারণে তাদের দুনিয়া ধ্বংস হলেও সেই দিকে তাদের কোন খেয়াল নেই, বরং তাদের একমাত্র খেয়াল হচ্ছে দ্বীনের এই আমানত পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়া। এটাকেই তারা তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য মনে করে থাকেন ও এখানেই তারা তাদের জীবনের সফলতা ও সার্থকতা খুজে পান। এই ভাবে তারা তাদের দায়িত্ব পালনে কামিয়াব হলেও যাদের উপর তাদের দায়িত্ব ছিল তারা কতটুকু তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারলেন সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। কাজেই দায়িত্বশীল ও নীতিনির্ধারকদেরকে এই ব্যাপারে জাতির স্বার্থে চিন্তা-ফিকির করা দরকার।
