
রাগিব রব্বানি
ওয়াজ মাহফিলের প্রথা বাংলাদেশে প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। মাহফিলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বক্তার সংখ্যা। কিন্তু মানসম্মত ও যোগ্য আলোচকের অভাব থেকেই যাচ্ছে এ ময়দানে। নতুন যাঁরাই এসেছেন গত কয়েক বছরে, বা এখনও আসছেন, তাঁদের মধ্যে কমেডি করে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করা, বাহারি সুরে মঞ্চ মাতোয়ারা করা আর কুরআন-হাদিসের বাইরের আজিব আজিব বাতচিত দিয়ে মানুষকে হাসানোর কসরতকারী বক্তার জয়জয়কার। যাঁদের মধ্যে যেমন দাওয়াতের কোনো মেজাজ নেই, তেমন নেই ইখলাস ও হেদায়েতের নিয়ত।
একসময় এই সব গুণবিশিষ্ট বক্তা কেবল বেদআতি ও মাজারপূজারি ঘরানায় ছিল, এখন দেওবন্দিধারার হক্কানি অঙ্গনটাও ছেয়ে গেছে এই ধরনের ‘কমেডি বক্তা’র দৌরাত্ম্যে। ফলে ওয়াজ মাহফিলের ইখলাস ও হেদায়েত সমৃদ্ধ আবেদন একদম ম্লান হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। সমাজের বোদ্ধা ও শিক্ষিত শ্রেণি অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মাহফিলের আয়োজন ও উদযাপন থেকে।
বেশ কিছুদিন যাবৎ মুফতি ইলিয়াসুর রহমান জিহাদীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তাঁর বিভিন্ন কথাকে কোট করে ধর্মীয় অঙ্গনেও অনেককে দেখা গেছে ট্রল করতে। অনেকে ঠাট্টা করে আবার অনেকে শ্রদ্ধা নিয়ে তাঁকে ‘জিহাদী হুজুর’ বলে সম্বোধন করেন।
ইউটিউবে তাঁর বেশ কয়েকটি বয়ান ঘেটে দেখা গেছে মাহফিলে তিনি এমন সব কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডের অবতারণা করেন, যা চিরসুন্দর জীবনব্যবস্থা ইসলামের দাওয়াতি মেজাজের সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না। সিগারেট ফোঁকার কাইফিয়াত দেখানো, ফেসবুকের ‘কপালে’ জুতার ‘বাড়ি’ মারা, ইসলাম থেকে যারা দূরে আছেন, তাদেরকে সুন্দরভাবে বোঝানোর বদলে গালিগালাজ করা, নাস্তিকদেরকে এক হাত নেওয়ার নামে খামোখা চিৎকার করা, আজগুবি ঘটনা বর্ণনা করে কান্নার অভিনয় করা—ইত্যাদি তাঁর বয়ানের বৈশিষ্ট্য। এসবের বাইরে কুরআন-হাদিসের মৌলিক ও জ্ঞানগর্ব কোনো আলোচনা সাধারণত তাঁর বয়ানে পাওয়া যায় না।
তাঁর এসব বয়ানের বিভিন্ন অংশের ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে ইসলাম-বিরোধিরা ঢালাওভাবে প্রচার করে যে, দ্যাখো, ইসলাম কত জঘন্য, কেমন ক্ষ্যাত এবং উগ্র! অথচ জিহাদী হুজুরের বক্তব্য-বয়ান কোনোভাবেই যে ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করে না, বরং কলুষিত করে তা ইসলাম সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা যাদের আছে, যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবেন।
এ বিষয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পক্ষ থেকে আজ কথা বলেছিলাম সিলেট ও চট্টগ্রামের দুজন আলেম দাঈর সঙ্গে। চট্টগ্রামের তরুণ দাঈ মাওলানা লিসানুল হক শাহরুমীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুফতি ইলিয়াসুর রহমান জিহাদী, বা এই ধরনের ওয়ায়েজ যাঁরা আছেন, সম্প্রতি সচেতন ও বোদ্ধা মহল থেকে যাঁদের ওয়াজের আলোচনা ও কাইফিয়াতের কারণে বেশ সমালোচনা হচ্ছে, আপনি তাদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
উত্তরে মাওলানা শাহরুমী বলেন, ‘এরকম বক্তাদের বক্তব্যের যে নাটকীয় ভঙ্গি, এই ভঙ্গির সঙ্গে ইসলামি শরিয়তের দূরতম সম্পর্কও নেই৷ এরা ইসলামের পোশাকধারী কিছু অভিনেতা৷ এদেরকে যারা দাওয়াত দেন তারা দীন সম্পর্কে না জেনে না বুঝেই দাওয়াত দেন৷ একজন প্রকৃত আলেমের জন্যে ওয়াজ, বয়ান বা বক্তৃতা দাওয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম৷ এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত গুরুদায়িত্ব৷ আর দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়া৷ জিহাদির মতো অভিনেতার কোনো বয়ানে কোনো শ্রোতা তাকওয়া পরহেজগারি এবং দীন শিখবে এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা৷ যা কিছু হচ্ছে এসবের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই৷ কুরআন-হাদিস দ্বারা এরকম বক্তৃতা-ওয়াজ প্রমাণিত নয়৷’
একই প্রশ্ন রেখেছিলাম সিলেটের আম্বরখানা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মুফতি জিয়াউর রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ‘এই ধাঁচের বয়ান আমি চরমভাবে অপছন্দ করি৷ এ-জাতীয় বক্তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুবই আপত্তিকর ও দৃষ্টিকটু৷ এমনটা সমর্থনযোগ্য নয়৷ বয়ান হবে শান্ত-সুষ্ঠুভাবে, নরম ও কোমল ভাষায়৷ কুরআন-সুন্নাহর দলিলসমৃদ্ধ ও প্রজ্ঞাপূর্ণভাবে৷
‘তবে হ্যাঁ, বিষয়ের আলোকে কখনো বড় আওয়াজ, চোখ-রাঙানি ও উত্তেজনাপূর্ণ ভঙ্গি চলে আসতে পারে৷ তাই বলে কমেডি ও ফানি চরিত্রের ভূমিকায় আসা একজন ওয়ায়েজের জন্যে মোটেই শোভন নয়৷ মানুষের হেদায়াতের জন্যে তেমন কার্যকর হবে বলে প্রতীয়মান হয় না৷’
এ ধরনের বক্তাদের উদ্দেশে বিশেষ কোনো আহ্বান বা অনুরোধ আছে আপনার? এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি জিয়া বলেন, ‘নিজেকে কেবল একজন বক্তার ভূমিকা থেকে তুলে এনে একজন দাঈ’র ভূমিকায় নিয়ে আসা উচিত৷ আর একজন দাঈ হিসেবে যে গুণাগুণ থাকা প্রয়োজন, সেগুলো ফলো করে নিতে পারলেই একজন সফল ও সার্থক দাঈ হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারবেন৷’
