
রাগিব রব্বানি
বাংলাদেশে গণপরিসরে ব্যাপকভাবে ইসলামভীতি কাজ করে। সেই সঙ্গে আছে ইসলামি পোষাক-পরিচ্ছদ নিয়ে এক শ্রেণির কটাক্ষ এবং অন্য শ্রেণির হীনমন্যতা। এক শ্রেণি দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি ও বোরকাকে ‘জঙ্গিবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’দের পোষাক মনে করে এবং এগুলো যারা পড়ে তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হেনস্থা করে। ফলে অন্য শ্রেণি এমন লেবাস পরতে হীনমন্যতায় ভোগে এবং এক সময় তা পরিত্যাগ করে।
হীনমন্যতায় ভোগা এবং ভয়-ভীতি ও হেনস্থার শিকার এমন কিছু তরুণ-তরুণীর বক্তব্য তুলে এনেছে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমের বিশেষ টিম।
তাদের একজন শুয়াইব। ঢাকার একটি সরকারি কলেজের ছাত্র তিনি। সঙ্গত কারণেই কলেজের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। গত বছরের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের পর কলেজের রাজনৈতিক নেতারা শুয়াইবকে ‘জামায়াত’ ট্যাগ দিয়ে ‘দেখে নেওয়া’র হুমকি দেন। শুয়াইবের দাবী ‘তার জামায়াতের সাথে কোন সম্পর্ক নেই, জামায়াতের ছেলেরা বড় দাড়ি রাখেন না’। পরে এক শিক্ষকের মধ্যস্থতায় তিনি তাদের রোষানল থেকে বাঁচেন। সেসময় হেনস্থার আশংকা থেকে তিনি নিজের দাড়ি কামিয়ে ফেলেন এবং মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সুমাইয়া পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বুঝ হবার পর থেকেই বাইরে কোথাও বেরোলে বোরকা পরে বেরোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেজেন্টেশনের দিনেও যথামাফিক বোরকা পরে ক্লাসে আসেন, কিন্তু এরজন্য ক্লাসভর্তি ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে তাকে কেবল বোরকা পরার কারণে অপমান করা হয়। হেনস্থা করা হয় ‘আইএস’ ট্যাগ দিয়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত এমন আচরণে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুমাইয়া।
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন শাফিক। ধর্মীয় পরিবারে বড় হয়েছেন। বড় হয়ে নাটকের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। ছোটকাল থেকে নামাজ পড়ার অভ্যাস থাকলেও নাটকের গ্রুপে নামাজ পড়াকে ‘পশ্চাদপদতা’ হিসেবে দেখা হয়। শাফিক জানান, নামাজের জায়গা না পেয়ে এবং সহকর্মীদের হেনস্থা থেকে বাঁচতে তিনি বাথরুমে ঢুকে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করেন। ‘আমি তখন অবুঝ ছিলাম, এ বুঝ ছিল না যে বাথরুমে নামাজ পড়লে নামাজ হবে না, কিন্তু সহকর্মীদের হেনস্থা থেকে বাঁচবার জন্য আমি অমনটা করতাম। নামাজ পড়ার মতো কোনো জায়গাও থাকত সেখানে। যেখানেই দাঁড়াতাম সহকর্মীরা ‘বাঁকা’ দৃষ্টিতে দেখত।’
মৌসুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি কলেজে পড়েন। ধর্মীয় পরিবারে বড় হয়েছেন। নিয়মিত বোরকা পরতেন। কলেজের সাধারণ ছাত্রীরা কেবল এ কারণে তার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে চাইতো না। এই পোশাকে তিনি অনেক অনুষ্ঠানেও যেতে পারতেন না।
‘অনেকে কেমন যেন বাঁকা চোখে তাকাত। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি আর বোরকা পরবো না। সিদ্ধান্তমতো বোরকা ছাড়া যখন বেরোতে শুরু করলাম, তখন কলেজে অন্য যারা বোরকা পরত, তারা আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করলো। বলা শুরু করল যে, আমি ‘পথভ্রষ্ট’ হয়ে গেছি। বোরকা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমি জানি। কিন্তু পরিবেশের কারণে পরতে পারছিলাম না। না পরার ব্যাপারে আমাকে কেউ চাপ দিচ্ছিল না ঠিক, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে একটা চাপের মুখে ছিলাম। সবার সাথে মিশতে পারছিলাম না। তাই বোরকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু ছেড়েও এখন মুশকিলে পড়েছি। কলেজের অনেক সহপাঠী যেমন এড়িয়ে চলে, পরিবার থেকেও তেমন চাপ আসে, তাছাড়া নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া একটা অপরাধবোধ তো আর আছেই, সব মিলিয়ে মানসিক অস্থিরতায় আমি খুব যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।’ বলছিলেন মৌসুমি।
তৌফিক জোয়ারদার বইমেলায় গিয়েছিলেন তার ফুপাত ভাই মুন্না জোয়ারদারের সাথে। তিনি বলেন, ‘এক সময়ের কেতাদুরস্ত, ওয়েস্টার্ন নায়কোচিত মুন্না ভাই এখন পুরাদস্তুর তাবলিগি। বইমেলায় ঢোকার সময় পাশাপাশি অয়াক-ত্রু মেটাল ডিটেক্টরের ভেত দিয়ে পার হলাম। পুলিশ সদস্য আমার পকেটের ওপর আলতো ছোঁয়া দিয়ে ঢুকতে দিল। আর মুন্না ভাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে পকেটের সবগুলো অ্যালিমেন্ট (তসবি মেসও্যাক আতর ইত্যাদি) বের করে দুয়েকটা প্রশ্ন করে তারপর ঢুকতে দেয়। আমি ভেতরে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলাম আর এই দৃশ্যমান বৈষম্যের দৃশ্য হজম করছিলাম। মুন্না ভাই ভেতরে ঢুকে ম্লান একটা হাসি টেনে বলল, “অভ্যাস হয়ে গেছে, দাড়ি-টুপি দেখলে সবজায়গায়ই অমন চেক করে। তাই বলে নিজের বিশ্বাস তো আর বদলাতে পারি না।” আমি ম্লান হেসে বললাম, “জানি মুন্না ভাই, এ সময় কেমন লাগে। দেশের বাইরে সবুজ পাসপোর্ট দেখে সিকিউরিটি স্টাফরা আমাকেও এভাবে তল্লাশি করে। তাই বলে আমিও তো আমার সবুজ পাসপোর্ট বদলাতে পারি না।” তৌফিক জোয়ারদার বলেন, ‘তারপর সব ভুলে হসিমুখে দুই ভাই বইমেলা ঘুরে সেলফি তুলে বাড়ি ফিরলাম। এই তো জীবন।’
তরুণ দাঈ মুফতি মনোয়ার হোসাইন। বগুড়া বাণিজ্যমেলায় গিয়েছিলেন। অনেক মাদরাসাছাত্রের উপস্থিতি ছিল সেখানে, যাদের অনেকে মাথা থেকে টুপি খুলে ফেলেছেন। পাঞ্জাবিও অনেকে যতটা সম্ভব অভার-কোটের ভেতর লুকানোর চেষ্টা করেছেন। মুফতি মনোয়ারের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, হীনমন্যতায় ভোগার কারণেই মাদরাসা-শিক্ষার্থীরা আধুনিক যেকোনো প্লেসে নিজেদের লেবাস আড়াল করার অমন চেষ্টা করে থাকেন।
ইসলাম বিষয়ে সচেতন তরুণরা মনে করছেন, দেশে ‘জঙ্গিবাদ-বিরোধী’ খণ্ডিত প্রচারণা, মিডিয়ায় ইসলামি পোশাক ও চরিত্রকে নেতিবাচকভাবে দেখানো, উগ্র সেকুলারদের ধর্মবিরোধী অপপ্রচার এবং ধর্মীয় দলগুলোর সাথে সরকারি টানাপড়েনের কারণেই গণপরিসরে সাংস্কৃতিকভাবে ইসলামভীতির এই সয়লাব। এবং এ থেকেই ইসলাম ও ইসলামি লেবাসের ব্যাপারে এমন নেতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাদী ইসলামি নেতৃত্ব বিদ্যমান এই সংকটের সমাধান নিয়ে এখনই না ভাবলে অদূর ভবিষ্যতে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
