
রাগিব রব্বানি
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বামধারার রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন তুমুল সমালোচিত ও বিতর্কিত এক বক্তব্য দিয়েছেন। যাতে মেনন দাবি করেছেন, হেফাজতে ইসলামের চাপে জাতীয় শিক্ষাবোর্ড প্রণীত পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই সূত্র ধরে তিনি তাঁর এ বক্তব্যে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর অভিভাবকতুল্য আলেমশ্রেণিকে নিতান্ত নীচ ও হীনভাষায় কটাক্ষ করেছেন। পাশাপাশি সরকারেরও পরোক্ষ সমালোচনা করেছেন তীব্রভাবে।
মেনন ও এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চেতনা-বিরোধী একটি মহলের দাবি মতে পাঠ্যপুস্তকে যে ‘পরিবর্তন’ আনা হয়েছিল, তা ২০১৭ সালের ঘটনা। কিন্তু ‘পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা হয়েছে’ দাবি তুলে এই মহলটি বছর দুয়েক ধরে যে বিতর্ক সৃষ্টির পায়তারা করছে, তা আসলে কতটা যৌক্তিক?
২০০৯ সালের পর থেকে প্রতি বছরই জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের বইয়ে বেশ পরির্তন সাধিত হতে থাকে। ইসলাম, মুসলমান এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান সংশ্লিষ্ট পাঠ রহস্যজনকভাবে বাদ পড়তে থাকে। পাশাপাশি এমনসব পাঠের অন্তর্ভুক্তি ঘটতে থাকে, যা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, চেতনা ও শিক্ষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক, এবং যা একটি মুসলিম শিশুর মুসলিম হিসেবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর।
কেমন পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, কয়েকটি বই থেকে উদাহরণ টানলে খানিকটা আন্দাজ করা যাবে। প্রথম শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে বর্ণমালা শিক্ষার নামে ঋষি, ঢোল, তবলা, রথযাত্রা—ইত্যাদি হিন্দুদের ধর্মসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা ২০০৯ সালের আগে এত ব্যাপকভাবে পাঠ্যক্রমে ছিল না।
দ্বিতীয় শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে ‘সবে মিলে করি কাজ’ শিরোনামে ইসলাম ধর্মের মহান নবি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবন চরিতের সামান্য কিছু অংশ গল্প আকারে সন্নিবেশিত ছিল। কিন্তু ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের দিকে এসে এই পাঠটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি এ বইয়ে। অথচ মুসলিম শিশু তো বটেই, কোমলমতি অমুসলিম শিশুরাও এখান থেকে পরস্পরের মধ্যে কীভাবে সৌহার্দ্যবোধ গড়ে তুলতে হয়, তার শিক্ষা চমৎকারভাবে নিতে পারত।
৩য় শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে ‘খলিফা আবু বকর’ শিরোনামে একটি পাঠ ছিল, সেটাও বাদ দেওয়া হয়েছে একই সময়ে। ৪র্থ শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে ‘বিদায় হজ’ শিরোনামের পাঠকে বাদ দিয়ে তার স্থানে বইটির ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় যোগ করা হয় কবি অন্নদা শঙ্কর রায়ের লেখা ‘নেমন্তন্ন’ কবিতা। এই কবিতায় হিন্দুদের ধর্মীয় বিভিন্ন কৃষ্টিকালচারের প্রতি শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হয়।
৫ম শ্রেণির একই বইয়ে কবি কাদের নেওয়াজ লিখিত অত্যন্ত সমাদৃত ও শিক্ষণীয় ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা এবং ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বীর শহীদ তিতুমীরের জীবন নিয়ে একটা গল্প বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাতে সংযুক্ত করা হয় অশ্লীলতার জন্য বহুল বিতর্কিত এবং স্বঘোষিত নাস্তিক লেখক হুমায়ুন আজাদ লিখিত ‘বই’ নামক একটি কিশোর কবিতা। যেটায় কৌশলে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কুরআন ও হাদিসের ব্যাপারে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক ধারণা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বিজ্ঞ আলেমদের।
৬ষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘সততার পুরষ্কার’ ও ভ্রমণ কাহিনি নির্ভর ‘নীলনদ ও পিরামিডের দেশ’ শিরোনামের দুটো গল্প। এর পরিবর্তে সংযুক্ত হয়েছে ‘রাচি ভ্রমণ’ শিরোনামে ভারতের হিন্দুদের একটি তীর্থস্থান ভ্রমণের গল্প। পাশাপাশি আনা হয়েছে ‘লাল গরুটা’ নামক একটি গল্প। যার মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে শেখানো যায়, গরু হচ্ছে মায়ের মতো সম্মানীয় ও পূজনীয়।
সপ্তম শ্রেণির ‘সপ্তবর্ণা’ বই থেকে বাদ দেওয়া হয় ‘মরুভাস্কর’ শিরোনামে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাত-নির্ভর একটি গল্প। এর বদলে সংযুক্ত করা হয় ‘বাংলাদেশের হৃদয়’ নামক একটি কবিতা, যেটাতে মূলত দেবদেবীর প্রশংসা করা হয়েছে৷
অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ‘বাবরের মহত্ত্ব’ এবং সুফিয়া কামাল লিখিত ‘প্রার্থনা’ নামক কবিতা। সংযুক্ত হয় ‘দেব মন্দির’ ‘মূর্তিপূজা’ ইত্যাদি শিরোনামের পাঠ।
নবম-দশম শ্রেণির ‘মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য’ নামক বইয়ে বাদ দেওয়া হয় প্রাচীন কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর ও আলাওল লিখিত যথাক্রমে ‘বন্দনা’ ও ‘হামদ’ নামক কবিতা। বাদ দেওয়া হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘ওমর ফারুক’ কবিতাটিও। আর অন্তর্ভুক্ত করা হয় ‘আমার সন্তান’ নামক একটি কবিতা, যেটা হিন্দুদের ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ মঙ্গলকাব্য থেকে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘সুখের লাগিয়া’ নামক একটা কবিতাও স্থান পায়, যেটায় হিন্দুদের রাধাকৃষ্ণের লীলাকীর্তন বর্ণিত হয়েছে।
এরকম আরও নানা কাটছাট এবং সংযুক্তি ঘটেছিল জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে। নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, মুসলিম শাসক এবং ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানীর প্রেরণা ও নৈতিকতার শিক্ষামূলক জীবনী, ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহ্যের সাথে পরিচিতিমূলক কবিতা, রচনা ইত্যাদি—যেগুলো বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এ দেশের সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন সময়ে অন্তর্ভূক্তি পেয়েছিল, সেগুলো মাত্র কয়েক বছরে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এমন সব পাঠের সংযোজন করা হয়েছিল, যা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চেতনা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও বেমানান। অসাম্প্রদায়িকতা শিক্ষা দেয়ার নামে মুসলিম শিশুদেরকে ধাপে ধাপে ইসলাম-বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী এবং হিন্দুয়ানি সাম্প্রদায়িক রূপে গড়ে তোলার জন্যই এই পায়তারা চালানো হয়েছিল একটি বিশেষ মহলের পক্ষ থেকে, এমন দাবি বিজ্ঞ আলেম সমাজের।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে দেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর অভিভাবকতুল্য ওলামায়ে কেরাম আপত্তিজনক এসব বিষয় পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে পূর্বের বিষয়াবলি দিয়ে তা সাজানোর জোর দাবি জানান সরকারের কাছে। সরকার তাঁদের অভিযোগকৃত বিষয়গুলো খতিয়ে এর বাস্তবতা পেয়ে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যক্রমে ধর্ম ও মুসলিম সংস্কৃতি-বিরোধী এবং নতুনভাবে সংযুক্ত বিষয়াবলি বিলুপ্ত করে পূর্বের পাঠকেই আবার ফিরিয়ে আনে। পরিবর্তন নয়, বিগত কয়েক বছরে বিশেষ এজেন্ডা নিয়ে পরিবর্তন করা বিষয়গুলোকে মুছে ফেলে বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবান্ধব পূর্বের পাঠ্যাবলিই আবার পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাও পুরোপুরিভাবে নয়।
কিন্তু বিশেষ একটি মহল, যারা এ দেশের মুসলমানদেরকে ধর্মীয় পরিচয়ে দেখতে চায় না, তারা তারপর থেকে ব্যাপকভাবে প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতে থাকে যে, হেফাজতের দাবিতে সরকার পাঠ্যবইয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের পাঠ সন্নিবেশিত করেছে। এরই ধারাহিকতায় বিশেষ মহলটির অন্যতম নেতা রাশেদ খান মেনন গত ৩ মার্চ রোববার সংসদে প্রদত্ত তাঁর বিতর্কিত বক্তব্যে এই বিষয়টিকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে আসেন।
