শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহের নির্বাসনের রায় : ফিরে দেখা ইতিহাস

কাজী মাহবুবুর রহমান

আজ ৯ মার্চ। ১৮৫৮ সালের এই দিনেই ইতিহাসের শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নির্বাসনের রায় হয়েছিল।

সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে। মোগল সাম্রাজ্যের প্রদ্বীপ তখন নিভু নিভু জ্বলছে। বাহাদুর শাহ জাফর বহুলাংশেই ইংরেজদের আয়ত্বে চলে যেতে বাধ্য হন। ইংরেজরা তাঁকে একরকম তাদের বেতনভুক্ত কর্মকর্তার মতো সিংহাসনে বসিয়ে রাখে। তিনি বার্ষিক ১ লাখ টাকা ভাতা পেতেন। কিন্তু এর ভেতর দিয়েও মোগল খান্দানের ঐশ্বর্য্য ফিরিয়ে আনতে অনেক রকম প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে রাজ্যের পরিবর্তে রাজ্যের বাইরে আরও ভালো জীপনযাপনের প্রস্তাব পেশ করে। কিন্তু জাত্যাভিমানী এই মুসলিম বাদশাহ কোম্পানির সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।

এ ছাড়া সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন নিয়েও ইংরেজদের সঙ্গে সম্রাটের মনোমালিন্য হয়। সম্রাটের ক্ষমতা ও মর্যাদা খর্ব করতে নানা উদ্যোগ নেয় কোম্পানি। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও সম্পদ সব কিছু হারিয়ে সম্রাট প্রাসাদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন। এ সময় অমর্যাদার মনোবেদনা ভুলে থাকার জন্য তিনি গজল ও মুশায়েরায় নিমগ্ন থাকতেন; লালকেল্লায় সাহিত্যের আসর বসিয়ে সময় কাটাতেন। তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। জীবনের কষ্ট ও বিষাদ তাঁর কবিতার মূল বিষয়। তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে দু:খ ও বিষাদের সাথে দেশ ও জাতির পরাধীনতার কথা বিধৃত। একটি কবিতায় আছে–‘উমর দরাজ মাঙ্গিথি, মিলা চার দিন/ দো কাট গেয়া আরজু মে দু ইন্তেজার মে’ যার অর্থ–‘চার দিনের আয়ু নিয়ে দুনিয়াতে এসেছিলাম। দু’টি কাটল প্রত্যাশায় আর দু’টি অপেক্ষায়।’

এরপর আসে ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের দিন৷ ইংরেজ সরকারের নানাবিধ হঠকারিতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে সেনা ব্যারাকে জেগে ওঠে বিদ্রোহ। সমগ্র ভারতজুড়ে তখন নেতৃত্বের সংকট। সর্বত্রই বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন সংকট দেখা দিচ্ছে। কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে মজলুম জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কোথাও একত্রিত হতে পারছে না৷ সিপাহি বিদ্রোহ জেগে ওঠার কালে বাহাদুর শাহ জাফর দিল্লির একটি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মিরাট থেকে ৩০০ জনের একটি বিদ্রোহী দল এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে, যার মধ্যে সিপাহি ও অন্যান্য পেশার মানুষও ছিলেন। তাঁরা বাহাদুর শাহ জাফরকে এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে বললে তিনি রাজি হন। এরপর বাহাদুর শাহ হয়ে ওঠেন ভারতের কোটি কোটি মানুষের বিদ্রোহ ও ঐক্যের প্রতীক। ১৮৫৭ সালের জানুয়ারিতে মিরাট ও ব্যারাকপুরে শুরু হওয়া বিদ্রোহ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু চার মাসের মাথায় ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমন করে এবং তারা কবি ও যুবরাজ মোল্লা ও কামাক্ষা, সুফি ও পণ্ডিত—সবাইকে পাকড়াও করে ফাঁসি দেয়। ধ্বংস করে প্রাসাদ, মসজিদ, ঈদগাহ, বাগান ও অগণিত ঘরবাড়ি। ২১ সেপ্টেম্বর বাহাদুর শাহ আত্মসমর্পণের পরদিন মেজর উইলিয়াম হাডসন তাঁর দুই পুত্র মির্জা মোগল ও মির্জা খিলজি সুলতানকে গুলি করে হত্যা করেন। অবশ্য কয়েক মাস পর তিনিও লখনৌতে কুর্দি বেগমের হাতে নিহত হন।

১৮৫৮ সালের ২৭ জানুয়ারি দিল্লিতে বাহাদুর শাহের বিচার শুরু হয় এবং শেষ হয় ৯ মার্চ। আদালত তাঁকে মিয়ানমারে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করে। প্রথমে দিল্লি থেকে কলকাতায় এবং কলকাতা থেকে জাহাজে করে তাঁকে ইয়াঙ্গুনে পাঠানো হয়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জিনাত মহল, দুই পুত্র জওয়ান বখত ও আব্বাস বখত, পুত্রবধূ রওনক জাহান ও এক নাতনি।

বাহাদুর শাহের জীবনে যে দুর্দশা নেমে আসে, তার কোন সীমা থাকে না। তাঁর মতো একজন দেশপ্রেমিক মোগল সম্রাটকে জন্মের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নির্বাসিত অবস্থায় অর্ধাহারে-অনাহারে মরতে হয়। ছয় ছেলের মাথা কেটে প্লেটে করে তাঁর সামনে এনে বলা হয়েছে, এরপরও কি দিল্লির মসনদ চাও? তারপরও নত হননি সম্রাট। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের জন্য তাঁর হৃদয় ব্যাকুল ছিল।

রেঙ্গুনের বিখ্যাত শোয়ে ডন প্যাগোডার পূর্বপাশে ৬ জিওয়াকা সড়কের একটি বাড়িতে বাহাদুর শাহ ও তাঁর স্বজনদের রাখা হয়। তখন এটি ছিল সেনাছাউনি। তাঁদের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র চারটি কক্ষ। সেখানে বাহাদুর শাহকে লেখার কলম ও কাগজ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

বিভীষিকাময় সেই অধ্যায়ের পর মাত্র চার বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। বাহাদুর শাহের ইতিহাসের অনেকটা লুকিয়ে ফেলেছে ইংরেজরা। সুফিসাধক, ফার্সি কবি ও গজল রচয়িতা বাহাদুর শাহের রাজনৈতিক কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না, কিন্তু স্বজাতির স্বাধীনতাকেও তিনি ভুলুণ্ঠিত হতে দিতে চাননি। জীবনের শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করে গেছেন।

সম্রাট মারা যান ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর। কিন্তু নতুন বিদ্রোহের আশঙ্কায় সে খবরটি তখনই প্রকাশ করেনি ইংরেজ সরকার। নেলসন ডেভিস ব্রিটিশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানান এক সপ্তাহ পর। দিল্লিতে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয় ১৫ দিন পর। জীবনের শেষ বেলায় তাঁর তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ডারিস লিখেছেন, ‘আবু জাফর শুক্রবার ভোর পাঁচটায় মারা গেছেন। ওই দিন বিকেল পাঁচটায় তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয় ইসলামি রীতি অনুযায়ী। একজন মাওলানা তাঁর জানাজা পড়ান।’

জাফর লিখেছিলেন, ‘জাফর যেই মাটিকে এত ভালবাসল, সেই ভারতের মাটিতে তাঁর দাফনের জন্য দুইগজ জায়গা হলো না।’

সম্রাট জাফরের এই বেদনাগাথা ভারত-স্বাধীনতাকামী মানুষের চোখে আজও পানি এনে দেয়। সম্রাটের রেঙ্গুনের সমাধিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে ভারত-স্বাধীনতার আরও কয়েকটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। আজও বহু স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন সর্বশেষ এই মোগল সম্রাট, বাহাদুর শাহ জাফর।

আগের সংবাদইসলামের প্রতি রাশানদের ঝোঁক বলছে ২০৫০ সালে মুসলিম-প্রধান দেশ হবে রাশিয়া
পরবর্তি সংবাদজামালউদ্দিন আফগানি ও তাঁর প্যান ইসলামিজম চিন্তা