
ইলিয়াস মশহুদ
খবরটি শোনার জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কেন, হুজুরকে যাঁরা সামান্যতমও জানেন, তাঁরাও না। কিন্তু আজ (১১ মার্চ সোমবার) বাদ আসর আমাদের শুনতে হলো অপ্রিয় ও মর্মান্তিক এ খবরটি–দরগাহে হজরত শাহজালাল রাহ. মাদরাসার মুফতি ও মুহতামিম, সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দীন, আমাদের অভিভাবক, সেরেতাজ হজরত মাওলানা মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ. ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আজ বিকেল ৫টার দিকে হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া দাওয়াতুল হক বাংলাদেশের সিলেট জেলার আমীর ছিলেন। তিনি দাওয়াতুল হকের আমির ঢাকা যাত্রাবাড়ির শায়খ আল্লামা মাহমুদুল হাসানের অন্যতম খলিফা।
মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়ার জন্ম সুনামগঞ্জ জেলায়। পড়ালেখা করেন দরগাহ মাদরাসায়। দরগাহ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ইমামসাবখ্যাত শহর কুতুব আল্লামা হাফিজ আকবর আলী রাহ.-এর একান্ত শিষ্য ছিলেন। সিলেট শাহজালাল দরগাহ মসজিদ ও আম্বরখানা জামে মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খলিফায়ে মাদানি আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী রহ. এর জামাতা। মৃত্যুকালে তিনি ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে গেছেন।
মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়ার নামাজে জানাজা আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় সিলেট আলিয়া মাদরাসার মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
মাওতুল আলিমে মাওতুল আলম। ওহে পৃথিবী! তুমি কি জানো না, তুমি মৃত? তোমার মৃত্যু হয়ে গেছে! ওহে প্রাণহীন নশ্বর ভূমি? তোমাতে এই আমি থেকে আর কী লাভ? তুমি না মৃত!
ঝরে পড়ল একটি নক্ষত্র। ইলমে হাদিসের উজ্বল এক তারকা। একজন অভিভাবক। হারিয়ে ফেলেছি লেখার ভাষা। আমি আজ অভিভাবকহারা। আমি হতবাক। আমি নির্বাক।
মানুষ মরণশীল। সবাইকে মরতেই হবে একদিন। এ আল্লাহর চিরবিধান। মরা লাগবেই। জোর করে কেউ এ ধরায় চিরকাল থাকতে পারবে না। আজরাঈল আ.-এর থাবা থেকে কেউ রেহাই পাবে না। নির্ধারিত সময়ে তাঁর কাছে ধরা দিতেই হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই। পালানোরও পথ নেই। কারণ, মৃত্যু অবধারিত এক বিষয়। তবে কেউ মরবে আগে, কেউ পরে। বিধাতার খাতার ক্রমাণুসারে।
জগতে যাদেরই আগমন হবে, প্রস্থান এক সময় তার ঘটবেই। প্রতিদিন কতোশতো মানুষ এই পৃথিবীতে শুভাগমন করছে আবার প্রস্থান করছে, তার হিসাব কে রাখে? এই ‘আসা যাওয়া’র মিছিলে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হয় না। তবে কিছু মানুষ এমন আছেন, যাঁদের আগমনে পৃথিবী আনন্দিত হয় আর প্রস্থানে ব্যথিত হয়। তাঁদের বিদায়ে আর সবার সাথে পৃথিবীও কাঁদে। কারণ, মাওতুল আলিমি মাওতুল আলমে। একজন আলেমের মৃত্যু মানে পৃথিবীর মৃত্যু! ঠিক তেমনই একজন বিদ্বান আলেম, বিদগ্ধ ফকিহ ছিলেন মুফতি সাহেব হুজুর খ্যাত আল্লামা আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.।
যে সকল পীর-বুজুর্গের আবির্ভাবে ধন্য হয়েছে বাংলার ভূমি, যাঁরা নিজেদের সর্বস্ব মানবকল্যাণে উৎসর্গ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন, ইলমের সাগর নিয়ে যাঁরা বেঁচে ছিলেন, ফিকহ ও তর্কশাস্ত্রে যাঁরা দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন, জগতে যাঁরা অমর আসন দখল করে নিয়েছেন, মুফতি সাহেব হুজুর খ্যাত আল্লামা আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ. নিঃসন্দেহে তাঁদেরই একজন।
তাঁদের মতো মহামানবদের মৃত্যুতে জগতবাসীর হৃদয়ে রক্তকরণ ঘটে। কারণ, তাঁরা ভালোবাসার রাজপথ দিয়ে মানুষের আত্মার আত্মীয় হয়ে মনের গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। মোমবাতির ন্যায় নিজেকে বিলিয়ে অপরকে আলো বিকিরণ করেছেন। তেমনই একজন আলোকিত মানুষ হলেন আমাদের প্রিয় মুফতি সাহেব হুজুর রাহ.।
দুনিয়ার এই জীবন ক্ষণিকের। পরকালের জীবন অনন্ত, অসীম। যার শুরু আছে শেষ নেই। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে রয়েছে সূচনা ও সমাপ্তি। অতএব, ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে আগমনকারী প্রতিটি আত্মাকেই মৃত্যুর তিক্তস্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এটাই অনিবার্য এক বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার শিকার মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.।
ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ার বুকে কত হাজার কোটি মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, ক্ষণজন্মা কত মনীষীর পদধূলিতে ধন্য হয়েছে এই পৃথিবী, কিন্তু কেউ চিরদিন বেঁচে থাকেননি। স্রষ্টার চিরায়ত নিয়মের মধ্য দিয়েই একদিন তাঁকে চলে যেতে হয়েছে পরপারে। ভক্ত-মুরিদ, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, যশ-খ্যাতি, ধন-সম্পদ সব কিছুই বিসর্জন দিতে হয়েছে। লাব্বায়িক বলতে হয়েছে মহান মাওলার অমোঘ আহ্বানে। পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল প্রত্যেক প্রাণীকেই একদিন না একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। সে যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন। এজন্য বুজুর্গরা কখনো মৃত্যুকে ভয় করতেন না। মহান মাওলার সান্নিধ্য লাভের আশায় তাঁরা সদা-সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। তেমনই আল্লাহপাগল এক বুজুর্গ হলেন আল্লামা আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.।
কেয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একটি জামাত হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তিরস্কারকারীদের তিরস্কার তাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। কথাগুলো বলে গেছেন স্বয়ং বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে, হচ্ছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত হতেই থাকবে। হক ও হক্কানিয়্যাতের একটি কাফেলা দরদভরা রাহনুমায়ির মাধ্যমে উম্মতকে সত্যের পথে ডেকেই যান। উম্মতের কল্যাণ চিন্তায় অহর্নিশি তাঁরা জার জার হয়ে কেঁদেই যান। পার্থিব লোভ-লালসা, ভয়ভীতি কিংবা কারও চোখরাঙানি ক্ষণিকের জন্যও তাঁদেরকে বিচ্যুত করতে পারে না। যাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই হকের আওয়াজ আজও স্বগৌরবে ঠিকে আছে এবং ইসলামের সুশীতল শামিয়ানার নিচে এখনও আমাদের স্থান রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সেই কাফেলার অসংখ্য মনীষীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। ক্ষণজন্মা এমন সব মহামনীষীর অন্যতম একজন হলেন মুফতি সাহেব হুজুরখ্যাত আল্লামা আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.।
প্রতিটি মানুষের জীবনে মৃত্যু অনিবার্য। একদিন না একদিন সবাইকেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারের অনন্ত উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে হয়। চলমান এ নশ্বর ধরা কারো বিদায়ে থেমে থাকে না, এগিয়ে চলে তার আপন গতিতে সামনের পথপানে। তো পৃথিবীর গতিধারা যেমন থেমে থাকছে না, তেমনি যাঁরা চলে যাচ্ছেন তাঁদের স্মৃতি ধারণ করে কেউ আজীবন বসেও থাকছে না। কিন্তু তারপরও এই অগণিত-অসংখ্য মানুষের ভেতরে এমনও কিছু মানুষ থাকেন যাঁদেরকে মানুষ ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না। তাঁরা মানবস্মৃতিতে হয়ে থাকেন চিরঞ্জীব, থাকেন চিরঅম্লান। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এ সমস্ত মানুষকেই বলা হয় মরেও অমর’। জাতি তাঁদের গুণের কদর করে, মর্যাদা দেয়। তাঁদের আদর্শ মেনে চলে এগিয়ে যায় সম্মুখপানে। ক্ষণজন্মা এই সব মহামানব তাঁরাই হয়ে থাকেন, যাঁরা আল্লাহপাকের অপার করুণায় লালিত হয়ে জ্ঞানে-গুণে, সততায়-দক্ষতায়, দয়ায়-মায়ায়, চরিত্রে ও সামাজিক আচার-আচরণে, এককথায় জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় একনিষ্ঠতায় নিজেদের জীবনকে গড়ে তুলতে পারেন। এমনই একজন ওলিয়ে কামিল হলেন হজরত মুফতি সাহেব হুজুর রাহ.।
ইতিহাসের পাতায় যে সকল খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব, ক্ষণজন্মা মহামনীষীদের জীবনেতিহাস লিপিবদ্ধ আছে; যাঁদের আলোচনা-পর্যালোচনা মানুষের মুখে মুখে যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হয়ে আসছে, যাঁদের সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনা, ভাব-ভাবনায় পরবর্তী প্রজন্ম অমূল্য কিছু পেয়ে থাকে, যাঁদের কথায় কাজে সুন্নাতি আমেজের সুঘ্রাণ ঝরে, ‘ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’ হিসেবে যাঁদের মানুষ শ্রদ্ধা করে, তেমনই একজন খাঁটি আবেদ হলেন মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.।
তিনি চলে গেলেন। না ফেরার দেশে। হাসতে হাসতে। তিনি হাসললেন আর কাঁদল জগৎবাসী। অঝোর ধারায় কেঁদে উঠল আকাশ-ভুমি। সেদিন আকাশ এভাবে কেঁদে উঠবে, এর পূর্বাভাস ছিল না। কিন্তু কাঁদল, কাঁদল একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপরে ছাদ হয়ে থাকা পুরো আকাশ। কাঁদল অজস্র মানুষ। কারণ, তিনি ছিলেন একাধারে একজন খ্যাতিমান হাক্কানি আলেম, ছিলেন শায়খুল হাদিস। ছিলেন একজন আপাদমস্তক আবেদ। ছিলেন মুত্তাকি। মুহাক্কিক। কিতাবের কালো হরফের লাখো পাতা যাঁর সিনায় স্বচ্ছ আয়নার মতো পরিস্কার, জটিল ও কঠিন বলতে কোনো কিছু ছিল না যাঁর অভিধায়- তিনি হলেন শহর কুতুব ‘দরগার ইমামসাব’ খ্যাত আল্লামা আকবর আলী রাহ.-এরর সুযোগ্য শাগরেদ আল্লামা আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.।
এত বড় বুজুর্গ হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সর্বদা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। আকাশসমান ফিকহি মাসআলা, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন জুড়িহীন, সমুদ্রসমান ইলমের গভীরতা নিয়েও তিনি ছিলেন একেবারে প্রচারবিমুখ। গবেষণা-লেখালেখিতেও ছিলেন সমান পারঙ্গম। এতকিছুর পরও তিনি ছিলেন স্বাভাবিক, সদাচরণে অভ্যস্থ। মিশুক এবং প্রেরণাদাতা। সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্থ।
তিনি যেমন ছিলেন হকের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে অগ্রগামী ঠিক তেমনি বাতিল ফেরকার মোকাবেলায় ছিলেন অগ্রসৈনিক। অনাড়ম্বর জীবনধারণকারী আমাদের প্রিয় এই বুজুর্গ, সমাজ, দেশ ও দশের কাণ্ডারী, হাজারো আলেমের উস্তায আজ চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
এই তো ক’দিন আগে দাওয়াতের কাজ শেষে মাদরাসায় ফেরার পথে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। কয়েকদিন শয্যাশয়ী থাকার পর আল্লাহপাকের অশেষ কৃপায় সে যাত্রায় তিনি আবারও আমাদের মাঝে, ইলমে নববির নুরানি কাননে আবারও ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু…। এবার তিনি সত্যিই চলে গেলেন।
তিনি এখন আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। বেঁচে আছে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনেতিহাস। আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর কর্মময় আল্লাহওয়ালা জীবনের সোনালি অধ্যায়। আজ এর সব কিছুই শুধু স্মৃতি। স্মৃতি আর স্মৃতি। তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের ছাপ, মহব্বতের অনুপম লক্ষণ। আজীবন খেদমত করে গেছেন দীনের তরে। হাজারো তালেবকে ঝপিয়েছেন ওয়াবিহি কালা হাদ্দাসানা…। তাঁর এসব মহান কীর্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়–তিনি মরেও অমর। তিনি দুনিয়াতে বেঁচে নেই, কিন্তু বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয়ে।
রাব্বে কারিম যেন তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক : আলেম সাংবাদিক, সিলেট
