আল্লামা তকি উসমানি কেন এত আলোচিত?

রাগিব রব্বানি

মুসলিম বিশ্বের অন্যতম স্কলার ও পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব আল্লামা তকি উসমানি। বিস্ময়কর মেধা, চিন্তা এবং কাজের কারণে তামাম মুসলিম জাহানে দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে সমান মর্যাদায় তিনি বরিত। সম্প্রতি নিজ দেশ পাকিস্তানে তাঁকে হত্যার জন্য দুর্বৃত্তরা নৃশংস আক্রমণ চালায়। এতে তিনি বেঁচে গেলেও শাহাদত বরণ করেছেন তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি দুজন নিরাপত্তা-রক্ষী। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন তাঁর গাড়িচালক।

তাঁর ওপর এমন আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছেন মুসলিম বিশ্বের অনেক ওলামায়ে কেরাম। বিশেষত বাংলাদেশের হকপন্থী ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে সোচ্চার আওয়াজ তুলেছেন। বাংলাদেশের শীর্ষ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আল্লামা শাহ আহমদ শফী থেকে নিয়ে বড় বড় সব আলেমই পৃথক ও যৌথভাবে বিবৃতি দিয়েছেন এ বিষয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ অ্যাক্টিভিস্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ কেউ প্রতিবাদ মিছিলও করেছেন।

আল্লামা তকি উসমানির এই যে গ্রহণযোগ্যতা এবং তাঁর প্রতি মানুষের এই যে ভালোবাসা, এটা ঠিক কী কারণে? ইলমি অঙ্গনে কেন তাঁর এত সমাদৃতি? বিশেষ আলাপচারিতায় ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের কাছে এসবের সংক্ষেপ ব্যাখ্যা করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় দুজন ইসলামিক স্কলার।

রাজধানীর শায়খ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও শীর্ষস্থানীয় মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘আল্লামা তকি উসমানি দা. বা.-এর এই সমাদৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা তাঁর পিতা পাকিস্তানের মরহুম মুফতিয়ে আজম আল্লামা শফি রহ.-এর দোআ ও চেষ্টার ফসল। দ্বিতীয়ত ব্যক্তি তকি উসমানির অক্লান্ত মেহনত, অধ্যবসা, ইখলাস, বিশেষত তাঁর তাওয়াজু তথা বিনয় তাঁকে এমন মহান ও সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।’

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেম ও ধর্মীয় আলোচক ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইন তার সঙ্গে যোগ করে বলেন, ‘আল্লামা তকি উসমানির বিনয় ও ইখলাসের পাশাপাশি প্রতিটা বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ মতামত প্রদান এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন তাঁকে এই অনন্যতা দান করেছে।’

ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইন মনে করেন, কেবল ভারত উপমহাদেশে নয়, পুরো বিশ্বে আল্লামা তকি উসমানির গ্রহণযোগ্যতা ও অনন্যতা স্বীকৃত।

তাঁর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘আল্লামা তকি উসমানিকে আমরা তথা উপমহাদেশের উলামায়ে কেরাম যতটা সমাদর ও সম্মান করি আরব বিশ্বের ওলামায়ে কেরামের কাছে তিনি তারচেয়েও অধিক সমাদৃত ও সম্মানীয়। ফেকাহ, তাফসির, ইসলামের ইতিহাস—যেকোনো বিষয়ে আরব্য আলেমরা তাঁর মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।’

ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইন এর সঙ্গে যোগ করে বলেন, ‘কেবল মুসলিম বিশ্বে নয়, পশ্চিমা দুনিয়ায়ও তাঁর সমাদর অতুলনীয়। পশ্চিমা বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে ইসলামি অর্থনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সারগর্ভ লেকচার প্রদানের জন্য নিয়মিত আমন্ত্রিত হন। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ—জ্ঞানপিপাসু শ্রেণি তাঁর এসব লেকচারে উপকৃত হবার পাশাপাশি মুগ্ধও হন।’

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘সাধারণত আমরা দেখি, পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ যেকোনো একটি বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং এই বিষয় নিয়েই তিনি কাজ করেন। কিন্তু আল্লামা তকি উসমানি ইসলামের এমন কোনো বিষয় নেই, যেখানে কাজ করেননি। এবং প্রতিটা কাজেই তিনি অনন্য গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন, ইতিহাসপিপাসুরা তাঁর প্রতি অকাতরে ঝুঁকেছে, এবং অনন্য এক অবলম্বন পেয়েছে; তাফসির নিয়ে লিখেছেন, তাফসির বিষয়ে আগ্রহীরা তাঁদের খোরাক জোগাড় করে নিচ্ছে সেখান থেকে; হাদিস বিষয়ে লিখেছেন, হাদিসের ছাত্ররা মূল্যবান খাজানা লাভ করেছে এ লিখনী থেকে; ইসলামি রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন, অনন্যতা পেয়েছেন; ফেকাহ ও ইসলামি অর্থনীতির ক্ষেত্রে তো বর্তমান ইসলামি দুনিয়া বলতে গেলে তাঁর ওপরই নির্ভর করে। ইসলামি ব্যাংকিং-ব্যবস্থার যে রূপ দাঁড় করিয়েছেন তিনি, আধুনিক কালে আর কেউ পারেননি এমনটা। নবউদ্ভাবিত বিভিন্ন সমস্যা ও জিজ্ঞাসার ফিকহি সমাধানের জন্য পুরো মুসলিম দুনিয়া তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে–তিনি কী বলেন! তারপর তিনি যখন এ বিষয়ে সমাধান উপস্থিত করেন, সমাধানের যুক্তি ও প্রামাণ্যতা এতই অকাট্য হয় যে, এর বাইরে বস্তুত আর কিছু বলার থাকে না।’

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘কেবল ইলমি বিষয়ে যে তিনি কাজ করছেন, এমন নয়, তাসাউফ তথা আধ্যাত্মিকতায়ও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। আল্লামা আশরাফ আলি থানভি রহমতুল্লাহি আলায়হির ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি আধ্যাত্মিকতার মেহনত করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁকে যদি যুগের থানভি বলি, তবে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। মোটকথা আল্লামা তকি উসমানিকে আল্লাহ তাআলা যে মেধা ও পাণ্ডিত্য দান করেছেন, এবং দীনের সকল ধারায় তিনি যেভাবে কাজ করেছেন ও করছেন, ইসলামের ইতিহাস ঘাটলে এমন পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তিত্ব খুব কমই পাওয়া যায়। আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের জমানায় এমন একজন ব্যক্তিত্ব আমরা পেয়েছি।’

সম্প্রতি তাঁর ওপর যে হামলা হলো, এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ দুই আলেম এমন হামলার তীব্র নিন্দা জানান।

কে বা কারা এ হামলা চালাতে পারে জানতে চাইলে মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, এটা তো ধারণা করে বলা মুশকিল। তবে পাকিস্তানের বর্তমান সরকার তাঁর প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে। আশা করি শিগগির হামলাকারীদের বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে তারা। পাশাপাশি হজরতের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট প্রটোকলের ব্যবস্থা করবে বলেও আমি আশাবাদী। আল্লাহ হজরতকে তাঁর নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে রাখুন।’

তবে ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইনের ধারণা, বিশ্বব্যাপাী যে ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়িয়েছে বর্তমানে, আল্লামা তকি উসমানির ওপর হামলা তারই একটা অংশ। তিনি বলেন, ‘আল্লামা তকি উসমানির ওপর হামলা এমন এক সময় সংঘটিত হয়েছে, যখন নিউজিল্যান্ডের মসজিদে নৃশংস হত্যাযজ্ঞসহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম-বিদ্বেষীদের হাতে মুসলমানরা নানা অতর্কিত হামলার শিকার হচ্ছে। আমার মনে হয় এই চক্রটি কেবল পশ্চিমা বিশ্বে নয়, তামাম দুনিয়ায় সক্রিয় হয়ে উঠছে। এবং আল্লামা তকি উসমানির ওপর হামলা ও পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানদের ওপর হামলা একই সূত্রে গাঁথা। এদের ব্যাপারে কেবল পাকিস্তানই নয়, বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্বের জরুরি ভিত্তিতে ভাবা উচিত।’

আগের সংবাদখলিফা হারুনুর রশিদ ও তাঁর বাইতুল হিকমাহ : মুসলিম সভ্যতার প্রধান মানবিক জ্ঞানকেন্দ্র
পরবর্তি সংবাদ‘কূটনীতিকদের ভুলেই পঁচিশে মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসেনি’