মুস্তফা সিবাঈ, তাঁর জীবন ও প্রাচ্যতত্ত্ব

হুজাইফা আওয়াদ

মুস্তফা সিবাঈ। একজন ইসলামি চিন্তাবিদ, সিরিয়ান রাজনীতিক এবং সিরিয়ান মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা। যিনি ‘ফরাসি দখল’ প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ফিলিস্তিন যুদ্ধ-কালে সিরিয়ান ব্যাটেলিয়ন- এর নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন বহু কালজয়ী গ্রন্থ-প্রণেতা, আর সিরিয়ার সংসদীয় জীবনে তাঁর ছিল সরব উপস্থিতি।

জন্ম
মুস্তফা হাসনি সিবাঈ ১৯১৫ সালে সিরিয়ার হিমস শহরে শত বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এক আলেম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ কয়েক যুগ ধরে হিমসের গ্র‍্যান্ড মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। ফরাসি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে তাঁর পিতার কঠোর অবস্থান তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে রেখাপাত করে। বলা যায় শৈশব থেকেই পিতা শায়খ হাসনি সিবাঈর প্রভাব মুস্তফা সিবাঈ’র মধ্যে প্রভাব ফেলে।

অধ্যয়ন
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে মুস্তফা সিবাঈ ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের জামে আজহারে পাড়ি জমান। সেখানে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে-মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও ইরাকে ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলনে রশিদ আলি কিলানির বিপ্লবেও স্ব-শরীরে উপস্থিত থাকেন। ফলে ইংরেজদের ইশারায় মিশরীয় শাসকগোষ্ঠী সহকর্মী ছাত্রদের সাথে তাঁকেও গ্রেপ্তার করে তিন মাস কারারুদ্ধ রাখে। তারপর ফিলিস্তিনের ‘সারফান্দে’ স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আরো চার মাস বন্দী থাকার পর মুক্তি পান।

কাজ ও দায়িত্ব
মুস্তফা সিবাঈ ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার গণপরিষদে দামেস্ক থেকে ডেপুটি নির্বাচিত হন। কিছুদিন পর কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তারপর সংবিধান কমিটির মাঝে কাউন্সিলের নয়টি সদস্যের অন্যতম সদস্য পদ অলংকৃত করেন। ১৯৫০ খৃষ্টাব্দে তিনি সিরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

১৯৪৭ সালে ‘আল-মানার’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৪৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের দ্বারা বিঘ্নিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। ১৯৫৫ সালে সহকর্মীদের নিয়ে সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘আশ শিহাব’ বের করেন, যা ১৯৫৮ সালে মিশরের সঙ্গে ‘ঐক্য ইস্যু’ পর্যন্ত চালু থাকে।

১৯৫৫ সালেই মিশরের ‘মুসলিম’ নামের মাসিক পত্রিকা বের করার লাইসেন্স পান, এবং 1১৯৫৮ সনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এর মালিক সাঈদ রমাযানের কাছে স্থানান্তর হওয়া পর্যন্ত দামেশকেও এর প্রকাশ জারি থাকে।তখন এই পত্রিকার পরিবর্তে শায়খ সিবাঈ মাসিক ‘হাজারাতুল ইসলাম’ (ইসলামি সভ্যতা) প্রকাশ শুরু করেন। এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এটা সচল থাকে।

মিশরে অধ্যয়নকালে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্নার সাথে পরিচয় হয়, এবং সিরিয়া প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তাঁদের মাঝে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে সে-সময় সিরিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের ইসলামি কমিউনিটির দাঈ, পণ্ডিত ও বিদগ্ধজনেরা একত্র হন এবং ঐক্যের ডাক দিয়ে সম্মিলিত প্লাটফর্মে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর মাধ্যমেই সিরিয়ায় প্রথম মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সভায় মিশরের পণ্ডিত সাঈদ রমজান উপস্থিত ছিলেন। এটা ছিল ১৯৪২ সালের ঘটনা, এর তিন বছর পর ১৯৪৬৫ সালে মোস্তফা সিবাঈ সিরিয়ান ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর প্রথম তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচিত হন।

১৯৫২ সালে সিবাঈ সিরিয়ান সরকারের কাছে ‘সুয়েজ’ যুদ্ধে মিশরীয়দের সাথে মুসলিম ব্রাদহুড’-এর অংশগ্রহণের অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু ‘আদিব শিশকালি’র সরকার এ ইস্যুতে তাঁকে ও ব্রাদারহুড কর্মীদদেরকে গ্রেপ্তারের জন্য উঠে পড়ে লাগে। এবং সিবাঈকে ‘সিরিয়া’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করা ও দেশান্তর করে লেবাননে বিতাড়িত করবারও জোরদার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এদিকে জামাল আবদুন নাসেরের সঙ্গে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের মুখোমুখি হওয়াতে হাসান হুদাইবি গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে আরব দেশগুলোতে ব্রাদারহুড খুব মজবুতভাবে তার স্কুল অব থট দাঁড় করাতে সক্ষম হয়। এই স্বর্ণকালের নেতৃত্বেও থাকেন মুস্তফা আস সিবাঈ।

পাঠক, এতক্ষণ তো মুস্তফা আস-সিবাঈর বিপ্লবী একটা চরিত্রকে চিত্রায়ন করা হলো মাত্র, এ ছাড়াও তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ রয়ে গেছে জ্ঞান-প্রজ্ঞার গভীরতম পরিধি নিয়ে। আমরা সংক্ষেপে এ ব্যাপারটাও আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

সিবাঈ ও ওরিয়েন্টালিজম
শেখ মুস্তাফা সিবাঈ ওরিয়েন্টালিজম আগ্রাসনের মুকাবেলায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, এর নজির বিরল। তাঁর জীবনের প্রায় ১০ বছরেরও অধিক সময় এর পেছনে ব্যয় করেছেন, কিন্তু কেন যেন এ বিষয়ে অব্যাহত সমাদৃতি কুড়াতে সক্ষম হননি তিনি। ফলে এডওয়ার্ড সাঈদ যখন ‘ওরিয়েন্টালিজম’ লিখেন,তখন অনেকে ভাবে,ওরিয়েন্টালিজমের প্রবল থাবাকে নগ্নরূপে প্রকাশের এটাই প্রথম কর্ম। এডওয়ার্ড সাঈদের গুরুত্ব নিয়ে বলার নতুন কিছু নাই, কিন্তু আমাদের কথা হলো, শেখ সিবাঈ’র ওরিয়েন্টালের সাথে বোঝাপড়া ও কাজের ধ্রুপদী ধরন সত্ত্বেও প্রাপ্র‍্য গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশংসা হাসিল করতে পারেননি। এটা হয়তো এই জাতির জন্য দুর্ভাগ্যই।

জামেয়া আজহারে থাকাকালীন তাঁর ডক্টরেট থিসিস ছিলো ওরিয়েন্টালিজম ও তার সরূপ বিষয়ে, যা পরবর্তীতে ‘আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরিইল ইসলামি’ নামে প্রকাশিত হয়। এ কিতাবে তিনি ইহুদি প্রাচ্যবিদ গোল্ড জিহারের কড়া সমালোচনা করেন, এবং ইলম ভাষায় অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে গোল্ড এবং তাঁর শিষ্যদের কুযুক্তিগুলোকে খণ্ডণ করেন। পাশাপাশি ইসলামিঃ ইতিহাসে জুহরির (মৃত্যু-১২৪) মতো পণ্ডিত ব্যাক্তিদের ব্যাপারেও তাদের অপব্যাখ্যার স্বরূপ ব্যাখ্যা করেন।

১৯৫৬ সালে দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুন্দর পদক্ষেপ নেয়। তারা ড. সিবাঈকে পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামিক স্টাডিজের রূপরেখা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণেরর জন্য পশ্চিম-ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়। তিনি তুরস্ক, ইতালি, ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং ফ্রান্স ভ্রমণ করেন। ইসলামিক স্টাডিজ এবং প্রাচ্যবিদ অধ্যাপকদের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। তিনি প্রাচ্যবিদদের লিখিত গ্রন্থাদি বিশ্লেষণ ও ধারাক্রমে এর ভুলগুলো তাঁদের সামনে তুলে ধরেন। এই ভ্রমণের গুরুত্ববহ দিক হলো সেখান থেকে ফিরে অতি মূল্যবান একটি পুস্তিকা রচনা, যা ‘আল ইসতিশরাক ওয়াল মুসতাশরিকুন’ নামে প্রকাশিত হয়।

ইসতিশরাকের মুকাবেলায় ড. সিবাঈর পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। ড. আকরাম উমারির ভাষায় ‘আমাদের সামনে আমাদের ইতিহাসের চিত্রায়ন।’ ড. সিবাঈ’র কিছু কর্ম এমনই ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ছিল।

তিনি এক পর্যায়ে ‘মিন রাওয়াইয়ি হাজারাতিনা’ (আমাদের সভ্যতা) নামক কিতাব রচনা করেন। এখানে তিনি রীতিমতো ইসলামি সভ্যতার বুনিয়াদ, এর উচ্চতা ও অনন্যতার কথা মজবুত পাটাতনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করে গেছেন। ড. সিবাঈ’র সমসাময়িক মদিনা মুনাওয়ারার মশহুর আলেম ড. শায়খ হামিদাহ বলেছেন, ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা ও তার আপাতঃ বস্তুবাদী সাফল্য দেখে যুগপৎ প্রভাবিত এবং প্রতারিত তরুণদেরকে এই বই বিশেষভাবে পড়া উচিৎ।’ এ মূল্যায়নের পাশাপাশি তিনি বইটিকে আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদ করার কথাও বলেন।

প্রাচ্যবাদের মুকাবেলায় ড. সিবাঈ’র সফলতম ও ধ্রুপদী গ্রন্থ হলো ‘আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন’। এখানে তিনি ইসলামে প্রদত্ত নারীর অধিকার ও অবস্থান নিয়ে বিশদ আলাপ করেছেন। সাথে পশ্চিমা সভ্যতার তথাকথিত নারীবাদের প্রবঞ্চনা ও অতি সাধুবাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

ইতিহাসের এই সফলতম বিদ্যানের উপর আল্লাহ রহম করুন। তাঁকে ব্যাপকরূপে পাঠ ও তাঁর চিন্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একদল তরুণকে নিয়োজিত করা আমাদের দায়িত্ব ও সময়ের দাবি।

লেখক : তাকমিল ফিল হাদিস, দারুল উলুম দেওবন্দ

আগের সংবাদআবরারের ঘাতক বাসে চালক ছিলেন কন্ডাকটর
পরবর্তি সংবাদ৩ মাস ধরে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি : ফখরুল