
রাগিব রব্বানি
দেশে দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বেড়েছে ভয়াবহ মাত্রায়। স্বাভাবিক মৃত্যুর বদলে অপমৃত্যুই যেন হয়ে উঠেছে এদেশের মানুষের শেষ নিয়তি। একদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ঝরছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীর প্রাণ, অপরদিকে কদিন পরপরই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। বিশেষত রাজধানী শহর ঢাকা যেন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
দেড় মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে রাজধানীতে ঘটে গেল ভয়াবহতম দুটো অগ্নি-দুর্ঘটনা। পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িপট্টি আর অভিজাত এলাকা বনানীর এফ আর টাওয়ারের এ দুই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। এসব দুর্ঘটনার জন্য কেউ কেউ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই দায়ী করছেন, কেউ দায়ী করছেন দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে, আর কেউ কেউ উল্লেখ করছেন প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা। তবে সবার চাওয়া একটাই—এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে।
কিন্তু এজন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পাশাপাশি জনসচেতনতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে সরকারের যতটা না দায়, তারচেয়ে বেশি উদ্যোগী হতে হবে জনসাধারণকে। এমনটাই বলছিলেন, রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন জামে মসজিদের খতিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ।
প্রথিতযশা এ আলেম বলেন, ‘গতকাল বনানীর এফ আর টাওয়ারে যে অগ্নিকাণ্ড ঘটল, আমরা দেখেছি সাধারণ মানুষ এতটাই ভীড় জমিয়েছিল সেখানে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো পর্যন্ত এলাকায় ঢুকতে অনেক কষ্ট হয়েছে। নানাভাবে ব্যতয় ঘটেছে তাদের অগ্নিনির্বাপন ও উদ্ধার তৎপরতায়।
‘সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছে ঠিক, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। মোবাইল হাতে কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত আবার কেউ ভিডিও করতে। অথচ এদিকে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদল মানুষ ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে অসহায়ভাবে হাত নাড়ছে, তাদের উদ্ধারের জন্য আকুতি জানাচ্ছে। ব্যাপারটা খুবই দৃষ্টিকটূ ছিল। তাই যেকোনো দুর্যোগ মুকাবেলায় জনগণকে কীভাবে কী করতে হবে, সে ব্যাপারে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।
‘এ ক্ষেত্রে সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি মসজিদের মিম্বর, মাহফিলের মঞ্চ এবং বিভিন্ন জনসমাগমে কথা বলে ওলামায়ে কেরাম ভূমিকা রাখতে পারেন।’
ড. মুশতাকের এ পরামর্শের সঙ্গে একমত পোষণ করে বাংলাদেশের অন্যতম কুরআন শিক্ষাবোর্ড আঞ্জুমানে তালীমুল কুরআনের সভাপতি ও বিশিষ্ট আলেম লেখক মাওলানা শাহ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাঁরা জনগণের সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পারেন এবং জনগণ যাঁদের কথা সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে শোনে, তাঁরা হলেন এ দেশের ওলামায়ে কেরাম। মসজিদের মিম্বর থেকে নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে-শহরে অনুষ্ঠিত অসংখ্য মাহফিলে তাঁরা জনগণকে মোটিভেট করে কথা বলেন। অতএব দুর্যোগ-দুর্ঘটনা মুকাবেলায় জনসচেতনতা তৈরিতে সবচেয়ে কার্যকর ও মুখ্য ভূমিকা তাঁরাই পালন করতে পারেন।’
মাওলানা শাহ নজরুল ইসলাম বলেন, কদিন পরপরই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে আমাদের দেশে। আর ছোট-খাটো দুর্ঘটনা তো প্রতিদিন লেগেই আছে। একান্ত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, এসব দুর্ঘটনা থেকে পরিত্রাণের উপায় কিন্তু বাতলে দিয়েছেন আমাদের মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। মানুষের দৈনন্দিন কাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা দোআ শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন ঘর থেকে বের হওয়া, ঘরে প্রবেশ করা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসা, যানবাহনে আরোহণ করা—প্রতিটা ক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা দোআ আছে। আছে বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় পতিত হলে পড়ার দোআও। তো একজন মুসলিম হিসেবে যদি পূর্ণ বিশ্বাস ও নিষ্ঠা নিয়ে এসব দোআর ওপর কেউ আমল করে, তবে সে নিজের জানের নিরাপত্তাসহ যে-কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচতে পারবে। এবং এটা পরীক্ষিত।’
তবে মাওলানা শাহ নজরুল ইসলাম অগ্নিকাণ্ডসহ এসব দুর্ঘটনার জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নানা সেক্টরে থাকা দুর্নীতিকেও দায়ী করেছেন। সুপরিকল্পিত নগরায়নেরও তাগিদ দিয়েছেন সরকারকে। পরিকল্পনাহীন প্রক্রিয়ায় বিল্ডিং নির্মাণ, নির্মাণবিধি না-মানা, বহুতল ভবনে ইমার্জেন্সি এক্সিটসহ অগ্নিনিরাপত্তার প্রাথমিক ব্যবস্থা না রাখা—এসব কিছুর ব্যাপারে সরকার যেন তৎপর এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেও জোর দিয়েছেন তিনি।
ঢাকা শহরে প্রচুর মাদরাসা রয়েছে। যেহেতু শহরটা ঝুঁকিপূর্ণ, তাই মাদরাসা-কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ছাত্রদেরকে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রাথমিক মুকাবেলার জন্য প্রতিটি মাদরাসায় দমকল বাহিনীর বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করার পরামর্শও দিয়েছেন মাওলানা শাহ নজরুল ইসলাম।
