
কাজী মাহবুবুর রহমান
(গতকাল ছিল ৪ এপ্রিল। ৮ বছর আগে এইদিনে বাংলার সিংহপুরুষ মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. এক ঐতিহাসিক আন্দোলন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। সেই আন্দোলনের ইতিহাস ও স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন কাজী মাহবুবুর রহমান )
আজকের দুই হাজার উনিশের এপ্রিলে দাঁড়িয়ে দুই হাজার এগারোর বাংলাদেশের চেহারা কল্পনা করা দুস্কর। আমরা বিস্মরণপ্রিয় জাতি। শোক এবং আনন্দ দুইটাই আমরা দ্রুত ভুলতে পারি৷ মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলো বিশেষ মাথাচাড়া দিতে সমর্থ হয়েছিল। আওয়ামীলীগ সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল জামায়াতে ইসলামীকে শাস্তির মুখোমুখি করা৷ জামাত সংশ্লিষ্ট সেই রাজনৈতিক বিরোধকে ইসলামবিদ্বেষ পর্যন্ত টেনে এনে সরকার কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী নারীনীতি প্রনয়ন করে এবং ইসলামবিরোধী জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যকর করে৷ মুফতী আমিনী এবং ৪ ঠা এপ্রিলের হরতালের জন্য দুই হাজার এগারোর পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত থাকা জরুরি।
দুই হাজার তেরোর মুভমেন্ট অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। এর আগের বাংলাদেশের চেহারা এমন ছিল না৷ ইসলামী আন্দোলনের যুগপৎ আহবান করার মত ব্যক্তিত্বের সংকট তখন ভোগাচ্ছিল সবাইকে। বয়সের ভারে কাবু ছিলেন শাইখুল হাদিস রহ.। আল্লামা আহমদ শফীও তখন ব্যপকভাবে পরিচিত নন। একমাত্র ব্যক্তি, যার ডাকে রাজপথে মানুষের ঢল বয়ে যেতে পারে, যার হুমকিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠতে পারে, তিনি ছিলেন মুফতী ফজলুল হক আমিনী। ভালবাসার মানুষদের কাছে তিনি যেমন আস্থার প্রতীক ছিলেন। শত্রুদের কাছে এক ভয়াবহ মূর্তিমান আতংক। বাংলাদেশের ইসলামবিদ্বেষী শক্তি মুফতি আমিনীকে যতটা হাড়ে হাড়ে চেনে, অন্য কোনো আলেমকেই বোধহয় ওইভাবে চেনে না।
বাবরী মসজিদ লংমার্চ থেকেই আলোচনায় আসেন মুফতী আমিনী। ওই আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। এরপর নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে যান তিনি। এই আন্দোলনে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। নিজ জেলা ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় এনজিওদের লাগামহীন আচরণে গর্জে ওঠেন সাহসী এই যোদ্ধা। ২০০১ সালে হাই কোর্টের ফতোয়া বিরোধী রায়ের প্রতিবাদে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন তিনি। ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ঈমানী স্পৃহায় গর্জে ওঠা আমিনীর হুঙ্কার আজো চোখে ভাসে। তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে শীর্ষ আলেমদের মধ্যে আমিনীকেও তখন জেলে যেতে হয়। উত্তাল সেই দিনগুলোতে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কারো সঙ্গে আপস করেননি। ঐক্যজোটের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এলেও আপোসহীন মনোভাব থেকে যখনই জোটকে বিপথে হাটতে দেখেছেন, জোট ত্যাগের ইঙ্গিত দিতেও কুন্ঠা করেননি।
৪ এপ্রিলের দিনটি মুফতী আমিনীর জীবনের সবচে চ্যালেঞ্জের দিন বলা যায়। পরিস্থির কারণে অন্যান্য ইসলামিক দল মৌখিক সম্মতি পোষণ করলেও এত বড় আন্দোলনের ডাক দেয়াকে অপরিনামদর্শী ভেবে পিছিয়ে যাচ্ছিল৷ কিন্তু আমিনী পর্বতের অনড় থাকেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন পরিষদ আহূত এবং দেশের সাধারণ ওলামায়ে কেরাম সমর্থিত হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। দেশব্যাপী সড়ক যোগাযোগ ছিল বন্ধ। রাজধানীর ভিআইপি সড়কে পুলিশ পাহারায় সীমিতসংখ্যক যানবাহন চলাচল করলেও দূরপাল্লার যানবাহন চলেনি। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ছিল প্রায় যানবাহনশূন্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হরতাল সমর্থকদের অবরোধে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনে রেল চলাচলও বিঘ্নিত হয়।
ঐদিন ফজরের নামাজের পর থেকেই কাফনের কাপড় পরে কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন হরতাল সমর্থক ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকরা রাস্তায় নামেন। তাঁরা নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে রাজপথ মুখরিত করে তোলেন। রাস্তা অবরোধ করে জিকির ও নামাজ আদায় করেন। তাদেরকে হটাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সারাদিন রাজপথ নারায়ে তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত করে রাখেন আন্দোলনকারীরা।
অনেক প্রলোভন, সমঝোতার আহবান আসে৷ আসে ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করে হত্যার হুমকিও। কিন্তু তিনি মুফতী আমিনী, ভীত কিংবা লোভীরা আমিনী হন না৷ অথবা আমিনী ভীত কিংবা লোভী হন না৷ তাঁর সেই অনড় অবস্থান এবং তাওহীদি জনতার বাঁধভাঙ্গা প্রতিরোধের মুখে সরকার নারী উন্নয়ন নীতিমালা স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
আমিনী কেন আলাদা, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বেশিদূর যেতে হয় না। বর্তমান ইসলামিক দলগুলির অ্যাকটিভিটি খোলা চোখে দেখলেই অনেক কিছু বেরিয়ে আসে। আমিনী ক্ষমতায় থাকার দিনগুলিতেও আমাদের মতো এতটা নির্ভার ছিলেন না। আমরা এখন সরকারের আনুকুল্যে ভালো আছি। আরামে আছি। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও স্বপ্নে বিভোর আছি। তাই আমরা মাঠ থেকে ঘরে ফিরলে ইতিহাসও মুছে যায়। কিন্তু যখনই দেশের অভ্যন্তরে কোথাও ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়, দিনশেষে তাঁকেই মনে পড়ে৷ রহিমাহুল্লাহ!
