
হুজায়ফা আওয়াদ
ভারত উপমহাদেশে হাদিস-চর্চার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, তবে শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তা-ধারা এবং তাঁর আদর্শের উত্তরসূরি দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে হাদিস-চর্চার নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিশরীয় পণ্ডিত রশিদ রেজার ভাষায় শুনুন বিশ শতকের চিত্রায়ন–‘এ যুগে যদি হিন্দুস্তানি উলামায়ে কেরাম হাদিস চর্চায় মনোনিবেশ না করতেন, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এর চর্চা অস্তিত্বশূন্য হয়ে পড়ত। কারণ হিজরি দশম শতক থেকেই মিশর, শাম, ইরাক ও হিজাজে হাদিসের চর্চা ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে।’ (প্রবন্ধ : মিফতাহু কুনুজিস সুন্নাহ, আল-মানার পত্রিকা)
শায়খুল হিন্দ, কাশ্মীরি থেকে শুরু করে একেবারে নেয়ামাতুল্লাহ আজমি পর্যন্ত বহু মুহাদ্দিসের জন্ম হয়েছে এ এদারায়। আজ আমাদের আলোচনায় থাকবেন এমনই একজন ক্ষণজন্মা মনীষী, ইতিহাস যাঁকে ড. প্রফেসর মুস্তফা আজমি বলে চেনে। তবে আমরা তাঁকে গর্বের জায়গা থেকে মাওলানা আজমি বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
ভারতের উত্তর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী বিভাগীয় শহর আজমগড়। এখানে জন্মেছেন মুহাদ্দিস হাবিবুর রহমান আজমির (১৯০১-১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ) মতো বরিত ব্যাক্তিবর্গ। বর্তমান সময়ে দারুল উলুম দেওবন্দে হাদিসের যে দুই দীপাধার তাদরিসের গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন–মাওলানা নেয়ামাতুল্লাহ ও মাওলানা হাবিবুর রহমান আজমি–তাঁরাও আজমগড়ের স্বর্ণ-মাটির সন্তান।
১৯৩০ সনে আজমগড়ের মৌ জেলায় মাওলানা মুস্তফা আজমি জন্ম লাভ করেন। বাবা আব্দুর রহমান ব্রিটিশ দখলদারদের ঘোর-বিরোধী ছিলেন, ফলে অতি শৈশবেই ইংরেজ-প্রতিষ্ঠিতি স্কুল থেকে তাঁকে সরিয়ে আরবি মাদরাসায় ভর্তি করান। ১৯৪৭ সনে দারুল উলুম মৌ থেকে মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে চলে যান দারুল উলুম দেওবন্দে। ফিকহে হানাফির আইনতত্ত্বের উচ্চতর কিতাব ‘হিদায়া’ থেকে একেবারে বুখারি-মুসলিমসহ কুতুবে সিত্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর অধ্যয়ন করে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন তিনি।
এ সময় তাঁর উস্তাদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও ইংরেজ-খেদাও আন্দলনের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ, শায়খুল আদব ইজাজ আলি এবং মুফতি মাহদি হাসান শাহজাহানপুরি (রহমতুল্লাহি আলায়হিম) প্রমুখ।
১৯৫৩-১৯৫৫–এই তিন বছর তিনি মিশরের জামে আজহার থেকে অ্যারাবিক ল্যাংগুয়েজের ওপর মাস্টার্স কমপ্লিট করেন। ১৯৬৫ সনে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে Studies in Early Hadith Literature শিরোনামে দুজন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ–প্রফেসর এ যে আরবেরি ও প্রফেসর আর বি সার্জেন্ট–এর তত্ত্বাবধানে হাদিস বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
মাওলানা আজমির বর্ণাঢ্য জীবনের সব দিক আমাদের এখানে তুলে আনা সম্ভব নয়, সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়, আমরা কেবল তাঁর হাদিস-চর্চা ও বৈশ্বিক মূল্যায়নের দিকটা নিয়েই কথা বলব। মাওলানা আজমি ছিলেন ইলমে হাদিসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, যাঁর পদভারে ধন্য হয়েছে আরব-আজম। হাল-জামানার আধুনিক ভাষা তিনি আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন পূর্ণরূপে, যার ফলে আধুনিক বিশ্বের কাছে তিনি পরম সত্যের বাণী খুব বলিষ্ঠ উচ্চারণে বলতে পেরেছেন।
হাদিস ছিল মাওলানার জীবনের সবচাইতে আগ্রহের জায়গা, হাদিসের খেদমতেই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন আমরণ। তাই অত্যন্ত যুগোপযোগী ও গবেষণাধর্মী কিছু গ্রন্থ লিখে যেতে পেরেছেন তিনি।
তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘দিরাসাত ফিল হাদিসিন নাওয়াবি ওয়া তারিখু তাদওয়িনিহ’। এখানে তিনি হাদিস সংকলনের ইতিহাস, এর সুসংহত নীতিমালা ও প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে তাত্ত্বিক আলাপ করেছেন। পাশাপাশি প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত আপত্তিগুলোকে খুব চৈতন্যের সাথে সুক্ষ্ম নিক্তি দিয়ে পরিমাপ করেছেন এবং দেখিয়েছেন এর খাদগুলো। হাজারও রেফারেন্স আর ভিত্তিমূলের কিতাবাদির নির্দেশ করে পাঠককে রীতিমতো হতবাক করে তুলেছেন।
কিতাবটি মূলত তাঁর ডক্টরেটের থিসিস পেপার, পরবর্তী সময়ে সুবিন্যস্ত রূপে কলেবর বৃদ্ধি করে পাঠকের দরবারে হাজির করেছেন। আরব বিশ্ব-সহ পৃথিবীর প্রায় সব ইলমি মহলেই অত্যন্ত সমাদৃত এই কিতাব। এমনকি তাঁর কিং ফয়সাল (ইসলামি দুনিয়ার নোবেলতুল্য সম্মাননা) অ্যাওয়ার্ড লাভের পেছনে এই কিতাবের ভূমিকা ছিল অসামান্য।
হজরত মাওলানার ভাষায়-ই শুনুন এ কিতাব লেখার প্রাক কথা। ‘মহান আল্লাহ মুহাদ্দিসিনের সুবিশাল জামাত সৃষ্টি করেছেন, তাঁদেরকে অস্বাভাবিক ধী-শক্তি ও একনিষ্ঠা দিয়েছেন, কলমকে তাঁদের বশীভূত করেছেন, জমানা তাঁদের অনুগত করেছেন, তাঁদের বয়স ও কর্মে মঙ্গল দিয়েছেন, ফলে পণ্ডিত ও বিদ্যানে পূর্ণ একটি হাদিসের স্কুল তথা মাকতাবে ফিকির তৈরি হয়েছে, যার দৃষ্টান্ত বিরল।
‘তাঁরা এই শাস্ত্রের বহুমুখী কর্ম আঞ্জাম দিয়েছেন, হাতের নাগালের সকল উপরকরণ আমলে নিয়েছেন এবং প্রয়োগ করেছেন পাত্রের চাহিদামতো। এভাবেই বহু বছর পার হয়ে গেছে, প্রজন্ম অন্য ব্যস্ততায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে, শাস্ত্রীয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা কমতে শুরু করেছে, বিশেষত হাদিসের চর্চায় ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যার ফলে মুসলিম উম্মাহকে তার মাশুল গুণতে হয়েছে, উপনিবেশবাদের লক্ষ-বস্তুতে পরিণত হয়েছে উম্মাহ, মহাসংকটে পড়ে তার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে, হারানো ধন পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, দখলদারিত্ব ও উপনিবেশবাদের বেড়াজাল থেকে মুক্তি চেয়েছে। তবে হ্যাঁ, দিনশেষে কিন্তু ঔপনিবেশিকরাও একদল প্রাচ্যবিদ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যারা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধ-চিন্তাকে শাসন করবে, ইসলাম-চর্চার নাম দিয়েও যারা শুদ্ধ ইসলাম থেকে কঠিনতর বিচ্যুত হবে।
‘এই পরিকল্পনার ফল এই ছিল যে, কিছুকালের মধ্যেই হিন্দুস্তানে মিথ্যা নবি-দাবিদারের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, এবং জাকরালভি, গোলাম আহমেদ পারভেজ, তাওফিক সিদকি ও মাহমুদ আবু র-য়ার মতো কিছু চাটুকার লেখক জন্ম নেয়। যারা হাদিসকে বিদ্বেষের লক্ষবস্তু বানিয়ে ‘হাদিস রক্ষা’র নামে কিতাব লেখে–‘আজওয়া আলাস সুন্নাহ ওয়া দিফা আনিস সুন্নাহ’–এবং দাবি করে, যে বা যারা তার কথা গ্রহণ করবে না, বস্তুত তারা অনুসৃত ইলমি শৈলী থেকে বহু দূরে, এবং এটা এমন নতুন এক বিশ্লেষণ, ইসলামি সমাজ যা কখনোই চোখে দেখে নি!
‘বাস্তব কথা হলো, এই বৃক্ষের উৎসমূল ও বীজ-কেন্দ্র হলো পশ্চিমের মাটি, তাই এই মাটিতে বসেই আমি পশ্চিমের অন্তরতুল্য ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে এ বিষয়ে কলম ধরছি, ডক্টরেট আমার উদ্দ্যেশ্য নয়, বরং হাদিসে নববির হাকিকত প্রকাশই আমার একমাত্র লক্ষ্য। …’
‘দিরাসাত’ ছাড়াও মাওলানা আজমির আরও বহু কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। ইমাম মুসলিমের কিতাবুত তাময়িজ-সহ তাঁর লিখিত ‘মানহাজুন নকদ ইনদাল মুহাদ্দিসিন’ ১৯৭৫ সনে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের মূল টেক্সট হলো, হাদিসের কোনো নাকেদ’ পণ্ডিত যদি শুদ্ধাশুদ্ধির মান বিশ্লেষণ করতে চান, তাহলে তাঁকে সূত্র-পরম্পরা নিয়ে ঘাটতে হবে, কারো ব্যাপারে জরাহ তথা সমালোচনা কিংবা তা’দিল তথা নির্ভরতার সাক্ষ্য আছে কিনা দেখতে হবে, অতঃপর সূত্র-পরম্পরার অবিচ্ছিন্নতা, আর্থ-সামঞ্জস্য ও শাস্ত্রীয় খাদগুলো নিয়েও ভাবতে হবে। তারপর তিনি কোনো হাদিসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। অর্থাৎ লেখক এখানে হাদিসের শাস্ত্রীয় মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘ জার্নির প্রয়োজন, তা দেখিয়েছেন।
পাশাপাশি মুসতালাহ, আদালাত, যাবত, নকদুল হাদিস-সহ পূর্ববর্তীদের হাদিস সংকলন ও রক্ষার জন্য গৃহীত তাবৎ বিধিমতের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। এবং খুব তাত্ত্বিকভাবে ইউরোপীয় সমালোচকদের ইতিহাস বিশ্লেষণ ও মুহাদ্দিসিনের হাদিস বিশ্লেষণের বিবিধ বিষয় তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, আদতে বিশ্লেষণেরর ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের সুক্ষ্ম ও বলিষ্ঠ নিক্তির দ্বিতীয় আরেকটি উদাহরণ হাজির করতে চৌদ্দশ’ বছর পরও আজকের পশ্চিম-দুনিয়া অক্ষম।
এরপর বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ‘শাখত জোসেফের’ (১৯০২-১৯৬৯) বই ‘উসুলুশ শারিয়াতিল মুহাম্মাদিয়্যা’-এর উপরে সমৃদ্ধ তথ্যসমালোচনা ‘দিরাসাতুন নাক্দিয়্যাহ’,বের হয়। এর ইংরেজি অনুবাদ On Sahacht’s origins of Mohammadan Jurisprudence নিউইয়র্ক ও ব্রিটেন থেকে, পরে তুরকি ভাষায় অনুবাদ হয়ে তুরকি থেকেও ছেপে আসে।
১৯৭৪ সনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি অয়া সাল্লামের বিশিষ্ট লেখকদের নিয়ে বের হয় ‘কুত্তাবুন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম’।
ইমাম নাসায়ির সুনান, ইবনে খুজাইমার কিতাবুস সহিহ এবং আলি ইবনুল মাদিনির কিতাবুল ইলাল তাহকিক তালিক করে বৈরুত ও রিয়াদ থেকে প্রকাশ করেন তিনি।
১৯৮৩ সনে উরওয়া ইবনু জুবাইর রহ।-এর মাগাজিয়ে রাসুল এক খণ্ডে এবং সুনানে ইবনে মাজাহ তাহকিক-তালিকসহ চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। লাইসির রেওয়ায়াতে ইমাম মালেকের মুয়াত্তাও তাহকিক করেন তিনি।
ইয়ামামা থেকে ২৫০ হিজরি পর্যন্ত মুহাদ্দিসিনের ফিরিস্তি সম্বলিত একটি গ্রন্থও আছে তাঁর।
মাওলানা আজমি নিজেকে শুধু লিখনীতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, রীতিমতো দরস-তাদরিসের গুরুভারও আঞ্জাম দিয়েছেন মৃত্যু পর্যন্ত। সৌদি আরবের উম্মুল কুরা, কিংসৌদ ইউনিভার্সিটি-সহ আরও বহু ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আজমি।
২০১৭ সালের ২০শে ডিসেম্বর রোগাক্রান্ত হয়ে ইহকাল ত্যাগ করেন মহান এ মনীষী। সৌদি আরবের রিয়াদেই তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয় এবং মাকবারাতুন নাসিমে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর তিন মাস পরে মার্চ ২০১৮তে দারুল উলুম দেওবন্দের আরবি মুখপত্র ‘আদ-দায়ি’-তে তাঁর সুবিস্তর জীবনী তুলে ধরেন দারুল উলুমের আরবি সাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান মাওলানা নুর আলম খলীল আমিনি দাঃবাঃ। প্রবন্ধের একেবারে শেষ দিকে এসে তিনি লিখেন–‘মাওলানা আজমি ছিলেন অন্য সবার চেয়ে আলাদা। আরব বিশ্বে তাঁর মর্যাদা, অভাবনীয় খ্যাতি, ও প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন যেন তিনি হিন্দুস্তানের কথা কখনোই ভুলতে পারতেন না। বিশেষত তাঁর জন্মভূমি আজমগড়ের ‘মৌ’ এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ার প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দকে। শেষ দিন পর্যন্ত এগুলোর প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালোবাসা।’
আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন। তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষার্থী দারুল উলুম দেওবন্দ
