
হামমাদ রাগিব
এপ্রিল মাস চলছে। দু হাজার তেরোর এই সময়টায় উত্তাল ছিল পুরো দেশ। ধর্মদ্রোহী নাস্তিক-মুরতাদদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ব্যানারে জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে শানে রেসালত সম্মেলন। সম্মেলনগুলোতে ধর্মপ্রাণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল রাষ্ট্রের প্রতিটা সেক্টর, সমাজের প্রতিটা শ্রেণিপেশার মানুষ। টং-দোকানের চায়ের টেবিল থেকে টিভি-টকশো—সর্বত্রই ছিল হেফাজতের এ মহাজাগরণ নিয়ে সরগরম আলোচনা-সমালোচনা।
দু হাজার তেরোর ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিল এ মহাজাগরণের। ওই দিনই লংমার্চ-পরবর্তী মহাসমাবেশ থেকে ঘোষিত হয়েছিল হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক ১৩ দফা দাবি। পাশাপাশি জেলায় জেলায় শানে রেসালত সম্মেলনেরও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। এক মাস সময় বেঁধে সরকারকে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল— একমাসের ভেতর দাবি না মানলে ৫ মে ঢাকা অবরোধ করা হবে।
এই একমাসে হেফাজতে ইসলামের নানা কর্মসূচির মাধ্যমে যে গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ইসলামি গণবিপ্লবের দিকে মোড় নিচ্ছিল খুব দ্রুতই। পরিণতিতে ৫ মে ঢাকা অবরোধ করতে এলে রাষ্ট্রযন্ত্র নির্মম কায়দায় দমিয়ে ফেলে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ গণজাগরণকে।
নির্মমতা দিয়ে এ মহাজাগরণ দমানো গেলেও জাগরণ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তা বড় ধরনের একটা প্রভাব ফেলে। পরিবর্তন ঘটায়। এরমধ্যে সাংস্কৃতিক প্রভাবটাই সবচেয়ে লক্ষণীয় এবং দৃষ্টিআকর্ষণীয়। এমনটাই মনে করছেন সাহিত্য পত্রিকা আনতারা সম্পাদক ও তরুণ চিন্তক কবি মহিম মাহফুজ।
ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গে একান্ত আলাপে মহিম মাহফুজ বলেন, ‘যে কোনো আন্দোলনের চেতনা ও মূল্যবোধকে সমাজের গভীরে প্রোথিত করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালি সমাজ ও গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং বাঙালি সংস্কৃতিকে আড়াল করে কলোনিয়াল কালচার আত্মস্থ করার প্রতিযোগিতা করে। আর এই অসুস্থ প্রক্রিয়াকে পৃষ্ঠপোষকতা করে এক শ্রেণির বামধারার বুদ্ধিজীবী ও সেক্যুলার নামধারী কতিপয় ইসলামবিদ্বেষী সুশীল। এক্ষেত্রে তাদের অন্যতম মাধ্যম হলো মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। হেফাজতের ডাকে বাংলার মানুষ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ যে মহাজগরণ ঘটিয়েছে, তাতে তথাকথিত সেক্যুলার ও বামবুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘদিন ধরে জারি রাখা প্রোপাগাণ্ডা এক লহমায় ধ্বসে পড়েছে। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় নিয়ে তারা স্বরূপে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই আমি মনে করি, হেফাজতের এ আন্দোলন মূলত বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের আন্দোলন। বাঙালি মুসলমানদের উপর দীর্ঘ দিন যাবৎ যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছিলো এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদের মাধ্যমে তাদেরকে শেকড়ছাড়া করার যে অপচেষ্টা করা হচ্ছিল, এসবের প্রতিবাদে বাঙালি মুসলমান হেফাজতের এ মহাজাগরণের মাধ্যমে প্রবলভাবে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে।
মাওলানা মহিম মাহফুজ বলেন, ‘হেফাজত-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান এক নতুন যুগের অবতারণা করেছে। ফলে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়কে কটাক্ষ করার যে প্রকট প্রবণতা ছিলো, সেটা লক্ষণীয় মাত্রায় কমেছে। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করে যে বাম রাজনৈতিক ধারা এ দেশে রাজনীতি করতে চেয়েছিলো, তাদের দৌরাত্ম কমেছে। এবং বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বিষয়ে তাদের শুধু সচেতনতাই নয়, বরং সমীহভাব এসেছে। আমি মনে করি সার্বিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীতি ও চিন্তাগতভাবে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এর মাধ্যমে। এবং ইসলাম প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে।’
বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে কলোনিয়াল সংস্কৃতির যে অন্ধ অনুকরণ বাংলাদেশে চলছিল, হেফাজত আন্দোলনের মাধ্যমে তাতে প্রচণ্ড ধাক্কা লেগেছে মন্তব্য করে তরুণ এ চিন্তক বলেন, ‘আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের স্বকীয় সংস্কৃতির চর্চা যারা করেন, দীর্ঘ আগ্রাসনে তারা ছিলেন কোণঠাসা। হেফাজত-বিপ্লব তাদের সামনে উন্মোচিত করেছে নতুন এক সম্ভাবনা। কলোনিয়াল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার, এমন বহু প্রাগ্রসর ও চিন্তাশীল তরুণের পথপরিবর্তন ঘটেছে। হেফাজতের গণবিপ্লবের পর তারা তাদের সংস্কৃতির শিকড় খুঁজে পেয়েছে।’
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের এ আন্দোলন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিতে যেমন প্রভাব ফেলেছে, তেম্নি ধর্মীয় ঘরানাকে জাতীয় পরিমণ্ডলে তুলে ধরতেও রেখেছে ব্যাপক অবদান। এমনটাই মনে করছেন মাসিক ইসলামি পয়গামের সম্পাদক মাওলানা মনযূর আহমাদ।
ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গে একই আলাপে মাওলানা মনযূর আহমাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের শুদ্ধবাদী ধর্মীয় অঙ্গন কওমি পরিমণ্ডলকে জাতীয়ভাবে মূল্যায়িত করতে বাধ্য করেছে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। একসময় যাঁদেরকে মিডিয়া বলুন আর জাতীয় অঙ্গন বলুন—সবখান থেকে দূরে রাখা হতো, তাঁদেরকেই এখন গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে ওই সব অঙ্গনের হর্তাকর্তারা।’
এ ব্যাপারে মাওলানা মহিম মাহফুজ বলেন, ‘সরল বিবেচনা থেকে বলতে গেলে, হেফাজত আন্দোলনের আগ অবধি কওমি পরিমণ্ডলের লোকজন সমাজের মূলস্রোত থেকে খানিকটা তফাতে ছিলেন। সমাজের তথাকথিত অগ্রসর শ্রেণি সমাজে তাঁদের অবদানকে অমূল্যায়ন করে তাঁদের আড়ালে রাখার চেষ্টা করতো। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরাও খানিকটা বিচ্ছিন্নতা বোধ করতেন। হেফাজত-পরবর্তী সময়ে সে কৃত্রিম বিচ্ছিন্নতা কমে এসেছে। বরং সমাজের গভীরে তাঁদের যে অবিশ্বাস্য প্রভাব রয়েছে, সেটা প্রবলভাবে সামনে এসেছে। তাঁদের ওপর যে গণমানুষ আস্থাবান তা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তাঁরা রাষ্ট্রের নজরে এসেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের কাছে তাদের আবেদন ও সমাদর বেড়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ ও অগ্রসর সমাজের সাথে যোগাযোগে তাদেরকে আগ্রহী হতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তাঁদেরকে সমীহ করার দৃশ্যও দেখা গেছে। তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে এবং তাদের সমর্থন পেতে রাষ্ট্রপক্ষকেও তৎপর হতে আমরা দেখেছি। আমরা লক্ষ করেছি, তারই ধারাবাহিকতায় কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ শিক্ষাসনদের স্বীকৃতি সরকার একপ্রকার উদ্যোগী হয়েই দিয়েছে। যদিও এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই সচেতন মহল মনে করে এবং এর ভবিষ্যৎ সুফল নিয়ে খোদ কওমি মাদরাসার একটি পক্ষকেই সন্দিহান মনে হয়।’
হেফাজতে ইসলামের এ আন্দোলনের ফলাফল ও প্রাপ্তি কওমি নেতৃত্ব কতটা নিজেদের ঘরে তুলতে পেরেছেন জানতে চাইলে তরুণ এ বিশ্লেষক বলেন, ‘আমি বলব, রাজনৈতিকভাবে এ অবিশ্বাস্য গণবিপ্লবের ফসল ঘরে তুলতে তারা ব্যর্থই হয়েছেন। যেহেতু নেতৃত্ব ছিল তাদের হাতে এবং সরকার সরাসরি তাদের সাথেই ডিল করেছে, তাই তাদেরই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবার কথা ছিলো। কিন্তু তাদের অপরিণামদর্শিতার কারণে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ বিপ্লবের চেতনা তারা সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হননি। এর একটি কারণ হলো সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রয়োজন অনুপাতে তাদের অনুপস্থিতি। বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক তৎপরতার সাথে তাদের অসম্পৃক্ততা।’
এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিক পরসিরে তৎপরতা সৃষ্টি করা ইসলামমনষ্ক নেতৃত্বের যেমন কর্তব্য, তেমনি তাঁদের প্রতি সেটা গণমানুষের দাবিও। হেফাজত আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনা উপজীব্য করে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক পরিসরে তাদের সর্বোচ্চ তৎপর হবার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ গণবিপ্লবের সঠিক ইতহাস এখনও সংরক্ষিত নয়। এবং সংরক্ষণের কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগও আমাদের নজরে পড়েনি। ফলে নানা মহল থেকে একে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা শুরু হয়ে গেছে। এবং এই ভুল ব্যাখ্যার চর্চা চলতেই থাকবে। ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়।
‘যদিও আন্দোলন চলাকালীন কিছু ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগে একটি তৎপরতা শুরু হয়েছিল, কিন্তু তা ধরে রাখা যায়নি। আমি ও আমার পরিচিত ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগের বীজ বপণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলাম। বলা চলে কিছুটা সার্থকতাও এসেছিল। সে-সময়ের কিছু সচেতন ও অগ্রসর তরুণ লেখককে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে এ আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনা উপজীব্য করে বেশ কিছু উপন্যাস, গল্প, কবিতা ও সংগীত রচিত হয়েছিল। পাঠকমহলে তা বেশ সাড়াও জাগিয়েছিল। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা সচল থাকেনি। আর অবশ্যই প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই সামান্য।
‘এ ক্ষেত্রে আমি সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি প্রস্তাব রাখতে চাই। যাতে বাঙালি মুসলমানের সর্ববৃহৎ গণজাগরণমূলক এ আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে। এর চেতনা গণমানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়া যায়। এ মহান বিপ্লবের কর্মী ও নেতৃবৃন্দকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। এবং প্রতিপক্ষ যেন কখনোই একে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ না পায়।
১. যোগ্য সচেতন সৎ ও ইতিহাসজ্ঞাত লেখকদের দ্বারা এর সঠিক ইতিহাস রচনা করানো।
২. সে ইতিহাস প্রাথমিকভাবে কওমি শিক্ষা সিলেবাসের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা। এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার তৎপরতা অব্যাহত রাখা।
৩. এর ইতিহাস ও চেতনা উপজীব্য করে ব্যাপকভিত্তিক সাংস্কৃতিক তৎপরতা সৃষ্টিতে পৃষ্ঠপোষকতা করা। যেমন শিল্প ও সাহিত্যের মনণশীল ও সৃজনশীল শাখায় রচনায় আগ্রহ সৃষ্টি করা।
৪. শিল্প-সাহিত্যের নানান শাখায় ইতিমধ্যে যে সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি অবদান রেখেছেন তাঁদের সম্মানিত করা। এবং ভবিষ্যৎ-প্রজন্মকে আগ্রহী করে তুলতে মানসম্মত রচনার জন্য পুরস্কার প্রবর্তন করা।
৫. মহান এ আন্দোলনের চেতনা জাগ্রত রাখতে এর সাথে সম্পৃক্ত বিশেষ দিনগুলোকে বিভিন্ন দিবস ঘোষণা করা। এবং সে দিবসে সারা দেশব্যাপী প্রতিবছর জাতীয় পর্যায়ে নানারকম সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা।
৬. উপরোল্লেখিত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং আরও নব নব উপায়ে এর চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করা। এবং সে কমিটিকে শক্তিশালী ও সুসংহত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করে দেওয়া।
‘এ সমস্ত প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশের ইতিহাসে বাঙালি মুসলমানের এ যাবতকালের সর্ববৃহৎ গণজাগরণের সঠিক ইতিহাস ও চেতনা অক্ষুণ্ন রাখা যাবে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি বাঙালি মুসলমানকে তার আত্মপরিচয় সম্পর্কেও সদা জাগ্রত রাখা যাবে। এবং এই চেতনার আলোকে পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথের নেতৃত্ব দেওয়া যাবে।’
