
হামমাদ রাগিব
ইতিহাসকে আশ্রয় করে যে উপন্যাস লেখা যায়—ব্যাপারটা বোঝার মতো এত জ্ঞান-গরিমা তখনও গজায়নি করোটিতে। তখন বোধহয় কুরআন করিমের দু-এক পারা সবে হিফজ করেছি। শফীউদ্দীন সরদারের বিখ্যাত উপন্যাস বখতিয়ারের তলোয়ার পড়া হয়েছিল শৈশবের সেই সময়টাতেই। কী যে নিদারুণ এক ভালোলাগায় আপ্লুত হয়েছিলাম বখতিয়ারের তলোয়ার পড়ে, এত বছর পর আজ, এই তারুণ্যে এসে এখনও সে-ভালোলাগার সুখ খুব ভালোভাবেই অনুভব করতে পারি।
বখতিয়ারের তলোয়ার পড়ে শফীউদ্দীন সরদারের সঙ্গে আত্মার একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়ে যায়। সেই থেকে তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা এবং প্রবল আকর্ষণ।
তারপরে হিফজের পুরো সময়টা জুড়ে তাঁকে পাঠ করেছি। উর্দু-ফারসির সংমিশ্রণে তৈরি সরদারের উপন্যাসের সংলাপগুলো যারপরনাই মুগ্ধ করত আমাকে। যেন-বা সংলাপের মধ্য দিয়েই আমি ঢুকে পড়তাম বখতিয়ার খিলজি, রাজা গণেশ, বারো পাইকার কিংবা সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহর আমলে। এ এক আশ্চর্য কারিশমা সরদারের।
দুই
সরদারের লিখতে আসা বা লেখা শুরুর বয়েসটা বিস্মিত হবার মতো। ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এককালে। ম্যাজিস্ট্রেটগিরি থেকে অবসর নেবার পর অবসর সময়টুকু যাপন করার জন্যই (হয়তো) তিনি লিখতে শুরু করেন। বলা যায় অনেকটা শেষ বয়েসে তাঁর লেখালেখির সূচনা। জন্ম ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে হলেও পাঠকের কাছে আসেন তিনি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। বিস্মিত হবার মতো ব্যাপারই বটে।
দৈনিক ইনকিলাবে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় তাঁর ঐতিহাসিক প্রথম উপন্যাস বখতিয়ারের তলোয়ার। এবং এখান থেকেই তাঁর শুহরত ছড়াতে থাকে। ধর্মীয় ভাবধারাকে উজ্জীবিত করে সময়ের সঠিক ইতিহাসটার ওপর ভিত্তি রেখে তাঁর অমন উপন্যাস রচনা দেখে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহমতুল্লাহি আলায়হি মুগ্ধ হন এবং বখতিয়ারের তলোয়ার মদীনা পাবলিকেশন্স থেকে বই আকারে প্রকাশ করেন। এই গল্প ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের। বখতিয়ারের তলোয়ার প্রকাশিত হবার পর পাঠকের কাছ থেকে এত এত সাড়া পান, সরদার হয়তো এখান থেকে উজ্জীবিত হয়েই এ যাবৎকালে ইতিহাসের যে দিকটা নিয়ে লেখক-ঔপন্যাসিকদের কেউ আলোচনারই গরজ দেখাননি, অথচ বাঙালি মুসলমানদের জন্য যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে বিষয়ে উপন্যাস রচনায় হাত দেন।
এ দেশে ইসলাম বিজয়ী বেশে কীভাবে এসেছিল বখতিয়ার খিলজির হাত ধরে, সে ইতিহাস থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময় অবধি বঙ্গভূমিতে মুসলমানদের প্রায় আটশো বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে উপন্যাসের মোড়কে তিনি তুলে দিয়েছেন বাংলাভাষাভাষী পাঠকদের হাতে। এই সময়কালকে উপজীব্য করে অনেকটা সিরিজ আকারে রচনা করেছেন সাতাশটি উপন্যাস। ইতিহাস-সচেতন পাঠক যাঁরা তাঁর উপন্যাস পড়েছেন, নিশ্চয় স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, উপন্যাস করতে গিয়ে ইতিহাসকে তিনি এতটুকু এদিক-সেদিক করেননি। বরং ইতিহাসের চরিত্রের সঙ্গে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর বিস্ময়কর অবিকৃতি রেখে কাহিনি বুনেছেন। ফলে তাঁর উপন্যাস পড়ে পাঠক একদিকে যেমন সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে অবিকৃত একটা ধারণা লাভ করেন, অন্যদিকে উপন্যাসের স্বাদটাও চাখতে পারেন।
সিরিজ আকারে ১২০০ সাল থেকে স্বাধীনতা-পূর্ব অবধি সময়ক্রমটাকে ২৭টি উপন্যাসে নিয়ে এসেছেন সরদার। সেই সঙ্গে সামাজিক উপন্যাস, রম্য, শিশুতোষ, ভ্রমণ কাহিনি, কাব্যনাট্য, নাটক মিলিয়ে আরও তিরিশের অধিক বই লিখেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো পুরো এই কর্মযজ্ঞ তিনি আঞ্জাম দিয়েছেন মাত্র ২০ থেকে ২২ বছর সময়কালের মধ্যে। অবসরপ্রাপ্ত এক ম্যাজিস্ট্রেটের এই উদ্যম, অধ্যবসা আর সাধনার কাছে বিস্ময় মানতে হবে যে-কাউকে।
তিন
সরদারের গদ্যমান নিয়ে খুঁতখুঁতানি আছে অনেকের। এমনকি আমার নিজেরও। ছেলেবেলায় যে মুগ্ধতা নিয়ে তাঁকে পড়তাম, একটু সাবালক হবার পর, যখন সাহিত্য নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি শুরু করেছি, তাঁকে পড়তে বসলে সে-মুগ্ধতা আর পাইনি৷ এবং সেটা তাঁর গদ্যমানের কারণে। কিন্তু এ-জন্য যে ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাসের ক্ষেত্রে তাঁর বিশাল অবদানকে অস্বীকার করে ফেলব, সে-রকম বদবখত আমাদের হওয়া উচিত না।
সরদার কোনো আহামরি সাহিত্যিক ছিলেন না, জীবনের মূল সময়টা পার করেছেন বিচার-আদালত করে, শেষজীবনে এসে বাংলাদেশে মুসলমানদের যে অনিঃশেষ অবদান, কালের বিবর্তনে যা জনসাধারণের বিস্মৃতিতে জায়গা করে নিচ্ছিল, তা-ই আনন্দময় ও উপভোগ্য করে তাঁদের সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এবং সেটা তাঁদেরই বোধগম্য ভাষায় সহজ-সাবলীল করে।
তাই তাঁর এ অভূতপূর্ব কর্মসম্ভারকে সাহিত্যসমালোচনার মারপ্যাঁচে ফেলে খাটো করা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞতারই নামান্তর। এ দেশের গণমানুষের কাছে বঙ্গভূমিতে মুসলমানদের শত শত বছরের অবদানের ইতিহাসকে সহজভাবে উপস্থাপনের কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, শফীউদ্দীন সরদারই এর একমাত্র হকদার। এ ক্ষেত্রে তিনি যেমন অভূতপূর্ব তেম্নি অনুপম।
সরদারকে নিয়ে যতটা আলোচনার দরকার ছিল, যতটা মূল্যায়নের তিনি হকদার ছিলেন, তার সিকিভাগও আমরা করিনি। বরং এলিট শ্রেণির ধ্বজা ধরে যাঁরা বসে আছেন, বরাবরই তাঁকে অবমূল্যায়ন করে গেছেন নিদারুণ অবহেলায়। এই অবহেলা আর অবমূল্যায়ন নিয়েই গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন। রেখে গেলেন নিজের অমূল্য কীর্তি আর অবদানের দাস্তান। আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন।
