বিদআত ও বর্জনে যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শবে বারাত

মুসান্না মেহবুব

পবিত্র শবে বারাত আজ। উপমহাদেশে এ রাতটিকে আলাদা আয়োজন ও গুরুত্ব দিয়ে উদযাপন করেন উপমহাদেশীয় মুসলমানেরা। যদিও উপমহাদেশের বাইরে, বিশেষত আরব দেশগুলোতে এ রাতে তেমন কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। স্বাভাবিক অন্য রাতের মতোই কেটে যায় এ রজনী। কিন্তু উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য শবে বরাত যেন উৎসবের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ রাতকে কেন্দ্র করে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মুসলমান মসজিদমুখী হন। ইবাদত-বন্দেগি কাটিয়ে দেন রাতের পুরোটা প্রহর। তবে ইবাদত-বন্দেগি করতে গিয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ নানা রকম রুসম-রেওয়াজে জড়িয়ে যান। শরিয়ত যেটাকে বিদআত হিসেবে গণ্য করে।

শবে বরাতের এই রুসম-রেওয়াজের বিরোধিতা করতে গিয়ে বর্তমানে একটি পক্ষ এই রাতের পুরো ফজিলতকেই থোড়াই কেয়ার করছেন। শবে বরাতকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের এমন দ্বন্দ্বে উপমহাদেশে এ রাতের যে আলাদা একটা জৌলুশ পরিলক্ষিত হতো, তা ক্রমে হারিয়ে যেতে বসেছে।

শবে বরাত নিয়ে দুই পক্ষের এই বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি নিয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম রাজধানীর যাত্রাবাড়িস্থ জামিআ আবু বকর সিদ্দীক রা. মাদরাসার সহকারী মুফতি ও মুহাদ্দিস, গবেষক আলেম মাওলানা রেজাউল করীম আবরারের সঙ্গে।

মাওলানা রেজাউল করীম আবরার এই বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করে শবে বরাত সম্পর্কে শরিয়তের মূল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন এই প্রতিবেদকের কাছে।

তিনি বলেন, ‘শবে বরাত নিয়ে আমাদের সমাজে বাড়াবাড়ি, ছাড়াছাড়ি দুটোই চলছে। ছোট বেলায় গ্রামে দেখতাম শবে বরাত উপলক্ষে ভিত্তিহীন অনেক আমল। যার অধিকাংশ হলো বিদআত। শবে বরাত উপলক্ষে সহিহ হাদিসে এমন কোনো আমল বর্ণিত হয়নি। শবে বরাত উপলক্ষে প্রত্যেক বাড়ি থেকে শিরনি বিতরণ, মাগরিব পরে মিছিল, আগরবাতি জ্বালানো, কবরস্থানে ভীড় করা-সহ আরো অনেক কিছু।

‘বর্তমান সমাজে আরো কিছু ভাই দাত গঁজিয়েছেন, যাঁদের কথা হলো শবে বরাতের মর্যাদা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এগুলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের অনেক পরে সুফিরা সৃষ্টি করেছেন!তাই শবে বরাতকে ভিত্তিহীন প্রমাণিত করতে তাঁরা আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন একাধিক পোস্ট দেখতে হয়, যেখানে শবে বরাত নিয়ে হাসি-মশকারা করা হচ্ছে।’

মাওলানা রেজাউল করীম আবরার বলেন, ‘অথচ শবে বরাতের ফজিলত যেমনভাবে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, তেম্নিভাবে উম্মতের বরেণ্য ইমামগণ এ রাতের মর্যাদাকে স্বীকার করেছেন।

‘শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতের ফজিলত রয়েছে। সালাফের অনেকেই এ রাতে নামাজ পড়েছেন। কিন্তু সম্মিলিতভাবে মসজিদে সে রাত জাগা বিদআত। তেম্নিভাবে শবে বরাতের নিয়তে নফল নামাজ জামাতে পড়াও বিদআত।” (আল ফাতাওয়াল কুবরা, ইবনে তাইমিয়া ১/৩০১)

‘ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃত্যু ৭২৭হি.) আরো বলেন, “শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস এবং আরো অনেক আছার বর্ণিত হয়েছে। যেগুলো দ্বারা এ রাতের ফজিলত প্রমাণিত হয়। সালাফের অনেকেই এ রাতে বিশেষ করে নামাজ পড়তেন। শাবান মাসের রোজা সম্পর্কে অনেক সহিহ হাদিস এসেছে। সালাফদের থেকে মদিনার অনেক উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তী কেউ কেউ শবে বরাতের ফজিলতকে অস্বীকার করেছেন এবং এ সংক্রান্ত হাদিসগুলোর ব্যাপারে আপত্তি করেছেন। বিশেষত বনু কালব গোত্রের বকরির পশম পরিমাণ লোক ক্ষমা করে দেয়ার হাদিস।

‘কিন্তু অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এবং আমাদের অনুসৃতদের মত হলো : এ রাতের ফজিলত রয়েছে। ইমাম আহমদ রহ.-এর নস এ কথার প্রমাণ করে। কেননা এ রাতের ফজিলত বিভিন্ন হাদিসে বিভিন্নভাবে এসেছে। সালাফ থেকে বর্ণিত আছার সেগুলোর সত্যায়ন করে। ‘মুসনাদ’ এবং ‘সুনান’-এর কিতাবাদিতে এ রাতের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যদিও এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে কিছু বর্ণনা জাল করা হয়েছে।” (ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম, ১/৩০২)’

মাওলানা আবরার বলেন, ‘ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হলো। প্রথমত শবে বরাতের ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং আমাদের যে সমস্ত ভাই বলে থাকেন যে, সহিহ হাদিস দ্বারা শবে বরাতের ফজিলত প্রমাণিত নয়, ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বক্তব্য অনুসারে তাঁদের কথা সঠিক নয়।

‘দ্বিতীয়ত: সালাফের অনেকেই সে মর্যাদাপূর্ণ রাতে একাকী নামাজ পড়েছেন। তবে সম্মিলিতভাবে মসজিদে এক সাথে নামাজ আদায় করা বিদআত। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাদের থেকে সম্মিলিতভাবে এমন আমল প্রমাণিত নয়।

‘এজন্য আমাদের দেশে যাঁরা সাধারণভাবে বলে দেন যে, এ রাতে বিশেষ কোনো আমল নেই, ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বক্তব্য অনুসারে তাঁদের কথাও সঠিক নয়। কেননা সালাফরা এ রাতে একাকী নামাজ পড়েছেন। শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত, যাকে আমরা শবে বরাত বলে থাকি, এর ফজিলতের কথা তাঁরা স্বীকার করেছেন। সকলেই বলেছেন যে, এ রাতে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান। এজন্য মানুষ রাত জেগে একাকী নিভৃতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করবে। তওবা করবে।

‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী সে রাতে ইবাদত করেছেন, এটাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এছাড়া যুগ যুগ ধরে সমস্ত উম্মত সে রাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। এজন্য এ রাতের ফজিলত থাকা সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। এ রাতের ফজিলতকে অস্বীকার করার অর্থ হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত অনেকগুলো সহিহ হাদিস অস্বীকার করা।

‘শবে বরাত উপলক্ষে অনেক রুসম এবং বানোয়াট আমল আমাদের সমাজে প্রসিদ্ধ, হ্যাঁ, সেগুলোকে অস্বীকার করা যেতে পারে। অস্বীকার করা আবশ্যক। এ সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করাও জরুরি। কিন্তু সাধারণভাবে শবে বরাতের ফজিলতকে অস্বীকার করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। কারণ এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেকগুলো সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

‘তাই আমাদের উচিৎ শবে বরাতে হাদিসে বর্ণিত পন্থায় একাকী ইবাদতে মশগুল থাকা। যাঁরা এ রাতকে রুসম-রেওয়াজের মধ্য দিয়ে উদযাপন করছেন, তাদের কাছে হাদিসের আলোকে শবে বরাতের প্রকৃত স্বরূপ ফুটিয়ে তোলা।’

আগের সংবাদশ্রীলঙ্কার সিরিজ বোমা হামলায় নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি
পরবর্তি সংবাদশ্রীলঙ্কায় ফেসবুক-টুইটার বন্ধ, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০৭