
রাগিব রব্বানি
৫ই মে। ২০১৩ সালের এ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেম্নি অন্যতম নৃশংসতার এক দিন। নাস্তিক্যবাদী ব্লগার ও ইসলামের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে কুৎসা রটনাকারী চক্রের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃত্বে গর্জে উঠেছিলেন এ দেশের আপামর তৌহিদি জনতা।
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মুসলমানদের বৃহৎ স্বার্থে উত্থাপিত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে দু’মাস ব্যাপী কর্মসূচির সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ কর্মসূচি ছিল ৫ ই মে ঢাকা অবরোধ। হেফাজতে ইসলামের এ ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের প্রতিটি অঞ্চল থেকে আলেম, ছাত্র ও সর্বস্তরের তৌহিদি জনতা ছুটে এসেছিলেন রাজধানীতে। ঢাকা অবরোধের জন্য ৫ ই মে সকাল থেকে তাঁরা রাজধানীর প্রতিটা প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
এতে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন ক্যাডার বাহিনীর তীব্র হামলার মুখে পড়েন তাঁরা। নিরস্ত্র নীরিহ এই মানুষগুলোর ওপর চলতে থাকে নির্মম নিপীড়ন। বিভিন্ন স্পটে শাহাদত বরণ করেন বেশ কয়েকজন মুসল্লি।
দুপুরের পর হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দশনা অনুযায়ী তৌহিদি জনতা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে গিয়ে সমবেত হতে থাকেন। মতিঝিল ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। শাপলা চত্বর সংলগ্নে একটি ট্রাকের ওপর স্থাপিত হয় সমাবেশের মঞ্চ। একে একে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেখানে আসতে থাকেন। হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও এসে হাজির হন মঞ্চে।
হেফাজতে ইসলামের সকল কার্যক্রম সেদিন পরিচালিত হচ্ছিল রাজধানীর লালবাগ মাদরাসা থেকে। এখানেই অবস্থান নিয়েছিলেন শীর্ষ নেতাগণ। সমাবেশ শুরু হবার পর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকল নেতাই এখান থেকে গিয়েছেন শাপলা চত্বরে।
হেফাজত-আমির আল্লামা আহমদ শফীও যাবার কথা ছিল। তিনি লালবাগেই অবস্থান করছিলেন। দেশের আপামর তৌহিদি জনতার চোখ ছিল তখন তাঁর দিকে; তিনি কখন যাবেন শাপলা চত্বরে। সমাবেশে উপস্থিত উদ্বিগ্ন লাখো মানুষও ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফীর অপেক্ষায়। এক পর্যায়ে লালবাগ থেকে তিনি বেরও হয়েছিলেন শাপলা চত্বরের উদ্দেশে। কিন্তু শেষমেষ আর যাননি, ফিরে এসেছেন লালবাগ মাদরাসায়।
আল্লামা শাহ আহমদ শফী লালবাগ থেকে বের হয়েও শেষমেশ কেন গেলেন না শাপলা চত্বরে, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম সেদিন তাঁর গাড়িবহরে থাকা হেফাজত-নেতা মাওলানা আনসারুল হক ইমরানের সঙ্গে।
মাওলানা আনসারুল হক ইমরান জানান, ৫ মে প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন ক্যাডার বাহিনীর নানা ধরনের চাপ ও নৃশংসতা সত্ত্বেও হেফাজত নেতৃত্ব শাপলা চত্বরে জমায়েতের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত তৌহিদি জনতা সে সিদ্ধান্ত মাফিক সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। নানা ধরনের হুমকি মাথায় নিয়ে লালবাগ থেকে একে একে শীর্ষ সব নেতা শাপলা চত্বরে গিয়ে পৌঁছেছিলেন। বাকি ছিলেন কেবল আল্লামা শাহ আহমদ শফী।
সর্বশেষে তিনিও রওনা হন শাপলা চত্বরের উদ্দেশে। দুটো গাড়ি ছিল আমাদের। একটাতে আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীসহ তাঁর ব্যক্তিগত সহযোগীরা। অপরটাতে ছিলাম আমিসহ আরও কয়েকজন। এ ছাড়াও পুলিশের একটা গাড়ি ছিল। তাঁরা নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে আমাদের সঙ্গে নেয়। এ সময় হেফাজতের কিছু কর্মী গাড়িবহরের সঙ্গে পদব্রজে রওনা করলে তাঁদের নেওয়া যাবে না মর্মে পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। বাকবিতণ্ডার পর আমরা রওনা হই।
আমাদের গাড়ি ছিল সামনে, মধ্যখানে আমিরে হেফাজতের গাড়ি, তারপরে পুলিশের গাড়ি। গাড়ির ছোট্ট এই বহর পলাশী মোড়ে পৌঁছার আগ মুহূর্তে হঠাৎ দেখি হুজুরের গাড়ি ঘুরে লালবাগ ফিরে যাচ্ছে। কেন এমনটা হলো, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, মাওলানা আনাস মাদানীর কাছে কোথা থেকে যেন ফোন এসেছে, শাপলা চত্বরে গেলে হুজুরের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে, তাই গাড়ি ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঠিক কোথা থেকে ফোন এসেছিল, কী হুমকি দেওয়া হয়েছিল, এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানেন না মাওলানা আনসারুল হক ইমরান।
এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল মাওলানা আনাস মাদানীর সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে কথা হয়েছিল হেফাজতে ইসলামের অন্যতম নেতা মাওলানা মইনুদ্দীন রুহির সঙ্গে। মাওলানা মইনুদ্দীন রুহিও নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, আল্লামা শাহ আহমদ শফী শাপলা চত্বরে গেলে তাঁর জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ত, এবং নানা ধরনের হামলার আশঙ্কাও ছিল—প্রশাসনের ভেতরে হুজুরের হিতাকাঙ্ক্ষী যাঁরা ছিলেন, সকলেই এ ব্যাপারে তাঁকে সতর্ক করছিলেন, তাই হুজুর আর শাপলা চত্বরে যাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজতের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলাপ করেও জানা গেছে এমন তথ্য। তাঁদের ভাষ্যমতে, ঢাকার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আল্লামা শফীকে মঞ্চে নেবার জন্য দফায় দফায় চেষ্টা চালান। তবে শফি সাহেব রওনা হবার পর মঞ্চ থেকে চট্রগ্রামের একজন আলেম তাঁকে মঞ্চে যাবার বিষয়ে সতর্ক করেন এবং প্রশাসনের ভেতরে শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকেও সতর্ক বার্তা আসে। জোরাজোরি সত্ত্বেও চট্রগ্রামের আলেমের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে তাঁরা অস্বীকার করেন।
গাড়িবহরে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে হেফাজত-কর্মীদের মাধ্যমে ঘেরাও করে আল্লামা শফীকে মঞ্চে নিয়ে যাবার চেষ্টা চালানো হয়। তবে পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে যেতে বাধা দেয়। কোন পথ ধরে শাপলা চত্বরে যাবে, সেই পথও ঠিক করে দিতে থাকে। তাঁর মতে, ‘এতে ভিন্ন কোনো স্থানে’ নিয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুলিশও একপর্যায়ে নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে আল্লামা শফী গাড়ি ঘুরিয়ে নেবার নির্দেশ দেন। অবশ্য জার্মান ভিত্তিক এক গবেষকের মতে তাঁকে বাধা দেবার পেছনে কেন্দ্রীয় একটি সংস্থা জড়িত ছিল। তবে হেফাজতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এমন অনুমান নাকচ করেছেন।
তবে মাওলানা আনসারুল হক ইমরান মনে করেন, নিরাপত্তা-ঝুঁকি সেদিন প্রত্যেক হেফাজত-নেতার বেলায়ই ছিল, নানা ধরনের হুমকি ধমকি সকলেই কমবেশি পাচ্ছিলেন, অবরোধে অংশগ্রহণকারী সকলেরই চাওয়া ছিল, হুজুর যেন শাপলা চত্বরে আসেন। মাওলানা ইমরান জানান, সে-মুতাবিক তাঁরা কয়েকজন আপ্রাণ চেষ্টাও করেছিলেন হুজুরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু শেষমেশ সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
