
রাগিব রব্বানি
২০১৩-এর ৫ মে ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এবং নৃশংসতাপূর্ণ একটি দিন। নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা হেফাজতে ইসলামের গণজাগরণ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল এ দিনে, ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে লাখ লাখ মুসল্লির সরব উপস্থিতিতে রাজধানীর রাস্তা-ঘাট অলিগলি কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। কিন্তু ন্যায্য দাবির জন্য জড়ো হওয়া নীরিহ এসব মানুষের ওপর নৃশংসভাবে হামলে পড়েছিল ক্ষমতাসীন সন্ত্রাসীরা।
এ গণজাগরণ কোন দিকে মোড় নেবে কেউই বলতে পারছিলেন না। সন্ত্রাসীদের আক্রমণ-নৃশংসতার ভেতর দিয়ে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। হেফাজত ততক্ষণে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। আপামর তৌহিদি জনতা সমবেত হয়েছেন সেখানে। হেফাজত নেতৃত্ব কীভাবে কী করবেন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী, এসব ব্যাপারে তখন তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছাড়া সকল শীর্ষ নেতাই শাপলা চত্বরের মঞ্চে চলে এসেছেন। আল্লামা আহমদ শফী লালবাগ মাদরাসা থেকে রওনা দিয়ে নিরাপত্তা-আশঙ্কায় আবার ফিরে গেছেন। কথা ছিল তিনি এসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবেন। এর মধ্যে এরকম একটা সংবাদও প্রচার হচ্ছিল, যে, তিনি এসে আখেরি মোনাজাত করে কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করবেন।
কিন্তু তিনি সমাবেশস্থলে না আসায় সিদ্ধান্ত জানাতে হয় উপস্থিত নেতৃবর্গকে। তাঁরা জানান, যেহেতু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, অতএব আজ রাতে শাপলা চত্বরেই অবস্থান করা হবে। আগামীকাল ভোরে সবাই ফিরে যাবেন যার যার বাড়িতে।
এদিকে প্রশাসন থেকে কড়া ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সন্ধ্যা ছটার আগে আগেই যেন ঢাকা খালি করে দেওয়া হয়। প্রশাসনের কড়া এই নির্দেশনার মুখে হেফাজতের রাতযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়, যা এখনও কমবেশি চলমান।
অনেকেই মনে করেন, হেফাজতের কিছু নেতার কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্ব এমনটা চাননি।
এ অভিযোগকে সামনে রেখে কথা বলেছিলাম হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহির সঙ্গে। মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি জানান, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখো মানুষ এসেছিলেন, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় তাদের ফিরে যাওয়া কষ্টকর এবং প্রায় অসম্ভব হবার কারণেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। এবং এটা আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সিদ্ধান্তক্রমেই হয়েছিল। তাছাড়া হেফাজত-কর্মীরা রক্তাক্ত হয়েছেন, একের পর এক শহিদ হচ্ছেন, এমন পরিস্থিতিতে আপামর তৌহিদি জনতা তাঁদের ভাইয়ের রক্তের বিচার ছাড়া ফিরতেও চাচ্ছিলেন না। সবদিক বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছিল রাতযাপনের সিদ্ধান্ত। এবং এটা আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুমতি ও সম্মতিসাপেক্ষেই নেয়া হয়েছিল।
গতবছরের জুন মাসে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের নেয়া এক সাক্ষাৎকারে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, ৫ মে শাপলা চত্বরে রাতযাপনের সিদ্ধান্ত সম্মিলিত সম্মতির ভিত্তিতেই নেয়া হয়েছিল।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে আলাপ করেও জানা গেছে এমনটা। তবে তাঁদের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে ফাতেহ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তাঁদের ভাষ্যমতে, ৪ মে রাত ১০টার পর লালবাগ মাদরাসায় পরদিনের অবরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের রুদ্ধদ্বার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৈঠকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমী, মুফতী ফয়জুল্লাহ, মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা সালাহউদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা সলিমুল্লাহ, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, মাওলানা আনাস মাদানীসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত হয়েছিলেন। এই বৈঠক থেকেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় অবরোধ-পরবর্তী কর্মসূচি বিষয়ে। এবং তাতে উল্লেখ ছিল, অবরোধ-শেষে শাহবাগের মতো হেফাজতও দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘অনেকে বলেন কোনো রাজনৈতিক দলের প্ররোচণায় ৫ মে রাতে হেফাজত শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল, এটা ভুল ধারণা৷ অবস্থানের ব্যাপারে বরং হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠকেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, যা রেজুলেশন আকারে লিপিবদ্ধ আছে।’
হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রমতে, এই রেজুলেশন খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতা মাওলানা মাহফুজুল হকের হাতে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। অবরোধ-পরবর্তী অবস্থানের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এই রেজুলেশনে অবরোধের দিনে নেতাদের কার দায়িত্ব কী, প্রশাসনিক বাধা এলে কী করতে হবে ইত্যাদি ব্যাপারেও নির্দেশনা ছিল।
