মুফতী আব্দুল মুঈজ : জাতীয় মসজিদে জাতির মুরুব্বী

আবু জর

জন্ম ও বংশ
বিগত অর্ধ শতাব্দীতে আমাদের এই অঞ্চলে যেসকল ওলামাগন ইলম ও আমল উভয়ক্ষেত্রেই এক উচ্চ সমাসীন হতে পেরেছিলেন তাদের মধ্যে মুফতী আব্দুল মুঈজ অত্যুজ্জ্বল একটি নাম। তিনি জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের খতীব ছিলেন। ঢাকাবাসী তাকে ” মুফতী সাহেব হুজুর” নামে এক কথায় চিনে নিত৷১৩৩৭ হিজরী সনের ২৭ শে জুমাদাল উলা মোতাবেক ৩ রা মার্চ ১৯১৯ ইংরেজী সনে তিনি নোয়াখালী অঞ্চলের লক্ষীপুর জেলার বটতলী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মাওলানা আব্দুল আজিজ। দাদা মিয়াজী আব্দুল মজিদ আখন্দী আর পরদাদা আহমদ আলী আখন্দী ৷ মুফতী আব্দুল মুঈজ রহ. এর মায়ের নাম মাসুমা খাতুন। এছাড়াও উর্ধ্বতন সাত পুরুষের নাম পারিবারিকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।

শিক্ষা
মুফতী আব্দুল মুঈজ রহ. প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন নিজ গ্রামে পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা আশরাফুল মাদারিসে। সেখানে তিনি উর্দু, ফারসী, আরবি ব্যাকরণ ও সাহিত্য, মানতিক, ফিকহ প্রভৃতি বিষয়ের উপর অত্যন্ত নৈপূন্যের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পারি জমান বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে। দীর্ঘদিন দেওবন্দে পড়ালেখার কালে ঝুলে পড়েন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীর দিকে। তার মতাদর্শ এবং ব্যক্তিত্ব তরুণ আব্দুল মুঈজের হৃদয়ে শক্ত অবস্থান করে নেয়। পরবর্তীতে শিব্বীর আহমদ উসমানী রহ. দেওবন্দ থেকে বিদায় গ্রহণ করে ডাভেলে এসে নতুন মাদরাসা স্থাপন করলে তিনি ডাভেলে চলে আসেন৷ এবং মাওলানা শিব্বীর আহমদ উসমানীর কাছে হাদীসের উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসেন৷

কর্মজীবন
দেশে ফিরে এসে তিনি প্রথমে কিছুদিন নিজ গ্রামের বটতলী মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। অতঃপর বরিশালের চারাখালির জামিয়া আজিজিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এত দূরে যাওয়ার কারণ ছিল, ওই মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুফতী সাহেবের পিতার ছাত্র। এবং তার পিতার নামানুসারেই মাদরাসার নামকরণ করা হয়েছে। মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতার একান্ত বাসনা ছিল মুফতী সাহেব যেন অন্তত কিছুদিন হলেও সেখানে তাশরীফ রাখেন। মুফতী সাহেব তার কথা রেখেছেন। সেখান থেকে তিনি সরাসরি আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসায় নিযুক্ত হন। এবং পরবর্তীতে সদর সাহেব মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এবং হাফেজ্জী হুজুর রহ. যখন জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসা নির্মান করেন, তখন মুফতী আব্দুল মুঈ্জ রহ. ও তাদের সঙ্গে লালবাগে চলে আসেন। এবং লালবাগ মাদরাসার প্রধান মুফতী ও প্রধান শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিয়োজিত হন।জামিয়া লালবাগের মুফতী পদে থাকার ফলে তৎকালীন সময়ে তাকে ফতোয়া বিষয়ক অনেক কাজ করতে হয়। ওই সময়েই তিনি সকলের মুখে মুখে তিনি মুফতী সাহবে হুজুর নামে খ্যাতি লাভ করেন।

পারবারিক জীবন
ডাভেলে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফেরার পর পিতা মাতার আদেশে তিনি লক্ষীপুর সদরের মান্দারীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জনাব মাস্টার বশীরুল্লাহ সাহেবের কন্যা সাজেদা বেগমের সঙ্গে পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ হন। তাদের বিবাহ সংঘটিত হয়েছিল ১৩৬৬ হিজরির ১১ ই মুহাররম রোজ বৃহস্পতিবার।

মুফতী সাহেব ছিলেন পাঁচ পুত্র ও চার কন্যা সন্তানের জনক।

চারিত্রিক বৈশিষ্ট
তিনি খুবই সাদাসিধা নরম স্বভাবে মানুষ ছিলেন। সর্বদা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কথা বলতেন। তার ওয়াজ মাহফিল এবং বাইতুল মুকাররম মসজিদের খুতবা সবকিছুই ছিল অত্যন্ত পরিমিত ও গোছালো। এইজন্যই সকলের হৃদয়ে তিনি এক অনবদ্য স্থান করে নিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের অন্যতম একটি সৌভাগ্য হল, তিনি জীবনে বহুবার হজ আদায় করেছেন। এছাড়াও সরকারী উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে তাকে দেশ ভ্রমন করতে হয়েছে। একবার সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তিনি এক সঙ্গে হজ পালন করেন। সমগ্র জীবনে তিনি সর্বমোট ১৯ বার হজ আদায় করেছেন।

রাজনৈতিক সক্রিয়তা
তিনি শিক্ষা ও ধর্ম সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মনোযোগী থাকতেই বেশী পছন্দ করতেন, ফলে কখনই স্বশরীরে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা হয়ে ওঠেনি। তবে পারিবারিক সূত্রে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। এবং মুসলিম লীগের রাজনীতি ও পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করতেন।

ইন্তেকাল
তিনি বার্ধক্যজনিত দূর্বলতা ছাড়া বড় কোন আক্রান্ত ছিলেন না। খুব স্বাভাবিক জীবন যাপন করছিলেন। শুক্রবার জুমার নামাজের ইমামতিও করেছেন। সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাত ও ফতোয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সুচারুরূপে।

২৬ শে আগস্ট ১৯৮৪ সাল রোজ রবিবার সকাল আটটায় এই মহামনীষী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।তার মৃত্যুতে দেশের সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। জাতীয় খতিবের জানাযায় ভেঙে পড়ে মানুষ। দেশের অন্যতম তিন কিংবদন্তি আলেম, মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ. মাওলানা আমীনুল ইসলাম রহ. এবং সর্বশেষ বাইতুল মুকাররমের পরবর্তী সময়ের খতীব মাওলানা উবায়দুল হক রহ. পর্যায়ক্রমে তাঁর জানাযার নামাজের ইমামতি করেন।

তাঁর লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়৷ এবং সেখানে চতুর্থবারের মত জানাযা পড়ে গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন মাদরাসার পাশেই এই মহামনীষীকে সমাহিত করা হয়।

আগের সংবাদওআইসি সম্মলেনে যোগ দিতে শেখ হাসিনাকে সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণ
পরবর্তি সংবাদঅস্ট্রিয়ার স্কুলগুলোতে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হলো হিজাব, মুসলিম কমিউনিটির নিন্দা