
মুসান্না মেহবুব
কথিত ধর্মীয় সংগঠন হেজবুত তাওহীদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ দীর্ঘ দিন ধরে করে আসছিলেন ওলামায়ে কেরাম। ওয়াজে, বক্তৃতায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁরা হেজবুত তাওহীদের ভ্রান্ত আকিদা ও উস্কানিমূলক প্রচারণার বিরোধিতা করে এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছেন নিয়মিত। তাঁরা বলছেন, ইসলামের চৌদ্দশো বছরের পুরনো ঐতিহ্য এবং শাশ্বত আকিদা-বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে অভিনব ও মনগড়া ইসলামের আবিস্কার করেছে হেজবুত তাওহীদ। এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার হীন চেষ্টা অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি।
ওলামায়ে কেরামের সচেতনতা মূলক এসব বয়ান-বক্তৃতায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে হেজবুত তাওহীদ৷ ওলামায়ে কেরাম তাদের ভ্রান্ত আকিদা ও দাবি খণ্ডানোর জন্য এক মঞ্চে বসার আহ্বান জানালেও হেজবুত তাওহীদের লোকজন বরাবরই তা এড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি তারা দেশের শীর্ষ ও তরুণ কয়েকজন আলেমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। যশোরের একটি মাহফিলে হেজবুত তাওহীদের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করার কারণে যশোর আদালতে ওই মাহফিলে আগত বক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মিলিয়ে মোট আটজনের বিরুদ্ধে তারা মামলা দায়ের করেছে। আট জনের মধ্যে যশোরের স্থানীয় ওলামায়ে কেরামের পাশাপাশি মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী এবং দেশের অন্যতম মুফতি দিলওয়ার হোসাইনের নামও আছে।
এদিকে কিশোরগঞ্জেও একটি মাহফিলে হেজবুত তাওহীদের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করার কারণে মুফতি রেজোয়ান রফিকি নামে একজন ওয়ায়েজের বিরুদ্ধে মামলা করেছে স্থানীয় হিজবুত তাওহীদের নেতারা। এসব মামলার প্রতিক্রিয়ায় গতকাল রাজধানীর পল্টনে আকিদা সংরক্ষণ কমিটির ব্যানারে তরুণ আলেমরা একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে তাঁরা আলেমদের ওপর হেজবুত তাওহীদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং সংগঠনটির সকল রকমের কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।
এ ব্যাপারে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম মুফতি রিজওয়ান রফিকির সঙ্গে। জানতে চেয়েছিলাম, যে মামলাগুলো হয়েছে তার মুকাবিলা তারা কীভাবে করবেন, পাল্টা কোনো মামলা করার ইচ্ছে তাদের আছে কি-না। জবাবে মাওলানা রেজোয়ান জানান, প্রচলিত আইনি যে ধারা আছে, সে মুতাবিকই তাঁরা লড়বেন এবং শিগগির মুরব্বি ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে মুরব্বিদেরকে অবগত করবেন, পরামর্শ নেবেন। মুরব্বিদের সঙ্গে বসার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আইনিভাবেই এদের মোকাবেলা এবং প্রতিরোধ করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের সহসম্পাদক মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব জানান, আলোকিত বাংলাদেশের ধর্মপাতায় বেশ কিছু দিন আগে হেজবুত তাওহীদের ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি নিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। যেখানে রেফরেন্সসহ সংগঠনটির বিভ্রান্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছিল। পরে হেজবুত তাওহীদ এই লেখার প্রতিবাদে একটা প্রতিবাদ লিপি পাঠায়। যেখানে প্রকাশিত লেখার রেফারেন্সগুলোকে অস্বীকার হয়েছে। প্রতিবাদলিপির সঙ্গে পত্রিকাকে তারা এ হুমকিও দেয় যে, যদি প্রতিবাদ না ছাপান তবে পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
আলোকিত বাংলাদেশ প্রতিবাদ লিপিটি ছাপায়, তবে প্রতিবাদে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে সেটাকে ভালোভাবে খণ্ডন করে। তারপর বেশ কিছু দিন তারা নীরব ছিল, এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কিন্তু সম্প্রতি একটি উকিল নোটিশ আসে আলোকিত বাংলাদেশের সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের নামে। ওই লেখা ছাপানোর জেরেই এ উকিল নোটিশ। নোটিশ অনুযায়ী আলোকিতর সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক গতকাল বসেছিলেন হেজবুত তওহীদের সঙ্গে। তাদের দাবি, যে দুটো লেখা ছাপানো হয়েছে, তার জন্য আমাদের প্রতিবাদ লিপি ছাপতে আলোকিত বাংলাদেশে এবং সেই সঙ্গে পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে দুঃখপ্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় আইনি ধারায় কঠোর মামলা করার হুমকি দেয় তারা।
আলোকিত বাংলাদেশ প্রথম শর্তটি মেনে নেয়। অর্থাৎ প্রতিবাদলিপি ছাপতে তারা রাজি হয়ে যান, কিন্তু দুঃখপ্রকাশ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব জানান, হেজবুত তাওহীদের সঙ্গে আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার বিষয়টা এখন পর্যন্ত এভাবে অমীমাংসতই রয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত কী হবে, এখনও জানা নেই।
হেজবুত তাওহীদের এই আস্ফালন ও অপতৎপরতা বন্ধে কী করা যেতে পারে জানতে চাইলে মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব বলেন, ‘আসলে এদের বিরুদ্ধে বিবৃতি-বক্তৃতা দিয়ে এদেরকে থামানো যাবে না, আইনিভাবে লড়তে হবে। যেমনটা তারা শুরু করেছে। তাদের প্রকাশিত বই ও বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্তিমূলক কথা-বার্তা কোট করে এর মাধ্যমে ধর্ম বিকৃতি ও অবমাননার অভিযোগে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে মামলা করতে হবে। পাশাপাশি মুরব্বি ওলামায়ে কেরাম, নির্দিষ্ট করে বলি, আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর পক্ষ থেকেও এদের বিরুদ্ধে শক্ত বিবৃত আসতে হবে। এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে আলেমদের উঁচু পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল গিয়ে এ সংগঠনের ভ্রান্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে। তবেই কেবল একটা সম্ভাবনা আছে এই সংগঠনটির টুঁটি চেপে ধরার। এম্নিতে কেবল বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না, উল্টো আরও আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে, মামলা মোকদ্দমা করে ফাঁসিয়ে দেবে। তখন কিন্তু আমাদের কাউকে আর পাশে পাবেন না, এটা তিক্তই বাস্তবতা।’
পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছিল বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ বাংলাদেশে যুগ্মমহাসচিব মুফতি নুরুল আমীনের সঙ্গে। তিনি জানান মামলার বিষয়ে এখনও শীর্ষ আলেমরা অবগত হননি। তবে আল্লামা মুফতি দিলওয়ার হোসাইন সাহেবের বিরুদ্ধে যদি মামলা হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই শীর্ষ আলেমরা এ ব্যাপারে তৎপর হবেন। হেজবুত তাওহীদ নিয়েও ভাবার সময় এসেছে বলে জানান মুফতি নুরুল আমীন। তিনি তরুণ আলেমদের তৎপরতা এবং বাতিল মুকাবেলার উদ্যোগে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, তরুণ আলেমরা মুরব্বিদের সঙ্গে পরামর্শে এলে এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণে সর্বাত্মক সচেষ্ট হবে শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম।
