
আবু জর
হজরত শাহ সুলতান রুমী রহ. ছিলেন রোম সাম্রাজ্যের রাজপরিবারের সদস্য। রোম সম্রাটের ছোট ভাই এবং সে দেশের একটি প্রদেশের গভর্নর হয়েও রাজ্য শাসন ও রাজকীয় ভোগবিলাস প্রত্যাখ্যান করে দ্বীন প্রচার ও আল্লাহপাকের সান্নিধ্যলাভের আশায় জন্মভূমি রোম থেকে এসেছিলেন সুদূর বাংলা নামের এই ভূখণ্ডে৷ বর্তমান বাংলাদেশের এক প্রান্তসীমা নেত্রকোনা জেলার মদনপুর নামক গ্রামে। আজ এ গ্রামসহ সারা দেশেই বাঙালি জাতির শতকরা পাঁচজন ছাড়া অন্য সবাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান। এদেশে সর্বপ্রথম এই পবিত্র ইসলাম দাওয়াত শুরু করেছিলেন তিনিই।
হিজরত
ঐতিহাসিকদের অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশের এই অঞ্চলে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামের সুশীতল শান্তির আহবান বয়ে আনেন। ইতিহাসে ধরা হয়, ইংরেজি ১০৫৩ সালে ইসলাম প্রচারের জন্য ১২০ জন সুফি-সাধক সহচর নিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এর ১১৬ বছর পর ভারতের আজমিরে সুলতানুল হিন্দ হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.) এবং ২৫০ বছর পর বাংলাদেশে হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.) আগমন করেছিলেন। যে কারণে তিনি এই বাংলাদেশ তথা গোটা উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচারকারী ব্যক্তি হিসেবে খ্যাত।
দ্বীন প্রচারের পদ্ধতি
হজরত শাহ সুলতান রুমী রহ. যখন এদেশে আগমন করেন, তখন দ্বীনি দাওয়াতের জন্য দেশের পরিস্থিতি তার পক্ষে ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যাচারী শাসকেরা শাসন করত। নতুন কোন ধর্মের দিকে আহ্বান সহ্য করার মত তারা ছিল না। এমন বিপদসংকুল অবস্থায় একত্রে যুথবদ্ধভাবে দাওয়াতের কাজে নেমে পড়লে অত্যাচারী রাজাদের রোষানলে পতিত হবার ভয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাগ ভাগ করে ইসলাম প্রচার করতে সুফি দরবেশদের দাওয়াতি কাফেলা পাঠাতে লাগলেন। একপর্যায়ে তিনি ৪১ জন অলি-দরবেশ নিয়ে চলে এলেন কোচরাজ বোকাই কোচের রাজধানী ‘বোকাইনগর’ হয়ে বর্তমান নেত্রকোনা জেলার মদনপুরে। এই মদনপুরে তখন হিন্দু সামন্তরাজ মদন কোচের শাসন কায়েম ছিল। এ সময় মদন কোচের শাসনাধীনে উল্লেখযোগ্য না হলেও যেসব মুসলমানের মদনপুরে বসবাস ছিল, তাঁদের খুব তুচ্ছতাচ্ছিল্য হয়েই থাকতে হতো সেখানকার হিন্দুদের অত্যাচারে। রাজা মদন কোচ তাঁকে অবাধে ইসলাম প্রচারের সুযোগ দিলেন। আর এ সুযোগ গ্রহণ করেই হজরত শাহ সুলতান রুমী (রহ.) এবং তাঁর ভক্ত-মুরিদান ইসলাম প্রচার করতে লাগলেন।
অলৌকিক ঘটনা
প্রায় একশ বছর আগে সংগৃহীত এই অঞ্চলের একটি লোককাহিনী থেকে বাংলায় তাঁর জীবন ও কার্যক্রম সম্বন্ধে জানা যায়। কাহিনী অনুসারে রুমী যখন এখানে এসে স্থিত হন তখন নেত্রকোণা এলাকা জনৈক কোচ রাজার শাসনাধীন ছিল। দরবেশ ও তাঁর অনুসারিগণ ছাড়া সে সময়ে ওই অঞ্চলে আর কোন মুসলমান ছিল না। কিন্তু দরবেশের বসতি স্থাপনের পর পরই তাঁর ধার্মিকতা বিপুল সংখ্যক লোককে আকৃষ্ট করে। বলা হয় যে, কোন লোক তাঁর সাহচর্যে আসলেই তাঁর অলৌকিকতায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে একান্ত ভক্ত অনুসারী হয়ে পড়ত। রাজার নিকট যখন এ খবর পৌঁছায় তখন তিনি দরবেশকে ডেকে পাঠান এবং তাঁর কাজকর্ম ব্যাখ্যা করতে নির্দেশ দেন। দরবেশ জানালেন আল্লাহ তাঁকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় বলীয়ান করেছেন। রাজার আদেশে দরবেশকে বিষ পরিবেশন করা হয়। তিনি বিসমিল্লাহ বলে তা পান করেন। রাজা অবাক বিস্ময়ে দেখলেন যে, দরবেশের কিছুই হয় নি, বরং তিনি নিরাপদ ও বিপদমুক্ত রয়েছেন। এতে মুগ্ধ হয়ে উপস্থিত সকল লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং রাজা মদনপুর গ্রাম দরবেশকে নিষ্কৃতি দান করেন।
মাজার শরিফ
তার জন্ম এবং মৃত্যু কোনকিছুই ইতিহাস থেকে পরিস্কার জানা যায়না। লোকমুখে প্রচলিত অথবা আগেরদিনে পুথি-পত্র থেকেই যতটুকু জানা যায়। ইন্তেকালের পর তাকে নেত্রকোনার মদনপুরেই সমাহিত করা হয়। এবং তার কিছু সঙ্গী সাথিও তাঁর সঙ্গে মদনপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন৷
