
আবু জর
শায়েখ আলী তানতাবীর অন্যতম পরিচয় তিনি আধুনিক যুগের প্রসিদ্ধ আরবি সাহিত্যিক। বহুগ্রন্থ রচনার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও জীবনবাদী ধারার সাহিত্য রচনা তাঁকে মানুষের ভালোবাসার উচ্চশিখরে পৌঁছে দিয়েছে। শুরুর দিকে ছিলেন পেশাদার সাংবাদিক ও পত্রিকার কলাম লেখক। তখন থেকেই আগ্রহ ছিল সৃজনশীল গল্প ও ইতিহাস-কেন্দ্রিক লেখাজোখার প্রতি। পরবর্তী জীবনে এই আগ্রহ ও স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন পরিপূর্ণ সফলতার সাথে। শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ–সকলের জন্যে লিখে গেছেন বেশ কিছু মূল্যবান আলংকারিক বই। দ্যুতি ছড়িয়েছেন আরবের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম জনপদেও।
প্রাথমিক জীবন
আরবি ভাষার কিংবদন্তি এই লেখক ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুন বর্তমান সিরিয়ার দামেশকের বিখ্যাত তানতাবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দামেশক তখন উসমানি খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত এলাকা ছিল। তানতাবী পরিবার ছিল দামেশকের অন্যতম খ্যাতিমান ধর্মভীরু পরিবার। ইসলামের প্রতি তাদের আনুগত্য সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখত এবং এ সূত্র ধরে তাদেরকে ভালোবাসত। পারিবারিকভাবেই শায়েখ আলী তানতাবী দীনদার ও সাহিত্যনুরাগী হিসাবে বেড়ে ওঠেন। পাঁচ ভাইবোনের মাঝে তিনি ছিলেন সবার বড়। নিজ এলাকাতেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে বেরিয়ে পড়েন বিশ্বের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে। দামেশক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩২ সালে অর্জন করেন স্নাতক ডিগ্রি।
কর্মজীবন
কিশোর বয়স থেকেই প্রতিকুলতা তাঁর পিছু ছাড়ছিল না। মাত্র ষোলো বছর বয়সে বাবা মারা যান। পরিবারের বড়ছেলে হিসেবে সংসারের ভার ন্যস্ত হয় তাঁর কাঁধেই। সময়ের প্রয়োজনে করেছেন অনেক কিছুই। প্রথমদিকে প্রাইমারি পর্যায়ের শিক্ষকতা ও পত্রিকায় লেখালেখিকে তিনি জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেন। তাঁর বিস্তৃত জীবনের একটা বিশাল জায়গা দখল করে আছে শিক্ষকতা। তিনি তাঁর কর্মজীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মোটামুটি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতা করেছেন। এবং বেশ কয়েক বছর বিচারক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেখালেখি
১৯২৬ সালে আল-মুকতাবাস নামক পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে লেখালেখির জগতে সেই যে তাঁর পদচারণা শুরু, এরপর তাঁর পথচলা নিরন্তর গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তারপর ১৯৩০ সালে ‘আল বাথ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক অসুবিধার কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
তাঁর ক্ষুরধার কলম একে একে উপহার দিয়ে যায় তেত্রিশটি গ্রন্থ এবং দশটির মতো ছোট পুস্তিকা। সুখের বিষয় হলো, ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষেই তিনি আজীবন সাহিত্য সাধনা করে গেছেন এবং ইসলামি বিষয়েই তাঁর সব সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে।
আলী তানতাবীর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছিল প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে। তিনি সিরিয়া, মিশর, সৌদি আরব ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের নামকরা জার্নালগুলোতে আর্টিকেল লিখতেন। পরবর্তীতে তাঁর অধিকাংশ প্রবন্ধই গ্রন্থকারে সংকলিত হয়েছে। ‘বিদীনিল ইসলাম’ তাঁর একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন। বইটিতে অত্যন্ত সুচারু, সহজ ও সাবলীল বর্ণনায় ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। সুন্দর উপমা-উদাহরণের মাধ্যমে ইসলামের পরিচিতি, আল্লাহর প্রতি ঈমান ও একত্ববাদ থেকে নিয়ে তাকদিরে বিশ্বাস, আখেরাতে বিশ্বাস, ফেরেশতা ও নবি-রাসূলগণে বিশ্বাসসহ ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের জটিল-কঠিন মাসআলাগুলো সহজ ভাষায়, যৌক্তিকতা, অলৌকিকতা ও প্রমাণসহ গল্পচ্ছলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর রচিত আরো কিছু বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন হলো– ফি সাবিলিল ইসলাহ, ফুসুলুন ইসলামিয়্যাহ, মাকালাতুন ফি কালিমাত, হুতাফুল মাজদ, ছুওয়ারুন ওয়া খাওয়াতির, ফিকির ওয়া মাবাহিস ইত্যাদি।
আলী তানতাবী লিখেছেন ছোটগল্প। তিনি সাধারণত দুই ধরনের ছোটগল্প লিখতেন। ঐতিহাসিক ছোটগল্প এবং সমাজে প্রচলিত বাস্তব জীবনকাহিনি নির্ভর ছোটগল্প। আলী তানতাবীর একটি ঐতিহাসিক ছোটগল্প হলো হিকায়াতুম মিনাত তারিখ।
খলিফা সোলাইমান বিন আব্দুল মালিকের শাসনামলে এক ধনাঢ্য দানবীর ছিলেন খোজায়মা বিন বিশর। যিনি দান করে তাঁর সম্পদের সর্বশেষ অংশটুকুও নিঃশ্বেষ করে দিয়েছিলেন। অর্থাভাবে যখন দিন যাচ্ছিল না, তখন আল্লাহর সাহায্য কিংবা মৃত্যু–এ দুটির কোনো একটির অপেক্ষায় পুরো পরিবার সাথে নিয়ে দরজায় খিল দিয়ে বসেন। শহরের গভর্নর ইকরামা আল ফায়য়াজ বিষয়টি জানতে পেরে রাতের আঁধারে চার হাজার স্বর্ণ মুদ্রার একটি থলে নিয়ে ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়েন। গভীর রাতে খোজায়মার দরজায় কড়া নেড়ে তাঁর হাতে মুদ্রার থলে ধরিয়ে দিয়েই তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যান।
এ দিকে ইকরামার স্ত্রী ছদ্মবেশে তাঁকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেই সন্দেহ করে বসে। ভাবে স্বামী ইকরামা তাকে ধোঁকা দিয়ে আরেকটি বিয়ে করে ফেলেছে। আর এখন ছদ্মবেশে সেই স্ত্রীর কাছেই সে গমন করছে। এভাবেই ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনার দৃশ্যপট। আর গল্পের কাহিনি সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এ গল্পে লেখক মূলত প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করার প্রতি পাঠকদেরকে অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর ভাষায় উৎসাহিত করে গেছেন। এ তো বললাম মাত্র একটি গল্পের কথা। এ রকম শিক্ষণীয় অনেক ঐতিহাসিক গল্পই তিনি রচনা করেছেন। আলী তানতাবী রচিত বিখ্যাত কিছু ঐতিহাসিক গল্পের সংকলন হলো ‘রিজালুম মিনাত তারিখ’।
সমাজে প্রচলিত বাস্তব জীবন কাহিনি নির্ভর তাঁর একটি ছোটগল্প সংকেলনের নাম ‘কাসাসুম মিনাল হায়াত’। এ বইটিতে লেখকের মোট সাতাশটি গল্প স্থান পেয়েছে। সাতাশটি গল্পের সবগুলোই একটির চেয়ে অন্যটি চমৎকার। একটি গল্পের কথা না বললেই নয়। গল্পটির নাম শায়খুন ফিল মিরকাস। নাটক-থিয়েটার ও সিনেমাহলে গমন করে মানুষকে দীনের পথে আহ্বানকারী এক শায়খের গল্প এটি।
আমাদের মধ্যে যাঁরা দীনের দায়ী হতে চান, এ গল্পটি তাঁদের জন্য দাওয়াতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আলী তানতাবীর এ গল্পের শায়খ যখন সর্বপ্রথম সিনেমা থিয়েটারে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন কিন্তু তাঁর মুরিদরা জোরালোভাবে তাকে বাধা দেয়। সেখানে গেলে অপদস্থ ও অপমানিত হওয়ার ভয় দেখায়। কিন্তু মুরিদদের দেখানো সব ভয় উপেক্ষা করে শায়খ এসে উপস্থিত হন থিয়েটারে। তিনি নাটক দেখতে আসা লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। লোকদের গালি-গালাজ উপেক্ষা করে তিনি তাঁর বক্তব্য চালিয়েই যেতে থাকেন।
একসময় তাঁর কথা মানুষের মনে এমন প্রভাব সৃষ্টি করে, উপস্থিত দর্শকদের সাথে সাথে থিয়েটার মালিকও ভালো হয়ে তার একজন বিশ্বস্ত মুরিদে পরিণত হয়।
আলী তানতাবীর রচনার আরেকটি বড় অংশ হলো জীবনী সাহিত্য। তিনি সাইয়্যেদুল মুরসালিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী থেকে শুরু করে ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আহমদ বিন ইরফান আশ-শহীদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি পর্যন্ত অনেকের জীবন ও কর্ম অত্যন্ত সহজ ভাষায় সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন।
আবু বকর, উমর ও আব্দুর রহমান বিন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের জীবনের অজানা নানাদিক তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে আমাদের মধ্যে যাঁরা দীনের পাশাপাশি হালালভাবে দুনিয়া উপার্জনে আগ্রহী, তাঁদের জন্য আলী তানতাবীর রচিত আব্দুর রহমান বিন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনী হতে একটি জীবন পথের দিশার মতো। এতে সম্পদ অর্জন শুধু নয়, দানবীর হওয়ার শিক্ষাও রয়েছে।
এই তিনটি বিষয়ের বাইরেও সমাজ, সমাজের মানুষের সাথে আচার-ব্যবহার, দামেশকে ইসলামি স্থাপত্য শিল্পের অনন্য নিদর্শন উমাইয়া মসজিদের ইতিহাস, বাগদাদ নিয়ে স্মৃতিচারণ, আত্মজীবনীসহ আরো অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে ছিল তাঁর লিখনীর ব্যাপ্তি।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা
১৯৩০-এর দশকে শায়েখ আলী তানতাবী ফ্রান্সের ম্যান্ডেট শাসন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণভাবে লড়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে জাতীয় ব্লকে যোগদান করেন। এবং ১৯৪১ সালে তিনি দামেশকের নাগরিক বিচারপতির পদে নিয়োজিত হন।
তিনি সাহিত্যখ্যাতির মতো গণমানুষের ভালোবাসাও পেয়েছেন অনেক। ১৯৫০ সালে তিনি আরব জাতীয়তাবাদের একজন শীর্ষ নেতায় পরিণত হন। এবং সিরিয়ার সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেন। তিনি ছিলেন আরবের একনায়কতন্ত্রী কায়েমি শক্তির একজন কট্টর সমালোচক।
শেষের দিকে এসে তিনি মক্কায় বসতি স্থাপন করেন। এবং মক্কা থেকেই আন্তর্জাতিক আন্দোলনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। মক্কায় থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে জনসম্মুখে দেয়া তাঁর ভাষণগুলিও ইতিহাসের মূল্যবান অংশ হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
ইন্তেকাল
শায়খ আলী তানতাবী তাঁর দীর্ঘ জীবন সাহিত্য সাধনা করে মোট তেত্রিশটি গ্রন্থ এবং দশটির মতো ছোট পুস্তিকা লিখে গেছেন। এই মহান মনীষী ১৯৯৯ সালে জেদ্দায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। আল্লাহ তাঁকে মাগফেরাত নসিব করুন।
