অভিভাবকশূন্য হচ্ছে সিলেট : দেড় বছরে শীর্ষ ৯ আলেমের মৃত্যু

হামমাদ রাগিব

২০১৭-এর ডিসেম্বর থেকে ২০১৯-এর জুন—মাত্র দেড় বছরে ইন্তেকাল করেছেন সিলেট অঞ্চলের প্রখ্যাত ও প্রভাবশালী ৯ জন শীর্ষস্থানীয় মনীষী আলেম। বৃহত্তর সিলেটের ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজে ভিন্ন ভিন্নভাবে এ ৯ আলেমের খ্যাতি, অবদান ও প্রভাব ছিল উল্লেখ করার মতো। সিলেটের ধর্মীয় অঙ্গন এঁদেরকে হারিয়ে এখন যেন অনেকটাই অভিভাবকহারা।

২০১৭-এর ১৬ ডিসেম্বর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক শিক্ষাবোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারার মহাসচিব মাওলানা আবদুল বাসিত বরকতপুরীর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল সিলেটের ধর্মীয় অঙ্গনের দুর্ভাগ্যের এই যাত্রা। তারপর অল্প কিছু দিনের তফাতে একে একে ইন্তেকাল করেছেন শায়খুল হাদিস মাওলানা জিল্লুর রহমান, শায়খুল হাদিস মাওলানা হোসাইন আহমদ বারোকোটি, প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান, শায়খুল হাদিস মাওলানা আবদুস সাত্তার (হেমুর হুজুর), মাওলানা খলিলুর রহমান (হাজীসাব হুজুর), মুফতি আবুল কালামা যাকারিয়া, মাওলানা শফীকুল হক আমকুনী এবং সর্বশেষ গত পয়লা জুন ইহধাম ত্যাগ করেন জামিয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার অর্ধ শতাব্দীকালের শায়খুল হাদিস মাওলানা শিহাবুদ্দীন।

মাওলানা আবদুল বাসিত বরকতপুরী ছিলেন সমকালীন সিলেটের অন্যতম শীর্ষ আলেম। আযাদ দ্বীনি এদারার মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার উন্নয়নে আমৃত্যু কাজ করেছেন। কওমি শিক্ষাসনদের সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে সিলেট থেকে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তানের খ্যাতিমান মনীষী মাওলানা ইউসুফ বানুরি ও বাংলাদেশের অন্যতম শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হকের স্নেহধন্য ও একান্ত ছাত্র ছিলেন তিনি। সিলেটের জামিয়া গহরপুর, জামিয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হজরত শাহজালাল-সহ বেশ কয়েকটি মাদরাসায় জীবনের বিভিন্ন ভাগে হাদিসের অধ্যাপনা করেছেন। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন বেশ কিছুদিন। ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় হঠাৎ অসুস্থতাবোধ করলে সিলেট উপশহরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অল্প খানিক সময়ের মধ্যে হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

মাওলানা বরকতপুরীর ইন্তেকালের কয়েক মাসের মাথায় ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই আবারও শোকের ছায়া নামে সিলেটে। এ দিনে ইন্তেকাল করেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার দীর্ঘ দিনের শায়খুল হাদিস মাওলানা জিল্লুর রহমান চৌধুরী। ১৯৩৪ সালে সিলেটের কানাইঘাটে জন্ম নেওয়া এ প্রবীণ মনীষী আলেম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়ি আলিয়া মাদরাসা, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ও সিলেট আলিয়া মাদরাসায় হাদিসের অধ্যাপনায় পার করেছেন নিজের কর্মজীবনের পুরোটা সময়। ১৯৯৮ সালে সিলেট আলিয়া থেকে অবসরগ্রহণের পরও মৃত্যু অবধি তিনি বিভিন্ন মাদরাসায় নিয়মিত বুখারি শরিফের অধ্যাপনা করেছেন।

মাওলানা জিল্লুর রহমানের ইন্তেকালের মাস পেরোবার আগে আবারও শোকে মূহ্যমান হয় সিলেট। ১১ আগস্ট ইন্তেকাল করেন আযাদ দীনি এদারার সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা হুসাইন আহমদ বারোকোটি। মাওলানা বারোকোটি ছিলেন সমকালীন সিলেটের অন্যতম প্রবীণ ও মুরব্বি আলেম। সিলেটের প্রাচীনতম মাদরাসাসহ বেশ কয়েকটি মাদরাসায় পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ ৬৩ বছর ধরে তিনি বুখারি, মুসলিম, তিরমিজিসহ কওমি মাদরাসা শিক্ষাসিলেবাসের বিভিন্ন জটিল ও দুর্বোধ্য কিতাবের পাঠদান করেছেন। শায়খুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানির একান্ত স্নেহধন্য ও হজরত শায়খে কৌড়িয়ার অন্যতম খলিফা ছিলেন তিনি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতি করেছেন জীবনভর এবং জমিয়তের একনিষ্ঠ কর্মী থেকে একসময় হয়ে উঠেছেন অন্যতম নেতা। সিলেটের ধর্মীয় ও সামাজিক নানামাত্রার সংকটে তিনি ছিলেন ওলামায়ে কেরামের উল্লেখযোগ্য আশ্রয়।

মাওলানা বারোকোটির ইন্তেকালের শোক কাটতে না কাটতেই ১৯ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন সিলেটের সিংহপুরুষখ্যাত অমিততেজা আলেম প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান। বাংলাদেশে নাস্তিক্যবাদ-বিরোধী তীব্র আন্দোলনের সূচনা প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানের হাত ধরেই হয়েছিল। ১৯৮৭-৮৮ সালে নাস্তিক দাউদ হায়দার, সরদার আলাউদ্দিন এবং ১৯৯৩-৯৪ সালে নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ধর্মবিদ্বেষী ও ধর্মের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক লেখাজোখার প্রতিবাদে তরুণ হাবীবুর রহমান সিলেট থেকে যে তীব্র আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা এ দেশের ধর্মীয় আন্দোলনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ ছাড়াও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলের নামকরণ, ওপেন কনসার্ট, মদের আড্ডা ও জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সিলেটে যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিতেন প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান। নব্বইয়ের দশকে সিলেটে ধর্মীয় ইস্যুর আন্দোলন মানেই ছিল প্রিন্সিপালের গর্জন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের স্নেহধন্য ও সহযোগী। মৃত্যুর আগ অবধি বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর ছিলেন।

প্রিন্সিপালের ইন্তেকালের কয়েক মাস পর ২০১৮-এর সর্বশেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন জামিয়া গহরপুরের শায়খুল হাদিস মাওলানা আবদুস সাত্তার (হেমুর হুজুর)। একযুগেরও বেশি কাল ধরে গহরপুরের হাদিসের মসনদে থাকা এই বয়োবৃদ্ধ আলেম ছিলেন একান্ত নিভৃতচারী ব্যক্তিত্ব। শায়খুল হাদিস আল্লামা গহরপুরী রহমতুল্লাহি আলায়হির ইন্তেকালের কিছু দিন পর থেকে তাঁর মৃত্যু অবধি তিনি গহরপুরের শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা ও নিভৃতচারিতার সাথে।

হেমুর হুজুরের ইন্তেকালের দু মাসের মাথায় ২০১৯-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন আরেক নিভৃতচারী মুহাদ্দিস আলেম মাওলানা খলিলুর রহমান (হাজিসাব হুজুর)। জামিয়া দরগাহে হজরত শাহজালালের হাদিসের শিক্ষক হবার পাশাপাশি দীর্ঘ দিন ধরে তিনি হজরত শাহপরাণ রহমতুল্লাহ আলায়হি মাজার মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দরগাহ মাদরাসার অন্যতম এই মুহাদ্দিসের ইন্তেকালের ১৫ দিন যেতে না যেতেই চিরবিদায়ের ঘণ্টা বাজে দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম ও সিলেটের অন্যতম ফকিহ আলেম মুফতী আবুল কালাম যাকারিয়ার। চলতি বছরের ১১ মার্চ সোমবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁর সন্তানতুল্য অসংখ্য ছাত্র। মুফতি যাকারিয়া ছিলেন ইসলামি আইন শাস্ত্রে সমকালীন সিলেটের তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব। কোনো ধরনের শান-শওকতের বালাই ছিল না তাঁর। যে-কেউ যেকোনো সময় তাঁর কাছ থেকে যেকোনো ধরনের মাসআলা, সরাসরি হোক কিংবা মোবাইল ফোন, জেনে নিতে পারত। বৃহত্তর সিলেটের বাইরেও তাঁর ইলমের খ্যাতি ছিল। দরগাহ মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বেশ কিছু বছর ধরে দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিবও ছিলেন তিনি।

তাঁর ইন্তেকালের কিছুদিন পর গত ২০ এপ্রিল মারা যান সিলেট নগরীর অন্যতম মাদরাসা জামিয়া মাহমুদিয়া সোবহানিঘাটের মুহতামিম মাওলানা শফীকুল হক আমকুনী। মাওলানা আমকুনীও ছিলেন সিলেটের শীর্ষ ও প্রবীণ আলেমদের অন্যতম। সিলেটের ধর্মীয় সংকটে নানাভাবে তিনি নেতৃত্বে থেকেছেন অন্যান্য মুরব্বি ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে।

সর্বশেষ গত পয়লা জুন ইন্তেকাল করেন সিলেটের প্রাচীনতম দীনি বিদ্যাপীঠ জামিয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার শায়খুল হাদিস মাওলানা শিহাবুদ্দীন। শায়খুল হাদিস আল্লামা শিহাবউদ্দীন সিলেটের শীর্ষস্থানীয় অন্যতম হাদিস বিশারদ ছিলেন। জামেয়া রেঙ্গায় দীর্ঘ ৫০ বছরেরও অধিক কাল যাবত তিনি শায়খুল হাদিস হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের আঞ্চলিক শিক্ষাবোর্ড আযাদ দ্বীনী এদারার নাজিমে ইমতেহান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তাসাউফের লাইনে ছিলেন খলিফায়ে মাদানি হজরত শায়খে কৌড়িয়া রহ.-এর উচ্চ পর্যায়ের খলিফা। হজরত শায়খে রেঙ্গা ও কৌড়িয়ার স্নেহধন্য ও অত্যন্ত ঘনিষ্টজনও ছিলেন তিনি।

শীর্ষ এ ৯ আলেমের কেউ কেউ বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে ইন্তেকাল করলেও তাঁদের অধিকাংশের ইন্তেকাল ছিল আকস্মিক এবং ধর্মীয় সমাজের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। একজনের ইন্তেকালের শোক ও বিহ্বলতা কাটিয়ে ওঠার আগে আগে ইন্তেকাল করেছেন আরেকজন এবং এই ধারাবাহিকতা এখনও চলমান। ফলে সিলেটের আলেম সমাজ একদিকে যেমন অভিভাবক-সংকটে পতিত হচ্ছেন, অপরদিকে সিলেটের ধর্মীয় অঙ্গন থেকে একের পর এক সরে যাচ্ছে ইলম ও আধ্যাত্মিকতার শীতল ছায়া।

আগের সংবাদডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে নতুন পরিচালক
পরবর্তি সংবাদঈদযাত্রায় ২১২ দুর্ঘটনায় নিহত ২৪৭