
রাগিব রব্বানি
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের নেতৃত্বে সংগৃহীত ‘এক লক্ষ মুফতি, উলামা ও আইম্মার দস্তখতসম্বলিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ-বিরোধী মানবকল্যাণে শান্তির ফতোয়া’ প্রকাশের তিন বছর পার হলেও ধর্মীয় অঙ্গনে এই ফতোয়া নিয়ে এখনও বড় ধরনের আপত্তি ও বিতর্ক থেকে গেছে। ‘শান্তি’র এ ‘ফতোয়া’ নিয়ে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বিগত তিন বছরে ইসলামের ঘোরতর শত্রু এবং মুসলিম-নিপীড়ক রাষ্ট্রপ্রধানদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে বাহবা কুড়িয়ে নিয়ে আসলেও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাদী ইসলামি ঘরানার সাধারণ শ্রেণি যেমন এই ফতোয়াকে সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি, তেম্নি ইসলাম বিষয়ে পণ্ডিতজনদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও এটাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নেননি।
ফতোয়ায় ১ লক্ষ মুফতি, আলেম ও মসজিদের ইমামের সাক্ষরের দাবি করা হলেও ব্যাপকভাবে অভিযোগ আছে, সাক্ষরকারীদের মধ্য থেকে সিংহভাগেরই ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দানের যোগ্যতা ছিল না। অনেকে এমন আছেন, যাঁদের কাছ থেকে ফতোয়ার বিষয়বস্তু উল্লেখ ছাড়াই সাক্ষর গ্রহণ করা হয়েছে।
তাছাড়া ফতোয়াটা এমন আঙ্গিকে করা হয়েছে, যার দ্বারা ইসলামের অন্যতম ফরজ বিধান জিহাদকে খাটো ও গুরুত্বহীনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এমনটাই বলছেন সিলেটের অন্যতম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া কাজির বাজারের প্রধান মুফতি মাওলানা শফিকুর রহমান।
মাওলানা শফিকুর রহমান ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, ইসলামে সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই, শান্তিপ্রতিষ্ঠাই ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য—এ কথা যেমন সত্য, তেম্নি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে এর সুরক্ষার জন্য এবং কাফেরদের দ্বারা মুসলমানেরা নিপীড়িত হলে তা প্রতিরোধের জন্য জিহাদ করাটাও সমানভাবে সত্য, বরং অপরিহার্য। মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ ইসলামের শান্তির দিকটা তুলে ধরতে গিয়ে দ্বিতীয় এই দিকটা, যেটা ইসলাম ক্ষেত্রবিশেষে অপরিহার্য করে দিয়েছে, সেটাকে ছোট করে ফেলেছেন। মোটকথা ভারসাম্য রক্ষা করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ফলত তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত জঙ্গিবাদ-বিরোধী ফতোয়াটি ওলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
চট্টগ্রামের খ্যাতিমান মাদরাসা জামিয়া পটিয়ার প্রধান মুফতী হাফেজ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে আলাপ করতে চাইলে মাওলানা মাসউদের জঙ্গিবাদ-বিরোধী এ ফতোয়ার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও ধর্মীয় কোনো বিষয়ে যোগ্যতার বাছবিচার না করে গণহারে মতামত গ্রহণ করা শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে অনুচিত বলে জানিয়েছেন তিনি।
হাফেজ আহমাদুল্লাহ বলেন, ধর্মীয় বিষয়ে বা ফিকহি কোনো বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান না রেখে সে ব্যাপারে ফতোয়া দেওয়া শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম।
মাওলানা মাসউদের আলোচিত এ ফতোয়ার একটি অংশে মুজাহিদদের বহুল প্রচলিত আত্মঘাতী বা ফেদায়ি হামলাকে স্পষ্টভাবে হারাম বলা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটের কাজির বাজার মাদরাসার প্রধান মুফতী মাওলানা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে বা নিরপরাধ মানুষের অবস্থানস্থলে আত্মঘাতী যে হামলাগুলো হয়েছে বা হয়, সেগুলো হারাম, বরং এই পুরো প্রক্রিয়াটাই তো হারাম। মানে, ইসলামের নামে যে সন্ত্রাসী হামলাগুলো হয়, সেগুলোর কথা বলছি। এই হামলাগুলো আত্মঘাতী হোক বা এম্নিতেই হোক, হারাম। এগুলো কোনোভাবেই জিহাদের পর্যায়ে পড়ে না, বরং জিহাদকে এর দ্বারা কলুষিত করা হয়। তবে যে সমস্ত এলাকায় জিহাদ ফরজ হয়ে আছে, এবং মুজাহিদিনরা যে সমস্ত অঞ্চলে কাফেরদের মুকাবেলা করছেন, সেই জায়গাগুলোতে কোনোভাবেই যদি কাফেরকে দমানো না যায়, আর কোনো মুজাহিদ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে বলেন, আমার প্রাণের বিনিময়ে হলেও শত্রুদের বড় একটা ক্ষতি সাধন করব, তাহলে এক্ষেত্রে আত্মঘাতী হামলা, মুজাহিদিনরা যেটাকে ফেদায়ি আক্রমণ বা ইসতেশহাদি হামলা বলে থাকেন, এটাকে হারাম বলা যাবে না। কেননা ইসলামের ইতিহাসে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে।
মাওলানা শফিক বলেন, ফরীদ উদ্দীন মাসউদ তাঁর শান্তির ফতোয়ায় ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে দেখাতে গিয়ে ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। ফেদায়ি হামলার ব্যাপারে তাঁর এই অবস্থান সেই ভ্রান্তির একটি প্রমাণ।
