টুপির রাজনীতি : ডিজাইন যেভাবে ঠিক করে দেয় ঘরানা-পরিচয়

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজ মৌলিকভাবে এক হলেও শাখাগত মতভিন্নতার কারণে বেশ কয়েকটি ঘরানায় বিভক্ত। চিন্তাগত পার্থক্যের ভিত্তিতে নির্মিত হয় এ ঘরানাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং যোগাযোগ। পোশাক-আশাকে মৌলিকভাবে খুব একটা পার্থক্য না থাকলেও এঁদের মধ্যে কারা কোন ঘরানার অনুসারী, তাঁদের টুপির দিকে নজর দিলেই সহজে অনুমান করা যায়। একেক ঘরানার টুপির ডিজাইন থাকে একেক রকম।

সাম্প্রতিক কালে টুপির এই বিভাজনটা কমে এলেও একসময় এটাই ছিল ঘরানা পরিচয়ে সবচেয়ে উপযোগী নির্ণায়ক। ধর্মপ্রাণ যে কারও টুপির দিকে তাকিয়ে বলে দেওয়া যেত তিনি কোন ঘরানার অনুসারী—কওমি, বেরলভি বা মাজারপন্থী নাকি মওদুদি। বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে একসময় প্রধানত এই তিন ঘরানাই ছিল। আহলে হাদিস ঘরানার আবির্ভাব অনেক আগে হলেও বাংলাদেশে এর বিস্তারের খুব বেশি দিন হয়নি।

এই ঘরানাগুলোর অনুসারীরা সাধারণত পৃথক পৃথকভাবে বিশেষ ধরনের টুপি পরেন।

কওমি ঘরানায় পীর ও শায়খ ভিত্তিক আরও বেশ কয়েকটি শাখা-ঘরানা আছে। এই শাখা-ঘরানার তারতম্যে টুপিতেও থাকে বিশেষ পার্থক্য। আছে অঞ্চলভিত্তিক একটা রেওয়াজও। রাজধানীর কওমি মাদরাসাগুলোর ছাত্র-উসতাদরা সাধারণত পাঁচকল্লি টুপি পরেন। একসময় ব্যাপকহারে প্রায় প্রতিটা মাদরাসায় পাঁচকল্লি পরা বাধ্যতামূলক থাকলেও এখন বাধ্যবাধকতার আইনে খানিকটা শিথিলতা এসেছে।

পাঁচকল্লিতেও আছে আবার রকমফের। কেউ কেউ গম্বুজের মতো উঁচু, সাদা সুতোর কারুকাজ করা সাদা রঙের টুপি পরেন, আবার কেউ কেউ তালুর সাথে ফিট করা পাঁচকল্লি পরেন। গম্বুজঅলা পাঁচকল্লি টুপি থানভি সিলসিলার পীর ও শায়েখদের মাদরাসায় অনেকটা বাধ্যতামূলক।

পাঁচকল্লির মধ্যে আরেক প্রকারের টুপি আছে, যেগুলোতে এমব্রয়ডারি বা সাদা সুতোর নকশা থাকে না। এই টুপিগুলো ব্যাপকভাবে পরিধান করেন চরমোনাই পীরের অনুসারীরা।

জালের মতো বুনন করা জালি টুপির প্রচলন ব্যাপকভাবে দেখা যায় চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলোতে। জালি টুপির বিশেষ একটি প্রকার এটি। চিটাগাঙ্গি টুপি নামেই এর পরিচিতি। সিলেটেও মোটামুটি ব্যাপক এই টুপির প্রচলন। আহলে হাদিস বা লা মাজহাবিদেরও অনেকে এমন টুপি পরেন। কিন্তু তাদের টুপি ঠিক চিটাগাঙ্গি নয়, সৌদি শায়েখদের টুপির আদলে বড় বড় ফোঁড় থাকে এই টুপিগুলোতে।

ধর্মীয় অঙ্গনে আধুনিক ও তরুণদের কাছে বর্তমানে জালি টুপিটাই বেশি পছন্দের। চিটাগাঙ্গি ও সৌদিয়ান টুপি ছাড়াও জালি টুপির আরও নানা আদল আছে। তারমধ্যে একটি হচ্ছে তুর্কি জালি। তুর্কি জালি বর্তমানে দলমত নির্বিশেষ, অনেকেই পরেন।

নৌকার মতো লম্বা এক ধরনের টুপি পরেন সিলেট অঞ্চলের কওমি আলেম ও মাদরাসাশিক্ষার্থীরা। শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি রহমতুল্লাহ আলায়হির চিন্তাধারা লালনকারী এবং তাঁর খলিফাদের মাদরাসায় এই টুপি অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল এককালে। তবে এখন সেই বাধ্যবাধকতায় যথেষ্ট শীতিলতা এসেছে। সৌখিন তালেবে ইলমরা কিশতি টুপির বদলে চিটাগাঙ্গি জালি টুপিই বেশি পছন্দ করেন বর্তমানে।

বেরলভি বা মিলাদ-কিয়ামপন্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকটি শাখা ঘরানা থাকলেও টুপিতে খুব বেশি পার্থক্য নেই তাদের। প্রায় সকলেই রঙিন সুতোর কারুকাজ করা উঁচু টুপি পরেন। অবশ্যি সিলেটের ফুলতলী ঘরানার মাদরাসাশিক্ষার্থী ও আলেমদের অনেকেই কিশতি টুপির মতো দেখতে একধরনের লম্বা টুপি পরেন। টুপিতে থাকে সাদা সুতোর হালকা কারুকাজ।

জামায়াত ঘরানার আলেমরাও রঙিন সুতোর কারুকাজ করা উঁচু টুপি পরেন। তবে তাঁদের নেতৃস্থানীয় অনেকেই ব্যবহার করেন রঙিন জিন্নাহ টুপি।

এ ছাড়া মিশরের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় জামে আজহারে পড়াশোনা করা অনেকে লাল রঙের টুপির ওপর সাদা কাপড় প্যাঁচানো বিশেষ একধরনের টুপি পরেন। এই টুপি জামে আজহারের গ্রাজুয়েটদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হলেও এখন অনেকেই পরেন। আজহারে না পড়েও কেউ কেউ এ টুপি পরে নিজেকে আজহারি দাবি করার কোশেশ চালান।

ঘরানা ভেদে টুপির এই তারতম্যের বিষয়টা একসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনো কোনো জায়গায় বাধ্যতামূলক থাকলেও এখন আর তেমনটা নেই। ধর্মীয় অঙ্গনের তরুণদের অনেকেই এই তারতম্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। নিজেদের পছন্দমতো টুপি পরছেন। গত এবং চলতি দশকে গোলটুপি এবং নানা প্রকারের জালি টুপির প্রচলন ঘটেছে ব্যাপকহারে। প্রাগ্রসর তরুণদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকছে এই টুপিগুলো।

আগের সংবাদগৃহবধূকে ধর্ষণ করতে গিয়ে আটক কলেজছাত্র
পরবর্তি সংবাদবর্তমান সরকার ভোট চুরি করে ক্ষমতা দখল করেছে : আমির খসরু