
ফাতেহ ডেস্ক
কলকাতা, ৭ নম্বর মেহের আলি রোড। এখানেই চারতলা বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকেন চতুরঙ্গ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক আব্দুর রাউফ, স্ত্রী মুস্তাবসেরা। স্ত্রী মুস্তাবসেরা একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতেন। ছেলে আসাদ কিছু দিন হল সহকারী অধ্যাপকের চাকরি পেয়েছেন নেদারল্যান্ডসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। সব ঠিক থাকলেও নির্বাচন কমিশনের একটি চিঠি রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে রউফ পরিবারের এই তিন সদস্যকে।
গত ৬ জুলাই পাঠানো নির্বাচন কমিশনের একটি চিঠিতে কমিশন জানিয়েছে, ৭ নম্বর মেহের আলি রোডের ঠিকানার বাসিন্দা নন (শিফটেড) আব্দুর সাহেবের স্ত্রী মুস্তাবসেরা ও ছেলে আসাদ। কিন্তু গৃহকর্তা আব্দুর রাউফের নামে এমন কোনও চিঠি আসেনি। শুধুমাত্র স্ত্রী ও পুত্রকে কমিশন কার্যত ‘গৃহহীন’ করে দিয়েছে । শুধু তাই নয়, বাড়িতে গিয়ে কমিশনের প্রতিনিধি নোটিসও ধরিয়ে দেন। ১৪ জুলাই দু’জনকে হাজিরা দিতে বলা হয়। এই নোটিস পাওয়ার পর রীতিমতো হতবাক মুস্তাবসেরা! তাঁর প্রশ্ন, একই পরিবারে একজনকে বাদ দিয়ে বাকি দু’জনের নামে এমন চিঠি কী করে আসে?
নোটিস পাওয়ার পর গোপালনগরে দক্ষিণ কলকাতার নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে হাজিরা দিতে যান মুস্তাবসেরা। তিনি ছেলের লেখা একটি চিঠিও নিয়ে যান সেখানে। ছেলেও যে ওই ঠিকানার বাসিন্দা, সে বিষয়েও নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের বোঝাতে হয়েছে। বিদেশ থেকে ছেলের লেখা একটি চিঠিও তিনি কমিশনে জমা করেছেন। মুস্তাবসেরার কথায়: “৪০ বছর একই কলকাতায় থাকার পরেও আমাকে বলা হল ‘শিফটেড’। দিতে হল প্রমাণ।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভোটার কার্ডে যে ঠিকানা থাকে, সেখানে আদৌ ভোটাররা থাকেন কি না বা ভুয়ো ভোটার রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখে কমিশন। এটা প্রতিবছরই হয়ে থাকে। যদি দেখা যায়, সেই ঠিকানায় ভোটার নেই, তাহলে তালিকা থেকে সেই নাম বাদ যায়।
এখানেই প্রশ্ন মুস্তাবসেরার স্বামীর, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কোনও অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে না তো? অসমের মতো এখানেও এনআরসি হচ্ছে না তো! যেহেতু এনআরসি করা যাচ্ছে না, তাই সরকারি প্রোগ্রামের মধ্যেই এনআরসি-র উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। নোটিস পাঠানোর আগে বাড়ি এসে খতিয়ে দেখা উচিত ছিল কমিশনের আধিকারিকদের। তা হয়নি। সেটা যদি হতো তাহলে এমন চিঠি বাড়িতে আসত না বলে মনে করছেন আব্দুর রাউফ।
মুস্তাবসেরা অভিযোগ করেন, যাদের নাগরিক নয় বলে সন্দেহ করে ডাকা হয়েছিল, তারা সবাই মুসলিম। তবে কি অলিখিত এনআরসি চালু করে দিল সরকার? প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আসামের পর এবার কি কলকাতায় এনআরসি’র দোহাই দিয়ে শুরু হবে মুসলিম নিধন?
এদিকে গত মঙ্গলবার আসাম সরকার ও কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে বাংলাদেশ লাগোয়া জেলাগুলিতে এনআরসি তালিকা ভুক্তদের ২০ শতাংশের নমুনা ফের পরীক্ষা করার আবেদন জানিয়েছে। এদিন আসামের বাইরে অন্য রাজ্যগুলিতেও এনআরসি চালু হবে কিনা সমাজবাদী পার্টির সদস্য জাভেদ আলি খানের এমন প্রশ্নের জবাবে অমিত শাহ বলেন, ‘খুব ভাল প্রশ্ন। এনআরসি আসাম চুক্তির অন্তর্গত এবং বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার ভিত্তিতে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভারতের মাটির প্রতিটি ইঞ্চিতে বসবাসকারী বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হবে এবং আন্তর্জাতিক আইনানুসারে তাদের ফেরৎ পাঠানো হবে।’
এর আগে ২০১৮, ২ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি কার্যকর করার দাবিতে কলকাতায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলো বিজেপির যুব ও নারী মোর্চার কর্মী-সমর্থকেরা। মিছিলে দাবি ওঠে, হিন্দুদের স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অবিলম্বে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার জন্য এই রাজ্যেও আসামের মতো এনআরসি কার্যকর করা হোক। পাশাপাশি এই রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাঁদের বের করে দেওয়া হোক। তখন এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন মমতা ব্যানার্জী। তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে এ ধরণের যে কোনো উদ্যোগ তিনি হতে দেবেন না।
সূত্র; আনন্দবাজার পত্রিকা/রাকিব
